অযত্নের কচুরিপানায় ভাগ্যবদল

এশিয়া পোস্ট নিউজ, বাগেরহাট
অযত্নের কচুরিপানায় ভাগ্যবদল
খাল থেকে কচুরিপানা তোলা হচ্ছে। ছবি: এশিয়া পোস্ট

একসময় খাল-বিল ও নদ-নদীর অবাঞ্ছিত জলজ উদ্ভিদ হিসেবে পরিচিত কচুরিপানাই এখন বাগেরহাটের একটি পরিবারের জীবিকার প্রধান অবলম্বন। খাল থেকে কচুরিপানা সংগ্রহ ও শুকিয়ে ঢাকায় পাঠিয়ে চলছে চার সদস্যের একটি পরিবারের সংসার।

বাগেরহাট শহরের খানজাহান পল্লীর গোবদিয়া এলাকার ৮ নম্বর ওয়ার্ডের লেকপাড়ে সরকারি জায়গায় থাকেন সুমি বেগম ও তার পরিবার। লেকসংলগ্ন খাল থেকেই প্রতিদিন এই কচুরিপানা সংগ্রহ করছেন তারা।

খালের কচুরিপানা পরিষ্কারে নিয়োজিত শ্রমিক ইমরান শেখ বলেন, প্রতিদিন সকাল ৮টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত আমরা দুজন শ্রমিক মিলে খাল থেকে কচুরিপানা তুলি। এ কাজের জন্য প্রতিদিন আমরা দুই হাজার ৫০০ টাকা মজুরি পাই। কিন্তু পরে জানতে পারি আমাদের তোলা কচুরিপানা সংগ্রহ করে ঢাকায় পাঠান সুমি বেগম ও তার স্বামী।

কচুরিপানা সংগ্রহ করে ‍শুকানো হচ্ছে। ছবি: এশিয়া পোস্ট
কচুরিপানা সংগ্রহ করে ‍শুকানো হচ্ছে। ছবি: এশিয়া পোস্ট

আরেক শ্রমিক নয়ন শেখ বলেন, পড়াশোনা শেষ করতে না পেরে এখন কচুরিপানা তোলার কাজ করছি। আগে জানতাম না কচুরিপানার এত মূল্য আছে। এখন শুনছি, এটি দিয়ে নানা ধরনের পরিবেশবান্ধব পণ্য তৈরি হয়, যা দেশ-বিদেশে বিক্রি হচ্ছে।

স্থানীয় বাসিন্দা মো. রবিউল ইসলাম বলেন, আগে কচুরিপানায় খাল ভরে থাকায় পানি চলাচল ব্যাহত হতো। এখন নিয়মিত কচুরিপানা তুলে নেওয়ায় খাল অনেকটা পরিষ্কার হয়েছে। একই সঙ্গে এই আগাছা বিক্রি করে মানুষ আয় করছে। এমন উদ্যোগ আরও বাড়লে পরিবেশের পাশাপাশি এলাকার অর্থনীতিও উপকৃত হবে।

নারী উদ্যোক্তা সুমি বেগম বলেন, স্বামী, ছেলে-মেয়ে মিলে আমরা এই কাজ করি। আগে না বুঝে পিরোজপুরে প্রতি কেজি ৫০ টাকা দরে শুকনো কচুরিপানা বিক্রি করতাম। এখন ঢাকার গাজীপুরের একটি প্রতিষ্ঠান প্রতি কেজি ১৫০ টাকা দরে কেনার কথা জানিয়েছে। এতে আমাদের আয় অনেক বাড়বে বলে আশা করছি। আমাদের নিজের কোনো বাড়ি নেই, সরকারি জায়গায় থাকি। অনেক কষ্টের মধ্যেও এই কাজকে আঁকড়ে ধরে স্বাবলম্বী হওয়ার চেষ্টা করছি।

সুমির স্বামী আবদুল্লাহ শেখ বলেন, আগে আমার একটি ছোট দোকান ছিল। ব্যবসা ভালো না চলায় সেটি বন্ধ করে দিতে হয়। পরে ইউটিউবে কচুরিপানা দিয়ে হস্তশিল্পের কাঁচামাল তৈরির ভিডিও দেখে আগ্রহী হই। পরিচিত একজনের সহযোগিতায় প্রায় তিন মাস আগে এই কাজ শুরু করি। তারা জানান, কচুরিপানা সংগ্রহের পর নির্দিষ্ট নিয়মে কেটে রোদে ভালোভাবে শুকাতে হয়। শুকানোর সময় অবশ্যই উঁচু ও শুকনো স্থানে রাখতে হয়। নিচে চাপা পড়ে গেলে বা ঠিকমতো না শুকালে সেই কাঁচামাল আর বিক্রিযোগ্য থাকে না। নির্ধারিত দৈর্ঘ্য ও মান বজায় রেখেই এটি প্রক্রিয়াজাত করতে হয়।

নারী উদ্যোক্তা সুমি বেগম কচুরিপানা বিক্রির জন্য প্রস্তুত করছেন। ছবি: এশিয়া পোস্ট
নারী উদ্যোক্তা সুমি বেগম কচুরিপানা বিক্রির জন্য প্রস্তুত করছেন। ছবি: এশিয়া পোস্ট

আবদুল্লাহ শেখ আরও বলেন, সরকারি সহযোগিতা ও বড় বাজার পেলে এই কাজ আরও সম্প্রসারণ করতে চাই। তাহলে অন্যদেরও কর্মসংস্থানের সুযোগ হবে।

বাগেরহাট বিসিক শিল্পনগরীর (ভারপ্রাপ্ত) উপব্যবস্থাপক মো. সোহাগ হোসেন বলেন, কচুরিপানাকে কাজে লাগিয়ে পরিবেশবান্ধব পণ্য তৈরির উদ্যোগ অত্যন্ত সম্ভাবনাময়। একসময় যেটিকে জলাশয়ের জন্য সমস্যা হিসেবে দেখা হতো, এখন সেটিই অর্থনৈতিক সম্পদে পরিণত হচ্ছে। কচুরিপানা দিয়ে তৈরি গার্ডেন পট, বিভিন্ন ধরনের বাস্কেট, ফ্লোর ম্যাট, ফুলদানি, পাপোশসহ নানা হস্তশিল্পের দেশ-বিদেশে ব্যাপক চাহিদা তৈরি হচ্ছে।

তিনি বলেন, এ ধরনের উদ্যোক্তাদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ, পণ্যের মান উন্নয়ন, বাজারজাতকরণ এবং উদ্যোক্তা উন্নয়ন কার্যক্রমে বিসিকের পক্ষ থেকে সব ধরনের সহযোগিতার সুযোগ রয়েছে। স্থানীয় পর্যায়ে আরও মানুষ এই খাতে এগিয়ে এলে গ্রামীণ অর্থনীতির চিত্র বদলে যাবে এবং রপ্তানি আয়ের নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি হবে।

বিষয় :বাগেরহাট