জালিয়াতির কবলে বরিশালের ওয়াকফ সম্পত্তি

ধর্মীয় ও জনকল্যাণমূলক উদ্দেশ্যে দান করা ওয়াকফ সম্পত্তির প্রকৃত আয় গোপন করে কোটি টাকার সরকারি রাজস্ব ফাঁকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে বরিশালে। প্রশাসনিক দুর্বলতা, দীর্ঘদিন ভাড়া পুনর্নির্ধারণ না করা এবং তদারকির অভাবে অধিকাংশ ওয়াকফ সম্পত্তি আজ বেহাল ও বেদখলের মুখে।
ওয়াকফ কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে জেলায় ৪৫১টি এবং সিটি করপোরেশন এলাকায় ১২০টি নিবন্ধিত ওয়াকফ সম্পত্তি রয়েছে। চলতি অর্থবছরে এসব সম্পত্তি থেকে ৮ লাখ ৮১ হাজার টাকা রাজস্ব ধার্য করা হলেও এখনো প্রায় ৩১ লাখ ২৫ হাজার টাকা বকেয়া রয়েছে। বকেয়াসহ এখন পর্যন্ত আদায় হয়েছে মাত্র ১৬ লাখ টাকা।
এর মধ্যে নগরীর শেরেবাংলা শামসুনন্নেছা খাতুন ওয়াকফ সম্পত্তির বকেয়া প্রায় ১৩ লাখ ২৭ হাজার টাকা এবং নাছিরউদ্দিন হাওলাদার ওয়াকফ সম্পত্তির বকেয়া ৫ লাখ টাকারও বেশি। সবচেয়ে অনিয়মের চিত্র মিলেছে হোটেল গুলবাগ নামে পরিচিত নগরীর আলহাজ আব্দুর রাজ্জাক ওয়াকফ সম্পত্তি ঘিরে। প্রায় ১৫ শতাংশ জমির ওপর নির্মিত চারতলা ভবনটিতে একটি আবাসিক হোটেল, ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও আটটি দোকান রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠান থেকে বছরে প্রায় অর্ধকোটি টাকা আয় হলেও সরকারি নথিতে আয় দেখানো হয়েছে মাত্র সাড় সাত লাখ টাকা। বিধি অনুযায়ী আয়ের ৫ শতাংশ রাজস্ব দেওয়ার কথা থাকলেও বছরে মাত্র ৩৮ হাজার টাকা জমা দেওয়া হচ্ছে।
বিস্ময়কর বিষয় হলো, এই ওয়াকফ সম্পত্তির মুতাওয়াল্লি হিসেবে দায়িত্বে রয়েছেন স্বয়ং বরিশাল জেলা প্রশাসক। জানতে চাইলে জেলা প্রশাসক মামুন খন্দকার এশিয়া পোস্টকে বলেন, বিষয়টি আমার জানা ছিল না। খোঁজখবর নিয়ে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে।
একই চিত্র নগরীর আমিরকুটির ও কালুশাহ সড়ক এলাকার ‘সুজন খা ওয়াকফ’ সম্পত্তিতেও। ৬ একর ২৫ শতাংশ জমির এই স্টেট থেকে বছরে প্রায় ৪০ লাখ টাকা আয় হলেও রাজস্ব দেওয়া হচ্ছে মাত্র ৪৭ হাজার ৯০০ টাকা। অন্যদিকে কালুশাহ সড়কের ৬৩ শতাংশ জমি ওয়ারিশরা বিক্রি করে দিয়েছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন কর্ণকাঠী এলাকায় অবস্থিত সাধু মোল্লা ওয়াকফ সম্পত্তির অবস্থাও একই রকম। বর্তমান মুতাওয়াল্লি মোল্লা হারুন অর রশীদ এশিয়া পোস্টকে জানান, তার বড় ভাই আগের মুতাওয়াল্লি কাগজপত্র জালিয়াতি করে অনেক সম্পত্তি বিক্রি করেছেন। সঠিকভাবে সরকারি রাজস্ব পরিশোধ করেননি। বর্তমানে তিনি দায়িত্ব নেওয়ার পর নিয়ম অনুযায়ী রাজস্ব পরিশোধের উদ্যোগ নিয়েছেন।
নগরীর নথুল্লাবাদ বাসস্ট্যান্ড এলাকার মেহেরুল্লা ওয়াকফ স্টেটের অবস্থাও একই। বিশাল পরিমাণ সম্পত্তি থাকা সত্ত্বেও এর মুতাওয়াল্লি মতিয়ার রহমান সরকারকে বছরে মাত্র ৩ হাজার টাকা রাজস্ব পরিশোধ করছেন বলে ওয়াকফ কার্যালয়ের নথিতে উল্লেখ রয়েছে।
অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, নগরীর অধিকাংশ ওয়াকফ সম্পত্তির ভাড়া বহু বছর ধরে পুনর্নিধারণ করা হয়নি। একই সঙ্গে প্রকৃত আয় গোপন করে কম রাজস্ব জমা দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। নিয়মিত অডিট, বাজারমূল্য অনুযায়ী ভাড়া পুনর্নিধারণ এবং কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করা গেলে এ খাতে স্বচ্ছতা ও রাজস্ব আদায় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। অন্যথায় সরকার যেমন রাজস্ব হারাবে, তেমনি ওয়াকফের ধর্মীয় ও জনকল্যাণমূলক উদ্দেশ্যও ক্রমেই প্রশ্নবিদ্ধ হবে।
.png)







