‘একটি প্রাণ বাঁচানোই সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি’

কুড়িগ্রামের হাট-বাজার ও শহরের অলিগলিতে দুই বছর ধরে অসুস্থ ও আহত কুকুর-বিড়ালের চিকিৎসা ও খাবারের ব্যবস্থা করে যাচ্ছেন একদল মানবিক তরুণ-তরুণী। কর্মব্যস্ততার মাঝেও নিজেদের অর্থ ব্যয় করে তারা এসব অসহায় প্রাণীকে দিচ্ছেন প্রয়োজনীয় ওষুধ, ইনজেকশন ও খাদ্য। তাদের এই নিঃস্বার্থ উদ্যোগ স্থানীয়দের মাঝে ব্যাপক প্রশংসা কুড়িয়েছে।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, শহরজুড়ে যখন মানুষ নিজ নিজ কাজে ব্যস্ত, ঠিক তখনই এই তরুণ-তরুণীদের চোখ খুঁজে ফেরে কোনো অসুস্থ, আহত কিংবা ক্ষুধার্ত প্রাণীকে। কোথাও খাবারের আশায় তাকিয়ে থাকা একটি কুকুর, আবার কোথাও যন্ত্রণায় থাকা বিড়ালের খবর পেলেই ছুটে যান তারা। কোনো হইচই নেই, নেই ক্যামেরার ঝলকানি। আছে শুধু দায়িত্ববোধ আর নিঃস্বার্থ ভালোবাসা। অনেক সময় রাস্তায় গুরুতর অসুস্থ প্রাণীদের নিজ বাড়িতে এনে চিকিৎসা দেওয়া হয়। নিজ উদ্যোগে গড়ে তোলা একটি ছোট্ট প্রাকৃতিক শেল্টারে বর্তমানে আশ্রয় পেয়েছে ২০টিরও বেশি অসুস্থ কুকুর ও বিড়াল। যারা একসময় রাস্তায় পড়ে থেকে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছিল, তারাই আজ পেয়েছে বেঁচে থাকার আরেকটি সুযোগ।
কুড়িগ্রামসহ সারা দেশের বিভিন্ন এলাকায় দিন দিন বাড়ছে পথকুকুর ও বিড়ালের সংখ্যা। খাবার ও চিকিৎসার অভাবে অনেক প্রাণীই নিঃশব্দে হারিয়ে যাচ্ছে। এই কঠিন বাস্তবতায় তাদের এই উদ্যোগ যেন অসহায় প্রাণীদের জন্য একটুকরো আশার আলো হয়ে উঠেছে। এই মানবিক কাজটি করে চলেছেন কুড়িগ্রাম পৌর শহরের জেসমিন নাহার জবা, অনিরুদ্ধ প্রণয় প্রান্তিক, শেখ মনিরুজ্জামান মিঠু, আবু হাসানাত হিরন ও আরমান সাকিব। তাদের মধ্যে জেসমিন নাহার জবা একটি বেসরকারি বিমা কোম্পানিতে কর্মরত। মাস শেষে যে বেতন হাতে আসে, তার একটি বড় অংশই ব্যয় হয় অসহায় প্রাণীদের চিকিৎসা ও খাবারের পেছনে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, মানুষের ভিড়ে যেখানে মানুষই মানুষের পাশে দাঁড়াতে ভুলে যায়, সেখানে এসব তরুণের এই মানবিক উদ্যোগ সত্যিই প্রশংসনীয়। তারা মনে করেন, সমাজের বিত্তবান ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এগিয়ে এলে এমন উদ্যোগ আরও বিস্তৃত হতে পারে।
কুড়িগ্রাম জেলার রাজারহাটের বাসিন্দা হাকিম মিয়া বলেন, ‘আমাদের রাজারহাট বাজারে কয়েকটি কুকুর ছানা রয়েছে। তার মা নেই। কুড়িগ্রাম শহর থেকে কিছু তরুণ এসে ছানাগুলোকে খাওয়ান। আস্তে আস্তে তারা বড় হচ্ছে। তাদের এমন কাজ দেখে খুশি সবাই।’
সার্বিক বিষয়ে পশুপ্রেমী জেসমিন নাহার জবার সঙ্গে কথা হয় এশিয়া পোস্টের। তিনি বলেন, ‘ছোটবেলা থেকেই অসহায় প্রাণীদের সেবাযত্ন করতে আমার ভালো লাগে। পশু-পাখি এই সমাজ ও প্রকৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। অথচ আমরা অনেক সময় তাদের অবহেলা করি-গরম পানি ছিটাই, খাবার দিই না, ঢিল ছুঁড়ে মারি। এসব আচরণ চরম অমানবিক। ওরা কথা বলতে পারে না, কিন্তু কষ্টটা ঠিকই অনুভব করে। একটা প্রাণ বাঁচাতে পারলে সেটাই আমার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।’

তিনি আরও বলেন, ‘সমাজে এমন মানবিক উদ্যোগগুলোকে সম্মিলিতভাবে সহযোগিতা করা জরুরি। তাহলে রাস্তায় পড়ে থাকা অসহায় প্রাণীদের জীবন রক্ষা করা সম্ভব হবে। আমার গভীর ইচ্ছা, একদিন আমাদের শহরে এসব প্রাণীদের জন্য একটি নিরাপদ আশ্রয় গড়ে তুলব। যেখানে তারা ভালোবাসা ও যত্নে বেঁচে থাকতে পারবে।’
.png)





