logo

সিন্ডিকেটে জিম্মি মানিকগঞ্জের ডিমের বাজার, লোকসানে খামারিরা

এশিয়া পোস্ট নিউজ
এশিয়া পোস্ট নিউজ, মানিকগঞ্জ
সিন্ডিকেটে জিম্মি মানিকগঞ্জের ডিমের বাজার, লোকসানে খামারিরা
ছবি: এশিয়া পোস্ট

খুচরা বাজারে ডিমের দাম চড়া থাকলেও উৎপাদক পর্যায়ে ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় চরম সংকটে পড়েছেন মানিকগঞ্জের লেয়ার মুরগির খামারিরা। উৎপাদন ব্যয়ের চেয়ে কম দামে ডিম বিক্রি করতে বাধ্য হওয়ায় প্রতিদিন লোকসান গুনছেন তারা। দীর্ঘদিন ধরে চলা এই লোকসানের কারণে জেলার অনেক খামারি এখন খামার বন্ধ করে দেওয়ার কথা ভাবছেন।

জেলা প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, মানিকগঞ্জের সাতটি উপজেলায় ছোট-বড় মিলিয়ে ১৩৪টি লেয়ার খামার রয়েছে। এসব খামারে উৎপাদিত ডিম জেলার চাহিদা মিটিয়ে প্রতিদিন ঢাকা ও আশপাশের বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ করা হয়। খামারিদের দাবি, বর্তমানে একটি ডিম উৎপাদনে তাদের খরচ হচ্ছে ৮ থেকে ৯ টাকা। অথচ পাইকারি বাজারে প্রতিটি ডিম বিক্রি করতে হচ্ছে মাত্র সাড়ে ৬ টাকায়। ফলে প্রতি ডিমেই ১ থেকে আড়াই টাকা পর্যন্ত লোকসান হচ্ছে।

সদর উপজেলার গড়পাড়া ইউনিয়নের রানাদিয়া গ্রামের লেয়ার খামারি কামরুজ্জামান পিন্টু বলেন, গত ১৫ বছর ধরে লেয়ার মুরগির খামার পরিচালনা করছি। কিন্তু গত দুই বছরে ডিমের দামের ধারাবাহিক পতনের কারণে আমার তিনটি খামারের মধ্যে দুটি বন্ধ করে দিতে হয়েছে। এখন যে একটি খামার চালু আছে, সেটিও লোকসানের কারণে বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে।

ছবি: এশিয়া পোস্ট
ছবি: এশিয়া পোস্ট

সাটুরিয়া উপজেলার তিল্লি ইউনিয়নের দক্ষিণপাড় তিল্লি গ্রামের খামারি বাবু খান বলেন, আগে যে ওষুধ দুই হাজার টাকায় কিনতাম, এখন সেটি কিনতে আড়াই হাজার টাকা লাগে। একই সঙ্গে মুরগির খাদ্যের দামও অনেক বেড়েছে। কর্মচারীদের বেতন দিতেও হিমশিম খেতে হচ্ছে। উৎপাদন ব্যয় বাড়লেও ডিমের ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় দীর্ঘদিন ধরে লোকসান গুনতে হচ্ছে।

খামারিদের অভিযোগ, মুরগির খাদ্য, ওষুধ, বিদ্যুৎ ও শ্রমিকের মজুরি কয়েক গুণ বাড়লেও সেই অনুপাতে উৎপাদক পর্যায়ে ডিমের দাম বাড়েনি। অথচ খুচরা বাজারে ভোক্তারা বেশি দামে ডিম কিনছেন। কিন্তু সেই অতিরিক্ত অর্থের সুবিধা উৎপাদকদের কাছে পৌঁছাচ্ছে না। তাদের দাবি, উৎপাদক ও ভোক্তার মাঝখানে মধ্যস্বত্বভোগীদের কারণেই এই বড় ধরনের মূল্য ব্যবধান তৈরি হচ্ছে।

মানিকগঞ্জ পৌরসভার গঙ্গাধরপট্টি এলাকার মুদি দোকানি শফিকুল ইসলাম বলেন, পাইকারি ব্যবসায়ীরা প্রতিদিন ভ্যানে করে আমাদের চাহিদা অনুযায়ী ডিম সরবরাহ করেন। তারা যে দামে ডিম দেন, তার সঙ্গে মাত্র ৫০ পয়সা লাভ করে আমরা বিক্রি করি। আমাদের তেমন লাভ নেই। মূলত যারা বাজার নিয়ন্ত্রণ করেন, তারাই বেশি লাভবান হন।

মানিকগঞ্জ বাসস্ট্যান্ড এলাকার ডিম ব্যবসায়ী আব্দুল কাদের জানান, মানিকগঞ্জ, টাঙ্গাইল, গাজীপুরসহ কয়েকটি জেলার ডিমের দাম একটি সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করে। প্রতিদিন সাভার সমিতির অফিসে রাত ১০টার দিকে বৈঠকের মাধ্যমে ডিমের মূল্য নির্ধারণ করা হয়। খামারিদের সেই নির্ধারিত দামেই ডিম বিক্রি করতে হয়। এছাড়া প্রতিটি লেনদেনে খামারিদের কাছ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন নেওয়া হয় বলেও জানান তিনি।

তিল্লি ইউনিয়নের খামারি মাহাবুর রহমান বলেন, উৎপাদক পর্যায়ে ডিমের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত ও সরকারি প্রণোদনা দেওয়া হলে লেয়ার শিল্প টিকিয়ে রাখা সম্ভব। ডিমের দাম কমে যাওয়ায় ঋণের বোঝা ও লোকসানে অনেক খামার বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে।

ছবি: এশিয়া পোস্ট
ছবি: এশিয়া পোস্ট

মানিকগঞ্জ সদর উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ড. মো. মনির হোসেন বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত খামারিদের সহজ শর্তে ঋণের আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি লেয়ার খামারগুলো যাতে টিকে থাকতে পারে, সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর কাজ করছে।

এ বিষয়ে মানিকগঞ্জ জেলা জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক আসাদুজ্জামান রুমেল বলেন, মানিকগঞ্জে অস্বাভাবিক ব্যবধান বা কোনো ধরনের কারসাজির অভিযোগ পাওয়া গেলে তা তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বাজারে কেউ কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি, সিন্ডিকেটের মাধ্যমে মূল্য নিয়ন্ত্রণ বা অতিরিক্ত মুনাফা আদায়ের চেষ্টা করলে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। একই সঙ্গে উৎপাদক ও ভোক্তা উভয়ের স্বার্থ রক্ষায় বাজার নিয়মিত তদারকি করা হচ্ছে।