logo

বিনোদনকেন্দ্রের ঘাটতিতে পিছিয়ে খাগড়াছড়ির পর্যটন

বিনোদনকেন্দ্রের ঘাটতিতে পিছিয়ে খাগড়াছড়ির পর্যটন
রিসাং ঝর্ণা। ছবি: এশিয়া পোস্ট

পাহাড়, ঝরনা, বনাঞ্চল আর নৈসর্গিক সৌন্দর্যে ঘেরা খাগড়াছড়ি যেন প্রকৃতির এক অনন্য ভুবন। পাহাড়ি ঝরনার স্বচ্ছ জলধারা আর মেঘে ঢাকা পথের হাতছানিতে প্রতিদিনই দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ছুটে আসেন পর্যটকরা। তবে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এমন বিপুল সম্ভাবনা থাকলেও পর্যটকদের দীর্ঘসময় ধরে রাখার মতো পর্যাপ্ত ও বৈচিত্র্যময় বিনোদনকেন্দ্র নেই খাগড়াছড়িতে।

খাগড়াছড়ি শহর ও আশপাশের কয়েকটি দর্শনীয় স্থান ঘুরেই অনেক পর্যটক চলে যান অন্য গন্তব্যে। বিশেষ করে সাজেকমুখী পর্যটকদের বড় একটি অংশ খাগড়াছড়িকে মূলত যাত্রাপথ হিসেবেই ব্যবহার করেন। শহরের কাছাকাছি নতুন ও আধুনিক বিনোদনকেন্দ্রের ঘাটতিতে আলুটিলা পর্যটন কেন্দ্র, জেলা পরিষদ হর্টিকালচার পার্কসহ কয়েকটি স্থানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে তাদের ঘোরাঘুরি। অথচ খাগড়াছড়িতে রয়েছে প্রকৃতির সান্নিধ্যে সময় কাটানোর মতো বেশ কিছু অনন্য স্থান।

পাহাড়ের বুকে আলুটিলার হাতছানি

খাগড়াছড়ির অন্যতম পরিচিত পর্যটনকেন্দ্র আলুটিলা। সবুজ পাহাড়ে ঘেরা এ এলাকায় রয়েছে প্রাকৃতিক গুহা। পাহাড়ের ওপর থেকে চারপাশের বিস্তৃত দৃশ্যও উপভোগ করা যায়। গুহার ভেতরের অন্ধকার পথ পেরিয়ে যাওয়ার অভিজ্ঞতা পর্যটকদের কাছে আলুটিলার অন্যতম আকর্ষণ।

রিছাং ঝরনায় পাহাড়ি জলের ধারা

পাহাড়ের বুক চিরে নেমে আসা রিছাং ঝরনা খাগড়াছড়ির আরেক জনপ্রিয় আকর্ষণ। সবুজে ঘেরা পাহাড়ি পরিবেশ আর ঝরনার স্বচ্ছ জলধারা প্রকৃতিপ্রেমীদের টানে। বর্ষায় ঝরনার প্রবাহ বেড়ে গেলে এর সৌন্দর্য আরও বাড়ে।

হর্টিকালচার পার্কে সবুজের আবেশ

শহরের কাছাকাছি জেলা পরিষদ হর্টিকালচার পার্কও পর্যটকদের কাছে পরিচিত একটি জায়গা। নানা ধরনের গাছপালা ও সবুজ পরিবেশে ঘেরা এ পার্কে পরিবার নিয়ে সময় কাটানোর সুযোগ রয়েছে। শহরের কাছাকাছি হওয়ায় স্বল্প সময়ে ঘুরে দেখার জন্যও জায়গাটি পর্যটকদের পছন্দের।

পাহাড়-ঝরনা-লেকে ছড়িয়ে সৌন্দর্য

আলুটিলা, রিছাং ঝরনা ও হর্টিকালচার পার্কের বাইরেও খাগড়াছড়ির বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে রয়েছে প্রকৃতির নানা আয়োজন। মায়াবিনী লেক, তারেং ও মানিকছড়ি ডিসি পার্কসহ বিভিন্ন স্থানে রয়েছে পাহাড়, লেক, ঝরনা ও সবুজের সমারোহ। প্রকৃতির এই বৈচিত্র্যই খাগড়াছড়িকে করে তুলেছে সম্ভাবনাময় পর্যটন গন্তব্য।

পর্যটন ব্যবসায়ীরা বলছেন, জেলায় নতুন নতুন বিনোদন কেন্দ্র গড়ে উঠলে পর্যটকরা খাগড়াছড়িতে থাকতো। এতে হোটেল রেস্টুরেন্টসহ পর্যটনখাতে জড়িত সংশ্লিষ্টরা আর্থিকভাবে লাভবান হতেন। একই সঙ্গে জেলায় নতুন নতুন উদ্যোক্তা তৈরি হতো এবং জেলার আর্থিক লেনদেন গতিশীল হতো।

ঢাকা থেকে খাগড়াছড়িতে বেড়াতে আসা পর্যটক নুসরাত জাহান নাদিয়া বলেন, খাগড়াছড়িতে গত দুই দিন আগে এসে ছিলাম। আমরা রাঙ্গামাটির সাজেক ঘুরে আজকে খাগড়াছড়িতে আসলাম। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখে অনেক ভালো লাগলো। তবে ঘোরার মতো জায়গা আরও বেশি থাকলে এখানে আরও একটা দিন বেশি থাকা হতো। বর্তমানে কয়েকটি স্থান ঘুরেই সময় শেষ। দেখার মতো তেমন আর কোনো পর্যটন স্পটও জানা নেই। তাই আজকে রাতেই চলে যাব ঢাকায়।

আরেক পর্যটক খুলনা থেকে আসা মো. আরিফুর ইসলাম বলেন, পরিবার নিয়ে ঘোরার জন্য শহরের কাছাকাছি আরও বিনোদন কেন্দ্র, শিশুদের জন্য পার্ক এবং আধুনিক পর্যটন সুবিধা থাকলে খাগড়াছড়িতে অবস্থান করতে আগ্রহী হতাম। এখানকার সৌন্দর্য দেখে সত্যিই ভালো লাগলো। তবে নতুন নতুন আরো কিছু বিনোদন কেন্দ্র থাকলে ভালো হতো।

পর্যটন ব্যবসায়ীদের মতে, পর্যটকরা খাগড়াছড়িতে দীর্ঘ সময় অবস্থান না করায় হোটেল, মোটেল, রেস্টুরেন্ট, পরিবহনসহ পর্যটননির্ভর ব্যবসাগুলো প্রত্যাশিতভাবে লাভবান হচ্ছে না।

ইকো-ট্যুরিজম এসোসিয়েশন বাংলাদেশের সদস্য ও এফএনএফ রেস্টুরেন্টের স্বত্বাধিকারীরা উজ্জ্বল দে বলেন, পর্যটকদের থাকার জন্য হোটেল রয়েছে, কিন্তু তাদের ধরে রাখার মতো পর্যাপ্ত বিনোদন কেন্দ্র নেই। নতুন নতুন পর্যটন স্পট ও বিনোদন কেন্দ্র গড়ে উঠলে খাগড়াছড়িতে পর্যটকদের অবস্থান বাড়বে। এতে হোটেল-রেস্টুরেন্টসহ সংশ্লিষ্ট সব ব্যবসায়ীর আয় বাড়বে। একইসাথে জেলায় নতুন নতুন উদ্যোক্তা গড়ে উঠবে।

খাগড়াছড়ি পর্যটন মোটেল ব্যবস্থাপক ক্যসিং মারমা বলেন, খাগড়াছড়িতে পর্যটকরা এলে থাকতে চান না। খাগড়াছড়ি শহরের কাছাকাছি দেখার মতো মাত্র দুইটি পর্যটন আছে জেলা পরিষদ হর্টিকালচার পার্ক আর আলুটিলা পর্যটন কেন্দ্র। আরও কতকিছু দেখা আছে তারা জানেই না। তাদের পরিচিত করে দেওয়ার মতোও কোনো স্পট নেই। পর্যটনকেন্দ্রিক নতুন উদ্যোক্তা তৈরির সুযোগ রয়েছে এ জেলায়। যদি সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে নতুন বিনোদন কেন্দ্র গড়ে তোলা গেলে পর্যটকের সংখ্যা ও অবস্থান দুটিই বাড়তে পারে। এর মাধ্যমে স্থানীয় অর্থনীতিতেও গতি আসবে।

ট্যুরিস্ট পুলিশ বলছে, খাগড়াছড়িতে পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে সুযোগ-সুবিধা বাড়ানো গেলে পর্যটকদের আগ্রহ আরও বাড়তে পারে।

খাগড়াছড়ি ট্যুরিস্ট পুলিশ জোন ইনচার্জ মো. জাহিদুল কবির এশিয়া পোস্টকে বলেন, পর্যটকদের নিরাপত্তার বিষয়টি আমরা গুরুত্ব দিয়ে দেখি। সামনে পর্যটন দিবস থেকে জেলায় আগত পর্যটকদের নিরাপত্তায় ফিক্সড পার্টি এবং মোবাইল টিম এর মাধ্যমে সেবা দিতে প্রস্তুত থাকবে। একই সঙ্গে আমাদের জরুরি সেবা নাম্বারটিও সচল থাকবে। জেলায় নতুন নতুন পর্যটন স্পট ও বিনোদনকেন্দ্র তৈরি হলে পর্যটকদের ঘোরার সুযোগ বাড়বে এবং পর্যটন খাত আরও সম্প্রসারিত হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।

পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দীন খাগড়াছড়ি জেলা সফরে এসে এশিয়া পোস্টকে বলেন, সম্ভাবনাময় খাগড়াছড়িতে প্রকৃতিকে অক্ষত রেখে নতুন পর্যটনকেন্দ্র স্থাপন, পর্যটন অবকাঠামো উন্নয়ন ও পর্যটকদের অবস্থান বাড়াতে সরকারিভাবে পরিকল্পনা গ্রহণ করা হবে।

পর্যটন সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, খাগড়াছড়ির প্রাকৃতিক পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষা করে পরিকল্পিতভাবে নতুন নতুন বিনোদন ও পর্যটনকেন্দ্র গড়ে তোলা হলে পর্যটকদের অবস্থান বাড়বে। পাশাপাশি হোটেল-রেস্টুরেন্ট, পরিবহন, স্থানীয় পণ্য ও ক্ষুদ্র ব্যবসার প্রসার ঘটিয়ে জেলার অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।