গাজীপুরে পথে পথে কাঁঠালের ঘ্রাণ

গাছে গাছে পাকা কাঁঠালের মিষ্টি ঘ্রাণে চারপাশ ছড়িয়ে পড়েছে। কেউ মাথায় করে, কেউ ভ্যান বা ঠেলাগাড়িতে তুলে বাগান থেকে কাঁঠাল নিয়ে ছুটছেন নিকটস্থ বাজারের দিকে। এই চিত্র এখন কাঁঠালের রাজধানীখ্যাত গাজীপুরে। বাগানে, উঠানে, হাটে-বাজারে পাইকার ও ক্রেতাদের ভিড়, দরদাম আর কাঁঠাল হাঁকডাকে মুখর হয়ে উঠেছে পুরো এলাকা। এসব কাঁঠাল দেশের বাজার ছাপিয়ে এখন রপ্তানি হচ্ছে ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে।
গাজীপুরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি কাঁঠাল উৎপাদন হয় শ্রীপুর উপজেলায়। এছাড়া কালিয়াকৈর, কাপাসিয়া ও কালীগঞ্জেও কাঁঠালের বেশ চাষ হয়ে আসছে। দীর্ঘদিনের সুনাম, স্বাদ ও ঘ্রাণের স্বকীয়তার স্বীকৃতি হিসেবে ২০২৫ সালে গাজীপুরের কাঁঠাল ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্যের মর্যাদা লাভ করে। শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীন পেটেন্ট, শিল্প-নকশা ও ট্রেডমার্কস অধিদপ্তর (ডিপিডিটি) এ স্বীকৃতি প্রদান করে।
বাগান থেকে হাটে কাঁঠাল
সরেজমিনে দেখা যায়, স্থানীয়রা বাগান থেকে ঘুরে ঘুরে কাঁঠাল সংগ্রহ করছেন, যা সড়কের পাশে স্তূপ করে রাখা হচ্ছে। সেখান থেকে পাইকাররা কিনে ভ্যানে ও ট্রাকে তুলে পাঠিয়ে দিচ্ছেন আড়ত ও বড় পাইকারি বাজারে। পরে সেসব কাঁঠাল দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আসা ক্রেতারা কিনে নিচ্ছেন। বাগান মালিকদের অনেকেই ছোট অবস্থাতেই পাইকারদের কাছে কাঁঠাল বিক্রি করে দেন; পরে সুবিধাজনক সময়ে পাইকাররা গাছ থেকে কেটে সংগ্রহ করেন। তবে কিছু চাষি ভালো দামের আশায় নিজেরাই গাছ থেকে কাঁঠাল সংগ্রহ করে খুচরা বাজারে বিক্রি করছেন।

বারোতোপা এলাকার ব্যবসায়ী আরিফ হোসেন বলেন, আমাদের এলাকায় প্রায় প্রতি বাড়িতে কাঁঠাল গাছ রয়েছে। কাঁঠাল অধিকাংশ বিক্রি হয় পাইকারিতে। গাছ ধরে বিক্রি হয়। অনেক সময় ব্যাপারীরা এসে কাঁঠাল ট্রাক ও পিক-আপে করে দেশের বিভিন্ন স্থানে নিয়ে যায়। আমাদের শ্রীপুরের কাঁঠাল দেশসেরা।
পিরুজালী এলাকার বাসিন্দা রাসেল আহমেদ বলেন, গাজীপুরের মাটি লাল, আমাদের কাঁঠালের মতো সুস্বাদু দেশের কোথাও পাওয়া যাবে না। শুধু জৈনা বাজার না, পথের মোড়ে মোড়ে কাঁঠালের হাট বসে। শুধু কাঁঠাল বিক্রি করেও অনেকের সংসার চলে।
দেশের সর্ববৃহৎ কাঁঠালের হাট জৈনাবাজার
ধানের পর গাজীপুরের প্রধান অর্থকরী ফসল কাঁঠাল। স্বাদ, ঘ্রাণ, আকার ও মিষ্টতায় এ জেলার কাঁঠালের খ্যাতি দেশজুড়ে। এখন কাঁঠালের ভরা মৌসুম। ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের শ্রীপুর জৈনা বাজারে এখন জমজমাট হয়ে উঠেছে কাঁঠালের বেচাকেনা। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রতিদিন পাইকাররা এখানে কাঁঠাল কিনতে আসছেন।
বাগান মালিক তোফাজ্জল হোসেন বলেন, গাছের খুব একটা যত্ন করি না। তবু এবার আমার বাগানের ৭০ থেকে ৮০টি গাছে প্রচুর কাঁঠাল ধরেছে। গত ১৫ দিনে ছোট-বড় ৫০০ থেকে ৭০০ কাঁঠাল বিক্রি করেছি। এরকম ২০০টি মাঝারি ও ছোট্ট আকারের প্রতি পিস কাঁঠাল ২৫ টাকায় বিক্রি করেছি। বড় আকারের কাঁঠালগুলো প্রতি পিস ৪০ থেকে ৫০ টাকায় বিক্রি হয়েছে।

আড়তদাররা জানান, এই মৌসুমে কাঁঠালের এই বাজারকে কেন্দ্র করে প্রায় দুই থেকে আড়াইশ মানুষের কাজের সুযোগ তৈরি হয়। কেউ বাগান থেকে কাঁঠাল সংগ্রহ করেন, কেউ পরিবহন করেন, আবার কেউ নির্দিষ্ট চুক্তিতে কেনাবেচার কাজেও যুক্ত থাকেন। পাশাপাশি বিভিন্ন জেলা থেকে আসা পাইকারদের কাঁঠাল ট্রাকে তোলার কাজেও অনেক শ্রমিক এখানে নিয়োজিত থাকেন।
যেভাবে জিআই স্বীকৃতি পেল শ্রীপুরের কাঁঠাল
গাজীপুর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সূত্র জানায়, গাজীপুরের কাঁঠালের স্বাদ, ঘ্রাণ ও গুণগত মানে রয়েছে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য। জেলা প্রশাসনের উদ্যোগ এবং ই-কমার্স ডেভেলপমেন্ট সেন্টারের (ইডিসি) সহযোগিতায় পেটেন্ট, ডিজাইন ও ট্রেডমার্কস অধিদপ্তরে জিআই স্বীকৃতির জন্য আবেদন করা হয়। ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্য (নিবন্ধন ও সুরক্ষা) আইন, ২০১৩-এর ধারা ১২ অনুযায়ী ২০২৪ সালের ছয় মার্চ গাজীপুরের কাঁঠালকে জিআই জার্নাল-৪৬-এ অন্তর্ভুক্ত করা হয় এবং ৮ মার্চ তা ডিপিডিটির ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হয়। এর মাধ্যমে এটি দেশের ৪৭তম নিবন্ধিত জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি পায়। পরবর্তীতে ‘বিশ্ব মেধাসম্পদ দিবস ২০২৫’ উপলক্ষে শিল্প মন্ত্রণালয়ের আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে ফরেন সার্ভিস একাডেমির মাল্টি পারপাস হলে আনুষ্ঠানিকভাবে গাজীপুরের কাঁঠালকে জিআই সনদ প্রদান করা হয়।
উৎপাদন চিত্র ও জনপ্রিয়তার কারণ
গাজীপুর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর বলছে, জেলায় বর্তমানে প্রায় ৩ হাজার ৮০০ হেক্টর জমিতে কাঁঠালের বাগান ও গাছ রয়েছে। এর পাশাপাশি বসতবাড়ির আঙিনা ও হোমস্টেড পর্যায়েও বিপুল সংখ্যক কাঁঠাল গাছ রয়েছে। প্রতি মৌসুমে কাঁঠাল উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয় প্রায় ৭৫ হাজার থেকে ৮০ হাজার মেট্রিক টন। জেলার শ্রীপুর, কালীগঞ্জ ও কাপাসিয়া উপজেলায় সবচেয়ে বেশি কাঁঠাল উৎপাদিত হয়। হেক্টরপ্রতি গড়ে গাজীপুরে কাঁঠাল উৎপাদন হয় প্রায় ২০ থেকে ২২ মেট্রিক টন, যা বাগানের বয়স, পরিচর্যা ও জাতভেদে কম-বেশি হয়ে থাকে।

শ্রীপুরের কাঁঠালের জনপ্রিয়তার প্রধান কারণ এর মিষ্টতা, সুগন্ধ, আঁশের পরিমাণ কম হওয়া এবং কোয়ার আকর্ষণীয় রং। এখানকার মাটি ও জলবায়ু কাঁঠাল চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী হওয়ায় ফলের স্বাদ ও গুণগত মান অন্য অঞ্চলের তুলনায় উন্নত হয়। গাজীপুরে অবস্থিত জাতীয় কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোও কাঁঠালের উন্নত জাত উদ্ভাবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি) গাজীপুরে গবেষণার মাধ্যমে বারি কাঁঠাল-১, বারি কাঁঠাল-২, বারি কাঁঠাল-৩, বারি কাঁঠাল-৪ এবং বারি কাঁঠাল-৫ সহ বেশ কয়েকটি উন্নত জাত উদ্ভাবন করেছে। এসব জাত উচ্চ ফলনশীল, সুস্বাদু এবং বাণিজ্যিক চাষের জন্য উপযোগী বলে কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ জানিয়েছে।
বিদেশে রপ্তানি ও সরকারি উদ্যোগ
শ্রীপুর উপজেলা কৃষি অফিসের তথ্য অনুযায়ী, এ অঞ্চলে প্রতিবছর গড়ে প্রায় ৭৮ হাজার মেট্রিক টন কাঁঠাল উৎপাদিত হয়। এখানে প্রধানত খাজা, গালা ও দুরসা জাতের কাঁঠাল ব্যাপকভাবে চাষ হয়। চলতি মৌসুমে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মাধ্যমে ‘খাজা’ জাতের কাঁঠাল ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে রপ্তানি করা হয়েছে এবং আরও রপ্তানির প্রস্তুতি চলছে।
শ্রীপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সুমাইয়া সুলতানা বলেন, এ বছর শ্রীপুরে দুই হাজার ৯৫০ হেক্টর জমিজুড়ে কাঁঠাল উৎপাদন হচ্ছে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা এ বছর ধরা হয়েছে ৬০ হাজার মেট্রিকটন। কাঁঠাল সংরক্ষণ ও প্রসেসিং নিয়ে কাজ করা হবে। কাঁঠালের আচার তৈরি ও রেডি টু কুকের জন্য পরিকল্পনা আছে। এছাড়া বিদেশে রপ্তানির জন্য আমরা কাজ করছি।

গাজীপুরের জেলা প্রশাসক মো. নূরুল করিম ভুঁইয়া বলেন, গাজীপুর হচ্ছে কাঁঠালের রাজধানী। গাজীপুরে কাঁঠালের প্রায় ৫০০ কোটি টাকার বাজার রয়েছে। আমরা কাঁঠাল ও এর প্রক্রিয়াজাত পণ্য বিদেশে রপ্তানির উদ্যোগ নিয়েছি। শুধু রপ্তানি নয়, কাঁঠাল সুস্বাদু হওয়ার কারণে দেশের বাজারেও এ অঞ্চলের কাঁঠালের চাহিদা ব্যাপক।






