ওজন নিয়ন্ত্রণে বড় ভূমিকা রাখে আপনার শরীরের যে অঙ্গ

অনেকেই মনে করেন, ওজন বাড়া বা কমার পেছনে শুধু বেশি খাওয়া আর কম শরীরচর্চাই দায়ী। কিন্তু সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, বিষয়টি এতটা সহজ নয়। আমাদের অন্ত্রে থাকা কোটি কোটি উপকারী অণুজীব, যাকে একসঙ্গে গাট মাইক্রোবায়োম বলা হয়, সেটিও ওজন নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই অণুজীবগুলো শুধু খাবার হজমেই সাহায্য করে না। এগুলো ক্ষুধা, তৃপ্তির অনুভূতি, বিপাকক্রিয়া এবং শরীর কীভাবে খাবার থেকে শক্তি গ্রহণ করবে, সেসব প্রক্রিয়াকেও প্রভাবিত করতে পারে। তবে এর অর্থ এই নয় যে অন্ত্রের ব্যাকটেরিয়াই একমাত্র ওজনের নিয়ন্ত্রক। খাদ্যাভ্যাস, শরীরচর্চা, ঘুম, মানসিক চাপ এবং বংশগত বৈশিষ্ট্যও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
গাট মাইক্রোবায়োম কী?
আমাদের অন্ত্রে ট্রিলিয়ন সংখ্যক ব্যাকটেরিয়া, ছত্রাক ও অন্যান্য অণুজীব বাস করে। এদের সম্মিলিতভাবে গাট মাইক্রোবায়োম বলা হয়।
এই অণুজীবগুলো খাবার ভাঙতে, কিছু ভিটামিন তৈরি করতে, রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে সক্রিয় রাখতে এবং অন্ত্রের সুস্থ পরিবেশ বজায় রাখতে সাহায্য করে।
কীভাবে ওজনের ওপর প্রভাব ফেলে?
গবেষকদের মতে, সুস্থ গাট মাইক্রোবায়োম কয়েকটি উপায়ে ওজন নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখতে পারে।
ক্ষুধা ও তৃপ্তির অনুভূতি নিয়ন্ত্রণ
অন্ত্রের কিছু উপকারী ব্যাকটেরিয়া এমন রাসায়নিক পদার্থ তৈরি করে, যা মস্তিষ্কে ক্ষুধা ও পেট ভরার সংকেত পাঠাতে সাহায্য করে।
যদি এই ভারসাম্য নষ্ট হয়, তাহলে স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি ক্ষুধা লাগতে পারে বা বারবার খাবার খেতে ইচ্ছা হতে পারে।
খাবার থেকে শক্তি গ্রহণ
সব মানুষের শরীর একইভাবে খাবার থেকে ক্যালোরি গ্রহণ করে না।
গবেষণায় দেখা গেছে, অন্ত্রের ব্যাকটেরিয়ার গঠন ভিন্ন হলে একই ধরনের খাবার থেকেও শরীর ভিন্ন পরিমাণ শক্তি শোষণ করতে পারে।
বিপাকক্রিয়া ও প্রদাহ
গাট মাইক্রোবায়োম শরীরের বিপাকক্রিয়া এবং দীর্ঘমেয়াদি নিম্নমাত্রার প্রদাহের সঙ্গেও সম্পর্কিত।
এই প্রদাহ দীর্ঘদিন থাকলে স্থূলতা, টাইপ ২ ডায়াবেটিস এবং অন্যান্য বিপাকজনিত সমস্যার ঝুঁকি বাড়তে পারে।
কেন সবার ওজন কমানোর ফল এক রকম হয় না?
অনেক সময় দেখা যায়, দুই ব্যক্তি একই ধরনের খাবার খান এবং একইভাবে ব্যায়াম করেন। তবু একজনের ওজন দ্রুত কমে, অন্যজনের তেমন পরিবর্তন হয় না।
বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, এর একটি কারণ হতে পারে গাট মাইক্রোবায়োমের পার্থক্য। তবে এটি একমাত্র কারণ নয়। বয়স, হরমোন, ঘুম, মানসিক চাপ এবং শারীরিক সক্রিয়তাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
কীভাবে অন্ত্রের স্বাস্থ্য ভালো রাখবেন?
বিশেষজ্ঞরা গাট মাইক্রোবায়োম ভালো রাখতে কিছু অভ্যাস অনুসরণ করার পরামর্শ দেন।
- প্রতিদিন বিভিন্ন ধরনের শাকসবজি ও ফল খান।
- পর্যাপ্ত আঁশযুক্ত খাবার যেমন ডাল, ওটস, লাল চাল ও গোটা শস্য খাদ্যতালিকায় রাখুন।
- দই বা অন্যান্য ফারমেন্টেড খাবার খেতে পারেন।
- অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবার, চিনি ও কোমল পানীয় কম খান।
- পর্যাপ্ত পানি পান করুন।
- নিয়মিত শরীরচর্চা করুন।
- প্রতিদিন ৭ থেকে ৯ ঘণ্টা ঘুমানোর চেষ্টা করুন।
- মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণে রাখুন।
প্রোবায়োটিক খেলেই কি ওজন কমবে?
অনেকে মনে করেন, শুধু প্রোবায়োটিক সাপ্লিমেন্ট খেলেই ওজন কমে যাবে। কিন্তু বর্তমান বৈজ্ঞানিক প্রমাণ তা নিশ্চিত করে না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কিছু মানুষের ক্ষেত্রে প্রোবায়োটিক উপকারী হতে পারে, তবে এটি ওজন কমানোর নিশ্চিত উপায় নয়। স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস ও নিয়মিত শরীরচর্চার বিকল্প হিসেবে প্রোবায়োটিককে দেখা উচিত নয়।
ওজন নিয়ন্ত্রণ শুধু ক্যালোরি গোনার বিষয় নয়। আমাদের অন্ত্রের স্বাস্থ্যও এতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তবে গাট মাইক্রোবায়োমকে ওজনের একমাত্র নিয়ন্ত্রক ভাবার সুযোগ নেই। সুষম খাদ্য, নিয়মিত শরীরচর্চা, পর্যাপ্ত ঘুম এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের সঙ্গে অন্ত্রের সুস্থ পরিবেশ বজায় রাখতে পারলে দীর্ঘমেয়াদে ওজন নিয়ন্ত্রণ করা তুলনামূলক সহজ হতে পারে।
সূত্র: এনডিটিভি
.png)






