সকালে ঘুম থেকে উঠে গোড়ালিতে তীব্র ব্যথা, হতে পারে প্ল্যান্টার ফ্যাসাইটিস

সকালে ঘুম থেকে উঠে বিছানা থেকে নামতেই গোড়ালিতে তীব্র ব্যথা অনুভব করেন? কয়েক পা হাঁটার পর ব্যথা কিছুটা কমে যায়, কিন্তু দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকা বা বসে থাকার পর আবার শুরু হয়? অনেকেই এমন ব্যথাকে বয়সের স্বাভাবিক সমস্যা বা অতিরিক্ত হাঁটার ফল বলে এড়িয়ে যান। কিন্তু এই ধরনের ব্যথা পায়ের পাতার একটি সাধারণ সমস্যার লক্ষণ হতে পারে, যার নাম প্ল্যান্টার ফ্যাসাইটিস।
পায়ের গোড়ালি থেকে আঙুলের গোড়া পর্যন্ত পায়ের নিচের অংশে একটি শক্ত তন্তুযুক্ত টিস্যু থাকে, যাকে প্ল্যান্টার ফ্যাসিয়া বলা হয়। এটি পায়ের খিলানকে ধরে রাখতে এবং হাঁটার সময় ধাক্কা সামলাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এই টিস্যুর ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়লে ছোট ছোট ক্ষতি ও জ্বালা তৈরি হয়ে ব্যথা হতে পারে।
প্ল্যান্টার ফ্যাসাইটিসের সবচেয়ে পরিচিত লক্ষণ
এই সমস্যার সবচেয়ে সাধারণ লক্ষণ হলো গোড়ালির নিচে বা সামনের দিকে তীক্ষ্ণ ব্যথা। বিশেষ করে সকালে ঘুম থেকে উঠে প্রথম কয়েক পা হাঁটার সময় ব্যথা সবচেয়ে বেশি অনুভূত হতে পারে। কিছুক্ষণ হাঁটার পর তা কমে গেলেও দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থাকা বা বসে থাকার পর উঠে দাঁড়ালে আবার ব্যথা ফিরে আসতে পারে।
অনেকের ক্ষেত্রে ব্যথা ধীরে ধীরে শুরু হয়। আবার কারও ক্ষেত্রে হঠাৎ করেও দেখা দিতে পারে। এক পায়ে বেশি হলেও দুই পায়েই এই সমস্যা হতে পারে।
কেন হয় এই সমস্যা?
পায়ের পাতার প্ল্যান্টার ফ্যাসিয়ার ওপর বারবার চাপ পড়াই এই সমস্যার অন্যতম কারণ। নিয়মিত দৌড়ানো, দীর্ঘক্ষণ হাঁটা বা শক্ত মেঝেতে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার মতো কাজ থেকে পায়ের ওপর চাপ বাড়তে পারে। হঠাৎ করে শরীরচর্চার পরিমাণ বাড়ালেও ঝুঁকি বাড়ে।
এ ছাড়া কয়েকটি বিষয় প্ল্যান্টার ফ্যাসাইটিসের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। যেমন-
- দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে বা হাঁটতে হয় এমন কাজ
- নিয়মিত দৌড়ানো বা বেশি চাপের ব্যায়াম
- অতিরিক্ত ওজন
- পায়ের পাতার গঠনগত সমস্যা
- পা অতিরিক্ত সমতল বা বেশি বাঁকানো হওয়া
- পায়ের পেশি বা অ্যাকিলিস টেনডন শক্ত হয়ে থাকা
- পুরোনো বা ক্ষয় হয়ে যাওয়া জুতা
- পর্যাপ্ত সহায়তা বা কুশনিং নেই এমন জুতা পরা
- হঠাৎ করে হাঁটা বা ব্যায়ামের পরিমাণ বাড়িয়ে দেওয়া
৪০ থেকে ৬০ বছর বয়সীদের মধ্যে এই সমস্যা তুলনামূলক বেশি দেখা যায়। তবে বয়স কম হলেও এটি হতে পারে।
সকালে ব্যথা বেশি হয় কেন?
রাতে ঘুমানোর সময় পায়ের পাতা দীর্ঘ সময় একই অবস্থায় থাকে। সকালে উঠে হঠাৎ পায়ের ওপর শরীরের ওজন পড়লে প্ল্যান্টার ফ্যাসিয়ার ওপর টান পড়ে। এ কারণেই প্রথম কয়েকটি পদক্ষেপে ব্যথা তীব্র হতে পারে। কিছুক্ষণ হাঁটার পর টিস্যু কিছুটা নড়াচড়া করায় ব্যথা কমে যেতে পারে।
তবে এই ধরনের ব্যথা থাকলেই যে নিশ্চিতভাবে প্ল্যান্টার ফ্যাসাইটিস হয়েছে, তা নয়। গোড়ালির ব্যথার আরও বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে। তাই দীর্ঘদিন ব্যথা থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।
বাড়িতে কীভাবে ব্যথা কমানো যায়?
প্ল্যান্টার ফ্যাসাইটিসের বেশির ভাগ রোগীর ক্ষেত্রে প্রথমেই অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হয় না। বিশ্রাম, ব্যায়ামের ধরন পরিবর্তন, পায়ের পেশি ও ফ্যাসিয়ার স্ট্রেচিং এবং উপযুক্ত জুতা ব্যবহারের মতো সাধারণ ব্যবস্থায় অনেকের উপকার হয়। সুস্থ হতে কয়েক সপ্তাহ থেকে কয়েক মাসও সময় লাগতে পারে।
ব্যথা বাড়ায় এমন কাজ কিছুদিন কমান
ব্যথা বেশি থাকলে দৌড়ানো, লাফানো বা দীর্ঘ সময় হাঁটার মতো পায়ের ওপর বেশি চাপ পড়ে এমন কাজ কমিয়ে দিন। তবে পুরোপুরি নড়াচড়া বন্ধ করে দেওয়াও সবসময় প্রয়োজন হয় না। সাঁতার বা সাইকেল চালানোর মতো কম চাপের ব্যায়াম বিকল্প হতে পারে।
নিয়মিত স্ট্রেচিং করুন
পায়ের পাতা, কাফের পেশি এবং অ্যাকিলিস টেনডনের স্ট্রেচিং উপকারী হতে পারে। ফিজিওথেরাপিস্ট সঠিক ব্যায়াম শেখাতে পারেন। নিয়মিত স্ট্রেচিং পায়ের ওপর টান কমাতে এবং নমনীয়তা বাড়াতে সাহায্য করতে পারে।
বরফ ব্যবহার করতে পারেন
ব্যথা ও অস্বস্তি কমাতে গোড়ালিতে অল্প সময়ের জন্য বরফ দেওয়া যেতে পারে। বরফ সরাসরি ত্বকের ওপর না দিয়ে পাতলা কাপড়ে মুড়ে ব্যবহার করা উচিত।
একটি ঠান্ডা পানির বোতল পায়ের পাতার নিচে ধীরে ধীরে গড়িয়ে নেওয়াও কিছু মানুষের ক্ষেত্রে আরাম দিতে পারে।
ভালো জুতা পরুন
পাতলা তলা, অতিরিক্ত শক্ত বা পর্যাপ্ত সহায়তা নেই এমন জুতা এড়িয়ে চলা ভালো। পায়ের খিলানকে যথেষ্ট সহায়তা দেয় এবং গোড়ালিতে কুশনিং রয়েছে এমন জুতা বেছে নেওয়া যেতে পারে। পুরোনো ও ক্ষয়ে যাওয়া জুতাও বদলে ফেলা উচিত।
বাড়িতেও দীর্ঘ সময় খালি পায়ে শক্ত মেঝেতে হাঁটা এড়িয়ে চলা উপকারী হতে পারে।
পায়ের ওজন কমাতে হবে কি?
শরীরের অতিরিক্ত ওজন থাকলে পায়ের ওপর বাড়তি চাপ পড়ে। ফলে প্ল্যান্টার ফ্যাসিয়ার ওপরও চাপ বাড়তে পারে। তাই চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখা এই সমস্যার ব্যবস্থাপনার একটি অংশ হতে পারে।
তবে শুধু ওজনের কারণেই প্ল্যান্টার ফ্যাসাইটিস হয়, এমন নয়। পায়ের গঠন, জুতা, কাজের ধরন এবং শারীরিক কার্যকলাপসহ একাধিক কারণ এতে ভূমিকা রাখতে পারে।
কখন চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে?
গোড়ালির ব্যথা কয়েক দিন পরেও না কমলে, ক্রমশ বাড়লে বা হাঁটা ও দৈনন্দিন কাজকর্মে সমস্যা তৈরি করলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। শুধু ব্যথার জায়গা দেখে নিজে থেকে প্ল্যান্টার ফ্যাসাইটিস ধরে নেওয়া ঠিক নয়।
চিকিৎসক সাধারণত রোগীর ব্যথার ধরন, কখন ব্যথা বাড়ে এবং পায়ের শারীরিক পরীক্ষা করে রোগ নির্ণয় করতে পারেন। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে শুরুতেই এক্স-রে বা এমআরআই প্রয়োজন হয় না। তবে হাড়ে চিড় বা অন্য কোনো সমস্যা সন্দেহ হলে ইমেজিং পরীক্ষা করা হতে পারে।
চিকিৎসা দীর্ঘ হলে কী করা হয়?
সাধারণ চিকিৎসায় কয়েক মাসেও ব্যথা না কমলে চিকিৎসক আরও কিছু পদ্ধতির কথা বিবেচনা করতে পারেন। এর মধ্যে ফিজিওথেরাপি, রাতের স্প্লিন্ট, পায়ের খিলানের সহায়ক বিশেষ ইনসোল, কিছু ক্ষেত্রে শক ওয়েভ চিকিৎসা বা নির্দিষ্ট ধরনের ইনজেকশন থাকতে পারে।
অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন সাধারণত খুব কম ক্ষেত্রেই হয়। দীর্ঘদিনের তীব্র ব্যথা অন্য চিকিৎসায় না কমলে বিশেষজ্ঞ অস্ত্রোপচারের কথা বিবেচনা করতে পারেন।
গোড়ালির ব্যথাকে অবহেলা নয়
সকালে প্রথম কয়েক পা হাঁটার সময় গোড়ালিতে তীব্র ব্যথা হওয়া প্ল্যান্টার ফ্যাসাইটিসের একটি পরিচিত লক্ষণ। বিশেষ করে দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকা, বেশি হাঁটা, দৌড়ানো বা অনুপযুক্ত জুতা ব্যবহারের সঙ্গে যদি ব্যথার সম্পর্ক থাকে, তাহলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিত।
তবে গোড়ালির সব ব্যথাই প্ল্যান্টার ফ্যাসাইটিস নয়। ব্যথা দীর্ঘস্থায়ী হলে বা দৈনন্দিন জীবন ব্যাহত করলে সঠিক কারণ জানতে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ। সময়মতো ব্যবস্থা নিলে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অস্ত্রোপচার ছাড়াই এই সমস্যা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
সূত্র: মায়ো ক্লিনিক


