হার্ট অ্যাটাকে যে ৫ লক্ষণ নারীরা প্রায়ই এড়িয়ে যান

একসময় নাক দিয়ে পানি পড়া, হাঁচি, কাশি বা শ্বাসকষ্ট দেখলেই অনেকে সর্দি-কাশি বা ফ্লু মনে করতেন। কিন্তু কোভিড-১৯ পরবর্তী সময়ে সাধারণ ভাইরাসজনিত অসুস্থতা আর অন্য জটিল রোগের লক্ষণ আলাদা করা অনেকের জন্য কঠিন হয়ে গেছে।
অনেকেই জানেন না, ফ্লু কিংবা অতিরিক্ত মানসিক চাপের মতো কিছু উপসর্গ আসলে হৃদ্রোগেরও ইঙ্গিত হতে পারে। বিশেষ করে সাইলেন্ট হার্ট অ্যাটাকের ক্ষেত্রে লক্ষণগুলো এতটাই সাধারণ মনে হয় যে তা সহজেই চোখ এড়িয়ে যায়।
সাইলেন্ট হার্ট অ্যাটাক বলতে এমন হার্ট অ্যাটাককে বোঝায়, যেখানে তীব্র বুকব্যথার মতো প্রচলিত লক্ষণ স্পষ্টভাবে নাও থাকতে পারে। ফলে রোগী বুঝতেই পারেন না যে তার হৃদ্যন্ত্রে সমস্যা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, নারীদের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি।
নিচে এমন ৫টি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ তুলে ধরা হলো, যেগুলো নারীরা অনেক সময় স্ট্রেস, ক্লান্তি বা ফ্লু ভেবে অবহেলা করেন।
চোয়ালের ব্যথা
চোয়ালে ব্যথা হলে অনেকেই মনে করেন দাঁতের সমস্যা, দাঁত ঘষার অভ্যাস বা মানসিক চাপের কারণে এমন হচ্ছে। কিন্তু এটি হার্ট অ্যাটাকের আগাম সতর্কবার্তাও হতে পারে, বিশেষ করে নারীদের ক্ষেত্রে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অনেক নারী হার্ট অ্যাটাকের আগে বাম দিকের চোয়ালে হালকা কিন্তু অস্বস্তিকর ব্যথা অনুভব করেন। এই ব্যথা সাধারণত মৃদু ও চাপধরনের হয়। অন্য উপসর্গের সঙ্গে থাকলে তা আরও বিভ্রান্তিকর হয়ে উঠতে পারে।
পরামর্শ : অকারণে চোয়ালে ব্যথা হলে, বিশেষ করে তার সঙ্গে অতিরিক্ত ক্লান্তি বা মাথা ঘোরা থাকলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
অকারণে দীর্ঘস্থায়ী ক্লান্তি
ব্যস্ত জীবন, সংসার, কাজের চাপের কারণে ক্লান্ত লাগা খুব স্বাভাবিক। কিন্তু যদি হঠাৎ করে অস্বাভাবিক ও দীর্ঘস্থায়ী ক্লান্তি অনুভূত হয়, তবে তা হৃদ্রোগের সতর্কসংকেত হতে পারে।
গবেষণায় দেখা গেছে, অনেক নারী হার্ট অ্যাটাকের কয়েক সপ্তাহ বা মাস আগে থেকেই অস্বাভাবিক ক্লান্তি অনুভব করেন। দৈনন্দিন কাজ করতেও কষ্ট হওয়া বা আগের মতো শক্তি না পাওয়া বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা উচিত।
পরামর্শ : অতিরিক্ত ক্লান্তি যদি স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় বাধা সৃষ্টি করে, তাহলে পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন।
শ্বাসকষ্ট
সিঁড়ি ভাঙার পর হাঁপিয়ে ওঠা স্বাভাবিক। কিন্তু বিশ্রামে থাকা অবস্থায় বা হালকা কাজের সময় শ্বাসকষ্ট হলে সেটি উদ্বেগের বিষয়। অনেক নারী এটিকে দুশ্চিন্তা বা উদ্বেগজনিত সমস্যা ভেবে অবহেলা করেন।
হৃদ্যন্ত্র সঠিকভাবে রক্ত পাম্প করতে না পারলে শরীরে অক্সিজেনের ঘাটতি দেখা দিতে পারে, যার ফলে শ্বাস নিতে কষ্ট হয়। এর সঙ্গে বুকের চাপধরনের অনুভূতিও থাকতে পারে।
পরামর্শ : নতুন করে শ্বাসকষ্ট শুরু হলে বা অন্য অস্বাভাবিক উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করান।
ঠান্ডা ঘাম
হঠাৎ ঠান্ডা ঘাম হওয়া অনেক সময় জ্বর বা মানসিক চাপে হয় বলে মনে করা হয়। কিন্তু কোনো স্পষ্ট কারণ ছাড়াই যদি ঘাম হতে থাকে, বিশেষ করে তার সঙ্গে বমিভাব বা মাথা ঘোরা থাকে, তাহলে তা হার্ট অ্যাটাকের লক্ষণ হতে পারে।
শরীর যখন বিপদের সংকেত পায়, তখন স্বাভাবিক না হলেও ঘাম হতে পারে। এই লক্ষণকে অবহেলা করা উচিত নয়।
পরামর্শ : অকারণে ঠান্ডা ঘাম হলে এবং তার সঙ্গে অন্য উপসর্গ থাকলে দ্রুত চিকিৎসা সহায়তা নিন।
মাথা ঘোরা বা ঝিমঝিম ভাব
ডিহাইড্রেশন, কম ঘুম বা স্ট্রেসের কারণে মাথা ঘোরা স্বাভাবিক মনে হতে পারে। কিন্তু পর্যাপ্ত রক্ত সঞ্চালন না হলে এমন উপসর্গ দেখা দিতে পারে, যা হৃদ্যন্ত্রের সমস্যার ইঙ্গিত দেয়।
অনেক নারী জানিয়েছেন, হার্ট অ্যাটাকের আগে তারা হালকা ঝিমঝিম ভাব বা অস্বাভাবিক দুর্বলতা অনুভব করেছিলেন। বুক বা চোয়ালের ব্যথা এবং অতিরিক্ত ঘামের সঙ্গে এ ধরনের উপসর্গ থাকলে তা আরও উদ্বেগজনক।
পরামর্শ : বারবার মাথা ঘোরা বা অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার প্রবণতা থাকলে দেরি না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
নারীদের হৃদ্স্বাস্থ্য কেন বেশি গুরুত্বপূর্ণ
বিশ্বব্যাপী হৃদ্রোগ নারীদের মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, প্রতি তিনজন নারীর একজন হৃদ্রোগজনিত কারণে মারা যান। অথচ অনেক নারী নিজের ঝুঁকির বিষয়গুলো সম্পর্কে অবগত নন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নারীরা পুরুষদের তুলনায় হার্ট অ্যাটাকের লক্ষণ কম চিনতে পারেন। ফলে দেরিতে চিকিৎসা নেওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, অতিরিক্ত ওজন, ধূমপান, পারিবারিক ইতিহাস এবং অনিয়ন্ত্রিত মানসিক চাপ হৃদ্রোগের বড় ঝুঁকির কারণ।
সাইলেন্ট হার্ট অ্যাটাকের লক্ষণ অনেক সময় সাধারণ অসুস্থতা বা মানসিক চাপের মতো মনে হতে পারে। তাই চোয়ালের ব্যথা, অস্বাভাবিক ক্লান্তি, শ্বাসকষ্ট, ঠান্ডা ঘাম বা মাথা ঘোরা মতো উপসর্গকে হালকাভাবে নেওয়া উচিত নয়।
নিজের শরীরের পরিবর্তন সম্পর্কে সচেতন থাকুন। অস্বাভাবিক কিছু অনুভব করলে দেরি না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। সময়মতো সঠিক পদক্ষেপ নিলে বড় ধরনের জটিলতা এড়ানো সম্ভব। হৃদ্স্বাস্থ্য রক্ষা করা মানে সুস্থ ও নিরাপদ জীবন নিশ্চিত করা।
সূত্র : হেল্থ শটস





