ভাত নাকি আলু, কোনটি শরীরের জন্য বেশি উপকারী

ভাত আর আলু আমাদের দৈনন্দিন খাবারের খুবই পরিচিত দুটি অংশ। কেউ একবেলা ভাত ছাড়া চলতেই পারেন না, আবার অনেকের পছন্দ আলু। তবে স্বাস্থ্য সচেতনদের মনে প্রায়ই এ প্রশ্ন আসে, ভাত আর আলুর মধ্যে কার্বোহাইড্রেট বা শর্করা হিসেবে কোনটি বেশি স্বাস্থ্যকর?
পুষ্টিবিদদের মতে, ভাত এবং আলু দুটিই স্বাস্থ্যকর খাদ্য হতে পারে। তবে কোনটি বেশি উপকারী হবে, তা নির্ভর করে খাবারের ধরন, রান্নার পদ্ধতি এবং কতটা পরিমাণে খাওয়া হচ্ছে তার ওপর।
চলুন ভাত ও আলুর পুষ্টিগুণ এবং কোনটি বেছে নেওয়া ভালো তা জেনে নেওয়া যাক।
স্বাস্থ্যকর ভাত কোনটি
সব ধরনের ভাতের পুষ্টিগুণ এক নয়। সাদা চাল পালিশ করার সময় এর বাইরের স্তর ও ভ্রূণ অংশ বাদ পড়ে যায়। ফলে অনেক আঁশ, ভিটামিন ও খনিজ উপাদান কমে যায়। অন্যদিকে ব্রাউন রাইস, কালো চাল, লাল চাল ও ওয়াইল্ড রাইসে আঁশ, ভিটামিন বি, ম্যাগনেসিয়াম, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও অন্যান্য পুষ্টি উপাদান বেশি থাকে।
ব্রাউন রাইস
ব্রাউন রাইসে সাদা ভাতের তুলনায় আঁশ, প্রোটিন, ম্যাগনেসিয়াম ও ফসফরাস বেশি থাকে। এতে দীর্ঘ সময় পেট ভরা থাকে এবং রক্তে শর্করার মাত্রা দ্রুত বাড়ে না। কিছু গবেষণায় ব্রাউন রাইস খাওয়ার সঙ্গে টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি কমার সম্পর্কও পাওয়া গেছে।
কালো চাল
কালো চাল বা ব্ল্যাক রাইসে অ্যান্থোসায়ানিন নামের শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট থাকে, যা এর গাঢ় বেগুনি-কালো রঙের জন্য দায়ী। এই অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট শরীরের প্রদাহ কমাতে এবং ইনসুলিনের কার্যকারিতা উন্নত করতে সাহায্য করতে পারে।
লাল চাল
লাল চালেও প্রচুর আঁশ ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট রয়েছে। এটি হৃদ্স্বাস্থ্য ভালো রাখতে এবং বয়সজনিত কিছু রোগের ঝুঁকি কমাতে সহায়ক হতে পারে।
ওয়াইল্ড রাইস
ওয়াইল্ড রাইস আসলে ধানের জাত নয়, এটি জলজ ঘাসের বীজ।
এতে সাধারণ সাদা ভাতের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ প্রোটিন ও আঁশ থাকে। গবেষণায় দেখা গেছে, এটি অন্ত্রের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে, ওজন নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করতে এবং ইনসুলিন সংবেদনশীলতা বাড়াতে ভূমিকা রাখতে পারে।
ভাত খাওয়ার কিছু সীমাবদ্ধতা
স্বাস্থ্যকর চালেও মূল উপাদান কার্বোহাইড্রেট। তাই অতিরিক্ত ভাত খেলে রক্তে শর্করা বেড়ে যেতে পারে। বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ হলো, শুধু ভাত দিয়ে পেট না ভরে এর সঙ্গে মাছ, মাংস, ডিম, ডাল, শাকসবজি ও স্বাস্থ্যকর চর্বি রাখুন।
এ ছাড়া চালে স্বাভাবিকভাবেই সামান্য পরিমাণ আর্সেনিক থাকতে পারে। রান্নার আগে চাল ভালোভাবে ধুয়ে বেশি পানিতে সিদ্ধ করে অতিরিক্ত পানি ফেলে দিলে আর্সেনিকের পরিমাণ কিছুটা কমানো সম্ভব।
আলুর পুষ্টিগুণ
অনেকেই মনে করেন আলু খেলে ওজন বাড়ে। কিন্তু বাস্তবে আলু নিজে তেমন ক্ষতিকর নয়। বরং এতে রয়েছে অনেক প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান।
সাদা আলু
সঠিকভাবে রান্না করা সাদা আলুতে পটাশিয়াম, ভিটামিন সি, ভিটামিন বি৬, ম্যাগনেসিয়াম ও আঁশ (বিশেষ করে খোসাসহ খেলে) পাওয়া যায়।
পটাশিয়াম রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে এবং ভিটামিন সি রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বাড়াতে ভূমিকা রাখে। আরও একটি মজার বিষয় হলো, আলু সিদ্ধ করার পর ঠান্ডা করে খেলে এতে রেজিস্ট্যান্ট স্টার্চ তৈরি হয়।
এই রেজিস্ট্যান্ট স্টার্চ সাধারণ স্টার্চের মতো দ্রুত হজম হয় না। বরং এটি অন্ত্রের উপকারী ব্যাকটেরিয়ার খাবার হিসেবে কাজ করে এবং রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করতে পারে।
মিষ্টি আলু
মিষ্টি আলুতে সাদা আলুর সব উপকারিতার পাশাপাশি রয়েছে বিটা-ক্যারোটিন, যা শরীরে গিয়ে ভিটামিন এ-তে পরিণত হয়।
এটি চোখের স্বাস্থ্য ভালো রাখে, রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বাড়ায় ও শরীরের প্রদাহ কমাতে সাহায্য করে। এ ছাড়া মিষ্টি আলুতে আঁশও তুলনামূলক বেশি থাকে, ফলে এটি ধীরে হজম হয় এবং দীর্ঘ সময় পেট ভরা রাখে।
আলু খাওয়ার সময় কী বিষয়ে সতর্ক থাকবেন?
আলুর সবচেয়ে বড় সমস্যা আলু নয়, বরং যেভাবে এটি রান্না করা হয়। ফ্রেঞ্চ ফ্রাই, চিপস বা অতিরিক্ত মাখন, চিজ ও ক্রিম দিয়ে তৈরি আলুর খাবারে ক্যালোরি ও অস্বাস্থ্যকর চর্বি অনেক বেশি থাকে।
অন্যদিকে সিদ্ধ বা বেক করা আলু অনেক বেশি স্বাস্থ্যকর।
তাহলে ভাত নাকি আলু, কোনটি বেশি ভালো?
পুষ্টিবিদদের মতে, পুষ্টিগুণের দিক থেকে আলু কিছুটা এগিয়ে। কারণ আলুতে প্রতি ক্যালোরিতে বেশি পরিমাণে পটাশিয়াম, ভিটামিন সি ও ভিটামিন বি৬ পাওয়া যায়। এ ছাড়া আলু তুলনামূলক বেশি সময় পেট ভরা রাখে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে ভাত খাওয়া ক্ষতিকর। সঠিক ধরনের চাল নির্বাচন করলে এবং পরিমিত পরিমাণে খেলে ভাতও একটি স্বাস্থ্যকর খাবার হতে পারে।
স্বাস্থ্যকরভাবে ভাত বা আলু খাওয়ার কয়েকটি পরামর্শ
- সম্ভব হলে ব্রাউন রাইস, লাল চাল বা কালো চাল বেছে নিন।
- ভাত বা আলুর সঙ্গে পর্যাপ্ত শাকসবজি ও প্রোটিন রাখুন।
- আলু ভেজে নয়, সিদ্ধ বা বেক করে খান।
- আলু সিদ্ধ করার পর কিছু সময় ঠান্ডা করে খেলে রেজিস্ট্যান্ট স্টার্চের পরিমাণ বাড়তে পারে।
- অতিরিক্ত মাখন, চিজ বা তেল ব্যবহার এড়িয়ে চলুন।
- পরিমাণ নিয়ন্ত্রণে রাখুন, কারণ অতিরিক্ত খাওয়া যেকোনো খাবারই স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।
ভাত ও আলু দুটিই স্বাস্থ্যকর খাদ্যতালিকার অংশ হতে পারে। তবে পুষ্টিগুণের বিচারে আলু কিছুটা এগিয়ে থাকলেও, স্বাস্থ্যকর রান্নার পদ্ধতি এবং পরিমিত পরিমাণে খাওয়াই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
শুধু একটি খাবারের ওপর নির্ভর না করে শাকসবজি, ফল, ডাল, মাছ, ডিম, মাংস ও পূর্ণ শস্যসহ বৈচিত্র্যময় খাদ্যাভ্যাসই সুস্থ থাকার সবচেয়ে ভালো উপায়।
সূত্র: প্রিভেনশন







