প্রাচীন ঢাকার সেই সন্ধ্যার শিল্পীরা

এশিয়া পোস্ট ডেস্ক
প্রাচীন ঢাকার সেই সন্ধ্যার শিল্পীরা
মাহফিলে বাইজিদের গান ও নৃত্য পরিবেশন (শিল্পী অনুপ গোমের আঁকা চিত্রকর্ম)। ছবি : সংগৃহীত

আজকের ঢাকা ব্যস্ততা, যানজট আর উঁচু ভবনের শহর। কিন্তু এই শহরের ইতিহাসের পাতায় লুকিয়ে আছে এমন অনেক গল্প, যা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের স্মৃতি থেকে মুছে যেতে বসেছে। পুরান ঢাকার সরু গলি, নবাবদের প্রাসাদ, জমিদারদের আড্ডা আর অভিজাতদের সাংস্কৃতিক আসর একসময় মুখর ছিল সুর, নৃত্য ও কবিতার আবহে।

সেই জগতের অন্যতম অংশ হয়ে ছিলেন কিছু মানুষ। নাচে-গানে-উপস্থাপনে সন্ধ্যা থেকে রাতের মনোরঞ্জনেই জীবন নিবেদিত ছিল সেই শিল্পীদের। সময়ের সাথে সাথে হয়তো নিচুচোখে বা মন্দভাষায় তাদের পরিচয় দিয়েছে মানুষ, তবে সে সময়ে বাইজিদের কাজ, পরিচয়, জীবন মোটেও তেমন ছিল না।

বাইজিদের নাম শুনলেই অনেকের মনে হয়তো কেবল নাচ-গানের আসর কিংবা বিনোদনের কথা আসে। কিন্তু বাস্তবে তাদের ভূমিকা ছিল অনেক বিস্তৃত। তারা ছিলেন সংগীতশিল্পী, নৃত্যশিল্পী, সংস্কৃতির ধারক এবং অনেক ক্ষেত্রে নিজেদের সময়ের অন্যতম শিক্ষিত ও দক্ষ নারী। ঢাকার সাংস্কৃতিক ইতিহাসে তাদের অবদান দীর্ঘদিন ধরেই উপেক্ষিত থেকে গেছে।

মোগল আমলে সূচনা

ঢাকার বাইজি সংস্কৃতির শিকড় খুঁজতে হলে ফিরে যেতে হবে মোগল যুগে। সপ্তদশ শতকের শুরুতে যখন ইসলাম খান বাংলার রাজধানী রাজমহল থেকে ঢাকায় স্থানান্তর করেন, তখন শহরটি দ্রুত প্রশাসনিক ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠতে শুরু করে।

মোগল দরবারে সংগীত, নৃত্য ও শিল্পকলার চর্চা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সম্রাটদের পাশাপাশি প্রাদেশিক শাসকরাও শিল্পীদের পৃষ্ঠপোষকতা করতেন। সেই ধারাবাহিকতায় ঢাকাতেও গড়ে ওঠে নর্তকী, গায়িকা ও শিল্পীদের একটি সমৃদ্ধ জগৎ। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এদের মধ্য থেকেই বাইজি সংস্কৃতির বিকাশ ঘটে।

তৎকালীন সমাজে বাইজিরা কেবল বিনোদনদাতা ছিলেন না। অনেকেই শাস্ত্রীয় সংগীত, কাব্য, ভাষা ও আচার-আচরণে প্রশিক্ষিত ছিলেন। অভিজাত পরিবারগুলোর তরুণদের সামাজিক আচরণ শেখানোর ক্ষেত্রেও কখনও কখনও তাদের ভূমিকা ছিল।

নবাবদের পৃষ্ঠপোষকতায় উত্থান

উনিশ শতকে ঢাকার নবাব পরিবার বাইজি সংস্কৃতির অন্যতম প্রধান পৃষ্ঠপোষক হয়ে ওঠে। বিশেষ করে নবাব আবদুল গণি ও নবাব আহসানউল্লাহর সময় ঢাকার সাংস্কৃতিক জীবন নতুন মাত্রা লাভ করে।

ছবি : সংগৃহীত
ছবি : সংগৃহীত

আহসান মঞ্জিলে প্রায়ই সংগীতানুষ্ঠান, নৃত্যপ্রদর্শনী এবং বিশেষ সাংস্কৃতিক আসরের আয়োজন হতো। এসব অনুষ্ঠানে স্থানীয় শিল্পীদের পাশাপাশি কলকাতা, লখনউ, দিল্লি ও উত্তর ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে খ্যাতিমান বাইজিদের আমন্ত্রণ জানানো হতো।

তখনকার সমাজে একজন বিখ্যাত বাইজির উপস্থিতি ছিল মর্যাদার বিষয়। ধনী জমিদার ও অভিজাত পরিবারগুলো বিশেষ অনুষ্ঠানে তাদের আমন্ত্রণ জানাতে আগ্রহী থাকত।

শিল্পের সাধনায় নিবেদিত জীবন

বাইজিদের জীবন সম্পর্কে অনেক ভুল ধারণা প্রচলিত আছে। বাস্তবে তাদের বড় একটি অংশ ছিল পেশাদার শিল্পী।

একজন দক্ষ বাইজি হতে হলে বছরের পর বছর কঠোর প্রশিক্ষণ নিতে হতো। সংগীতের বিভিন্ন ধারা, বিশেষ করে খেয়াল, ঠুমরি, দাদরা, টপ্পা এবং গজল শেখা ছিল তাদের শিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। পাশাপাশি নৃত্য, কাব্য আবৃত্তি, ভাষা ও শিষ্টাচারেও দক্ষতা অর্জন করতে হতো।

তাদের মধ্যে অনেকে উর্দু, ফারসি ও হিন্দুস্তানি ভাষায় পারদর্শী ছিলেন। কিছু বাইজি নিজেও গান লিখতেন এবং সুর করতেন।

আজকের দিনের পেশাদার শিল্পীদের মতোই তারা নিজেদের শিল্পকে কেন্দ্র করেই পরিচিতি লাভ করতেন। একজন জনপ্রিয় বাইজির খ্যাতি কখনও কখনও দূর-দূরান্ত পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ত।

ঢাকার রাতের সাংস্কৃতিক আসর

একসময় ঢাকার রাত মানেই ছিল প্রাণবন্ত সাংস্কৃতিক আয়োজন। শহরের অভিজাত মহলে নিয়মিত বসত জলসা।

সেখানে থাকত সরেঙ্গির মধুর সুর, তবলায় তাল, আর প্রশিক্ষিত কণ্ঠের সংগীত পরিবেশনা। অতিথিরা গভীর রাত পর্যন্ত এসব অনুষ্ঠান উপভোগ করতেন।

ঝুলন উৎসব, বিবাহ অনুষ্ঠান, নবাবি আয়োজন কিংবা বিশেষ সামাজিক অনুষ্ঠানে বাইজিদের উপস্থিতি ছিল সাধারণ ঘটনা। এসব আসরে কেবল গান বা নাচ নয়, কবিতা পাঠ, সংগীত প্রতিযোগিতা এবং সাংস্কৃতিক আলোচনা পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হতো।

ফলে বাইজিদের ঘিরে গড়ে উঠেছিল এক ধরনের সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল, যা শহরের সামাজিক জীবনের অংশ হয়ে উঠেছিল।

গঙ্গাজলি ও পুরান ঢাকার স্মৃতি

পুরান ঢাকার ইতিহাসে গঙ্গাজলি নামটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এটি ছিল এমন একটি এলাকা, যেখানে বাইজিদের বসবাস ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র গড়ে উঠেছিল।

সন্ধ্যা নামার পর সেখানে সংগীতের আসর বসত। বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ সেই পরিবেশনা দেখতে ও শুনতে আসতেন।

ছবি : সংগৃহীত
ছবি : সংগৃহীত

আজ সেই গঙ্গাজলির অধিকাংশ স্মৃতি হারিয়ে গেছে। আধুনিক নগরায়ণ, জনসংখ্যার চাপ এবং সময়ের পরিবর্তনে সেই সাংস্কৃতিক কেন্দ্রগুলো বিলীন হয়ে গেছে। কিন্তু পুরোনো স্মৃতিকথা, সাহিত্য এবং ঐতিহাসিক নথিতে তাদের উপস্থিতির কথা এখনও পাওয়া যায়।

সমাজের দ্বৈত দৃষ্টিভঙ্গি

বাইজিদের প্রতি সমাজের মনোভাব ছিল জটিল।

একদিকে তারা ছিলেন প্রশংসিত শিল্পী। তাদের গান শুনতে এবং নৃত্য দেখতে সমাজের প্রভাবশালী ব্যক্তিরা ভিড় জমাতেন। অন্যদিকে সামাজিক মর্যাদার প্রশ্নে তাদের প্রায়ই অবহেলা করা হতো।

এই দ্বৈত অবস্থান বাইজিদের জীবনে নানা ধরনের সংকট তৈরি করেছিল। তারা সমাজের সাংস্কৃতিক জীবনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখলেও পূর্ণ সামাজিক স্বীকৃতি খুব কমই পেয়েছেন।

নারীর স্বাধীনতা, শিল্পচর্চা এবং সামাজিক অবস্থান নিয়ে সেই সময়ের রক্ষণশীল ধারণাগুলোও তাদের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রভাবিত করেছিল।

বাইজি ও গণিকার পার্থক্য

ঐতিহাসিক আলোচনায় প্রায়ই বাইজি ও গণিকাকে এক করে দেখা হয়। কিন্তু বাস্তবে এই দুই পরিচয়ের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য ছিল।

বাইজিরা মূলত প্রশিক্ষিত শিল্পী হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তাদের প্রধান পরিচয় ছিল সংগীত ও নৃত্য পরিবেশনা।

অন্যদিকে গণিকাদের পেশাগত পরিচয় ছিল ভিন্ন। যদিও কিছু ক্ষেত্রে দুই জগতের মধ্যে সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল, তবু ইতিহাসবিদরা সাধারণত বাইজি সংস্কৃতিকে একটি স্বতন্ত্র সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান হিসেবেই বিবেচনা করেন।

এই পার্থক্য না বোঝার কারণে বাইজিদের শিল্পীসত্তা অনেক সময় আড়ালে পড়ে গেছে।

সমাজকল্যাণে অবদান

ইতিহাসের একটি কম আলোচিত দিক হলো সমাজকল্যাণমূলক কাজে কিছু বাইজির অংশগ্রহণ।

তাদের মধ্যে অনেকে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, জনকল্যাণমূলক প্রকল্প এবং স্থানীয় উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে অর্থ সহায়তা করেছেন। কিছু বাইজি পুকুর খনন, মন্দির সংস্কার কিংবা জনসাধারণের সুবিধার জন্য বিভিন্ন প্রকল্পে অর্থ দান করেছিলেন।

এ থেকে বোঝা যায় যে তাদের সামাজিক ভূমিকা কেবল বিনোদনের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। তারা নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী সমাজের জন্যও অবদান রাখার চেষ্টা করেছিলেন।

পতনের শুরু

বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধ থেকেই বাইজি সংস্কৃতির অবক্ষয় শুরু হয়।

প্রথমত, সমাজে নতুন ধরনের বিনোদনের মাধ্যম জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। গ্রামোফোন রেকর্ড, রেডিও এবং পরে সিনেমা মানুষের বিনোদনের ধরণ বদলে দেয়।

দ্বিতীয়ত, ব্রিটিশ আমলে সামাজিক সংস্কার আন্দোলন এবং নৈতিকতার নতুন ধারণা বাইজি সংস্কৃতিকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে।

তৃতীয়ত, জমিদারি প্রথার পতন এবং নবাবি ক্ষমতার অবসানের ফলে পৃষ্ঠপোষকতার প্রধান উৎসগুলো হারিয়ে যায়।

দেশভাগের পর পরিস্থিতি আরও বদলে যায়। বহু শিল্পী অন্যত্র চলে যান, আবার অনেকে পেশা পরিবর্তন করতে বাধ্য হন।

ইতিহাসের আড়ালে হারিয়ে যাওয়া নারীরা


ছবি : সংগৃহীত
ছবি : সংগৃহীত


আজ যখন আমরা ঢাকার ইতিহাস নিয়ে কথা বলি, তখন নবাব, জমিদার, ব্যবসায়ী কিংবা রাজনৈতিক নেতাদের কথা বেশি শুনি। কিন্তু বাইজিদের মতো নারীরা প্রায়ই ইতিহাসের মূলধারার বাইরে থেকে যান।

তাদের গল্প আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে একটি শহরের ইতিহাস শুধু রাজনীতি বা প্রশাসনের ইতিহাস নয়। এটি সংস্কৃতি, শিল্প, সংগীত এবং সাধারণ মানুষের জীবনকাহিনিরও ইতিহাস।

বাইজিরা ছিলেন সেই ইতিহাসের অংশ, যারা তাদের কণ্ঠ, নৃত্য ও শিল্পের মাধ্যমে একটি যুগকে প্রাণবন্ত করে তুলেছিলেন।

স্মৃতির শহরে তাদের স্থান

আজ পুরান ঢাকার বহু পুরোনো স্থাপনা বিলীন হয়ে যাচ্ছে। সময়ের সঙ্গে হারিয়ে যাচ্ছে সেইসব মানুষের স্মৃতিও, যারা একসময় এই শহরের সাংস্কৃতিক পরিচয় নির্মাণ করেছিলেন।

তবু ইতিহাসের নথি, সাহিত্য, পুরোনো সংবাদপত্র এবং গবেষণার পাতায় তাদের অস্তিত্ব এখনও রয়ে গেছে। সেই সূত্রগুলো আমাদের জানায়, ঢাকার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য অনেক বেশি বৈচিত্র্যময় এবং সমৃদ্ধ ছিল, যতটা আমরা সাধারণত কল্পনা করি।

হারিয়ে যাওয়া বাইজি সংস্কৃতির ইতিহাস কেবল কিছু শিল্পীর গল্প নয়। এটি একটি শহরের সাংস্কৃতিক বিবর্তনের গল্প, সমাজের পরিবর্তনের গল্প এবং এমন এক জগতের গল্প, যার সুর আজ আর শোনা যায় না, কিন্তু যার প্রতিধ্বনি এখনও ইতিহাসের অলিগলিতে ভেসে বেড়ায়।

সূত্র: দ্য ডেইলি স্টার