ওজন না কমে উল্টো বাড়ছে, দায়ী হতে পারে ডায়েটের ৭ ভুল

ওজন কমানোর কথা উঠলেই বেশির ভাগ মানুষ প্রথমে ডায়েট বদলানোর কথা ভাবেন। কেউ ভাত কমিয়ে দেন, কেউ আবার একবেলা না খেয়ে থাকেন। কেউ বা শুধু সালাদ খেয়ে দিন কাটানোর চেষ্টা করেন। মনে হয় যত কম খাওয়া যাবে, তত দ্রুত ওজন কমবে।
কিন্তু বাস্তবতা সবসময় এমন নয়। অনেক সময় দেখা যায়, অনেক চেষ্টা করার পরও ওজন কমছে না। আবার কারও ক্ষেত্রে উল্টো ওজন বেড়েই যাচ্ছে। এর পেছনে বড় কারণ হতে পারে ডায়েটে করা কিছু সাধারণ ভুল।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ওজন নিয়ন্ত্রণ শুধু কম খাওয়ার বিষয় নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে শরীরের বিপাকক্রিয়া, হরমোন, ক্যালোরির ভারসাম্য এবং সঠিক পুষ্টি।
২০২৬ সালের ন্যাশনাল ফ্যামিলি হেলথ সার্ভের তথ্য অনুযায়ী, ওজন নিয়ন্ত্রণ এখন একটি বড় জনস্বাস্থ্য চ্যালেঞ্জ। অন্যদিকে, ওয়ার্ল্ড মেট্রিক রিপোর্ট ২০২৬ বলছে, প্রায় ৩ হাজার ৫০০ ক্যালোরির ঘাটতি তৈরি হলে শরীর থেকে প্রায় ৪৫০ গ্রাম চর্বি কমতে পারে। অর্থাৎ, ডায়েটের ছোট ছোট ভুলও ওজন কমানোর পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
চলুন জেনে নেওয়া যাক এমন সাতটি ভুল সম্পর্কে, যেগুলো অনেকেই অজান্তেই করে থাকেন।
খুব কম ক্যালোরি খাওয়া
অনেকের ধারণা, যত কম খাওয়া যাবে, তত দ্রুত ওজন কমবে। কিন্তু এটি সবচেয়ে বড় ভুলগুলোর একটি। ক্লিনিক্যাল নিউট্রিশন জার্নালে প্রকাশিত গবেষণা বলছে, অতিরিক্ত ক্যালোরি কমিয়ে দিলে শরীরের বিপাকক্রিয়া ধীর হয়ে যায়। এমনকি শরীর নিজেকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য শক্তি খরচ কমিয়ে দেয়। একে অনেক সময় স্টারভেশন মোড বলা হয়। এতে শরীর প্রয়োজনীয় পুষ্টিও পায় না।
কী করবেন
- ধীরে ধীরে ক্যালোরি কমান।
- দিনের বিভিন্ন সময়ে পরিমিত খাবার খান।
- প্রতিটি খাবারে প্রোটিন, শর্করা ও স্বাস্থ্যকর চর্বির ভারসাম্য রাখুন।
নিয়মিত খাবার বাদ দেওয়া
অনেকেই ব্যস্ততার কারণে সকালের নাশতা বা দুপুরের খাবার বাদ দেন। আবার কেউ ইচ্ছা করেই একবেলা না খেয়ে থাকেন। এতে পরে অতিরিক্ত ক্ষুধা লাগে এবং একসঙ্গে বেশি খাওয়ার প্রবণতা তৈরি হয়। পাশাপাশি রক্তে শর্করার ওঠানামাও বাড়ে। নিউট্রিয়েন্টস জার্নালে প্রকাশিত গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত সকালের নাশতা বাদ দিলে বিপাকজনিত বিভিন্ন সমস্যার ঝুঁকি বাড়তে পারে।
খাবার বাদ দিলে লেপটিন ও ঘ্রেলিন নামে ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণকারী হরমোনও প্রভাবিত হয়।
কী করবেন
- প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে খাবার খান।
- তিন বেলার প্রধান খাবার নিয়মিত খাওয়ার অভ্যাস করুন।
- এতে সারাদিন শক্তি বজায় থাকবে এবং অতিরিক্ত ক্ষুধাও কম লাগবে।
স্বাস্থ্যকর খাবারও অতিরিক্ত খাওয়া
বাদাম, গ্র্যানোলা, স্মুদি বা বিভিন্ন স্বাস্থ্যকর খাবার শরীরের জন্য উপকারী। কিন্তু এগুলোও ক্যালোরিসমৃদ্ধ হতে পারে। অনেকেই মনে করেন স্বাস্থ্যকর খাবার যত খুশি খাওয়া যায়। কিন্তু অতিরিক্ত পরিমাণে খেলে ওজন বাড়ার ঝুঁকি থেকেই যায়।
কী করবেন
- পরিমাণ বুঝে খাবার খান।
- খাবারের পুষ্টিগুণের লেবেল পড়ে নিন।
- প্রয়োজন অনুযায়ী দৈনিক খাদ্যতালিকা তৈরি করুন।
খাবারে পর্যাপ্ত প্রোটিন না রাখা
আমেরিকান জার্নাল অব নিউট্রিশনে প্রকাশিত গবেষণা বলছে, পর্যাপ্ত প্রোটিন ওজন নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। প্রোটিন দীর্ঘ সময় পেট ভরা রাখতে সাহায্য করে এবং শরীরের বিপাকক্রিয়া বাড়ায়। অন্যদিকে, প্রোটিনের ঘাটতি হলে পেশি কমে যেতে পারে এবং শরীরে চর্বি পোড়ানোর গতি ধীর হয়ে যায়।
কী করবেন
প্রতিটি খাবারে কিছু না কিছু প্রোটিন রাখুন। যেমন— ডিম, ডাল, পনির, মাছ, মুরগির মাংস ও অন্যান্য লিন প্রোটিন।
তরল খাবারের ক্যালোরি ভুলে যাওয়া
অনেকেই শুধু খাবারের ক্যালোরি হিসাব করেন, কিন্তু পানীয়ের ক্যালোরি উপেক্ষা করেন। মিষ্টি পানীয়, সফট ড্রিংকস, ফলের জুস কিংবা বিভিন্ন স্মুদিতে অনেক সময় প্রচুর ক্যালোরি থাকে। ফলে অজান্তেই দৈনিক ক্যালোরি বেড়ে যায়।
কী করবেন
চিনিযুক্ত পানীয়ের পরিবর্তে বেছে নিতে পারেন সাধারণ পানি, লেবুর পানি, ঘোল বা কম চিনি দিয়ে তৈরি প্রাকৃতিক পানীয়।
মানসিক চাপ থেকে বেশি খাওয়া
অনেকেরই অভ্যাস আছে মন খারাপ হলে বা কাজের চাপ বেশি থাকলে বেশি খাওয়ার। হেলথ সাইকোলজি রিভিউতে প্রকাশিত গবেষণা অনুযায়ী, মানসিক চাপের সময় কর্টিসল হরমোন বেড়ে যায়। এতে বেশি খাওয়ার ইচ্ছা তৈরি হয় এবং ওজন নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে পড়ে।
কী করবেন
- ক্ষুধা আর আবেগের পার্থক্য বোঝার চেষ্টা করুন।
- ধীরে ধীরে মনোযোগ দিয়ে খাবার খান।
- নিয়মিত হাঁটা, যোগব্যায়াম বা অন্য কোনো ব্যায়াম করুন।
- পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিন।
অবাস্তব প্রত্যাশা নিয়ে ডায়েট করা
দ্রুত ওজন কমানোর আশায় অনেকেই জনপ্রিয় নানা ক্র্যাশ ডায়েট অনুসরণ করেন। কিন্তু এসব ডায়েট দীর্ঘমেয়াদে শরীরের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। এতে পুষ্টির ঘাটতি তৈরি হয় এবং অনেক সময় ওজন কমে আবার দ্রুত বেড়েও যায়।
কী করবেন
- ধীরে ধীরে ওজন কমানোর লক্ষ্য রাখুন।
- দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস গড়ে তুলুন।
- দ্রুত ফলের বদলে স্থায়ী পরিবর্তনের দিকে নজর দিন।
বিশেষজ্ঞ কী বলছেন
নয়াদিল্লির ফোর্টিস সেন্টার অব এক্সেলেন্স ফর ডায়াবেটিস, মেটাবলিক ডিজিজেস অ্যান্ড এন্ডোক্রিনোলজির চেয়ারম্যান ডা. অনুপ মিশ্র বলেন, ওজন কমানো মানে শুধু কম খাওয়া নয়, বরং সঠিকভাবে খাওয়া। অতিরিক্ত কঠোর ডায়েট, অনিয়মিত খাবার এবং পর্যাপ্ত প্রোটিন না খাওয়া ওজন কমানোর ক্ষেত্রে মানুষের সবচেয়ে বড় ভুলগুলোর মধ্যে অন্যতম।
বুঝবেন কীভাবে আপনার ডায়েট কাজ করছে কি না
শরীর কিছু লক্ষণের মাধ্যমে জানিয়ে দেয় যে বর্তমান খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন আনা দরকার। যেমন—সবসময় ক্লান্ত লাগা, বারবার ক্ষুধা লাগা, দীর্ঘদিন ওজন একই জায়গায় আটকে থাকা ও শরীরে পেশি কমে যাওয়া।
দীর্ঘমেয়াদে ওজন কমাতে কী করবেন
স্বাস্থ্যকরভাবে ওজন কমাতে হলে শুধু ডায়েট করলেই হবে না। জীবনযাপনের পুরো ধরনেই পরিবর্তন আনতে হবে এজন্য। বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে সুষম খাদ্যে, নিয়মিত সময়ে খাবার খাওয়ায়, শক্তি বাড়ানোর ব্যায়াম, পর্যাপ্ত পানি পান করা ও প্রতিদিন ভালো ঘুমের দিকে।
মনে রাখবেন, ওজন কমানোর পথে সবচেয়ে বড় বাধা অনেক সময় বড় কোনো সমস্যা নয়, বরং ছোট ছোট ভুল অভ্যাস।
তাই দ্রুত ফল পাওয়ার আশায় কঠোর ডায়েটের দিকে না ঝুঁকে এমন খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলা উচিত, যা দীর্ঘদিন ধরে অনুসরণ করা সম্ভব। এতে শুধু ওজন নিয়ন্ত্রণই সহজ হবে না, শরীরও থাকবে সুস্থ।
যাদের ওজন কমাতে সমস্যা হচ্ছে বা দীর্ঘদিন চেষ্টা করেও কাঙ্ক্ষিত ফল পাচ্ছেন না, তারা একজন পুষ্টিবিদ বা ডায়েটিশিয়ানের পরামর্শ নিতে পারেন। ব্যক্তিগত শারীরিক অবস্থা অনুযায়ী পরিকল্পনা করলে স্বাস্থ্যকরভাবে ওজন নিয়ন্ত্রণ করা অনেক সহজ হয়।
সূত্র : এনডিটিভি







