মাথা ন্যাড়া করলে কি সত্যিই চুল ঘন হয়

অনেক পরিবারেই একটি বিশ্বাস প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসছে। ছোটবেলায় সন্তানের মাথা ন্যাড়া করে দিলে নাকি বড় হয়ে তার চুল আরও ঘন, শক্ত এবং সুন্দর হবে। শুধু শিশুদের ক্ষেত্রেই নয়, অনেক প্রাপ্তবয়স্ক মানুষও চুল পাতলা হয়ে গেলে একবার মাথা ন্যাড়া করার কথা ভাবেন। তাদের ধারণা, এতে নতুন চুল আরও ভালোভাবে গজাবে।
কিন্তু এই বিশ্বাসের পেছনে কি সত্যিই কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি আছে? সহজ উত্তর হলো, না।
মাথা ন্যাড়া করলে চুলের বৃদ্ধি, ঘনত্ব বা গোড়ার শক্তি কোনোটিই বাড়ে না। তবে কেন এত মানুষ এখনো এই বিশ্বাসে আস্থা রাখেন, সেই গল্পটি বেশ মজার। চুল কীভাবে বেড়ে ওঠে, তা বুঝতে পারলেই এই ভুল ধারণার আসল কারণ পরিষ্কার হয়ে যায়।
চুল আসলে কীভাবে গজায়
চুলের জন্ম হয় ত্বকের নিচে থাকা ছোট ছোট গঠন থেকে, যেগুলোকে বলা হয় হেয়ার ফলিকল। মাথার ত্বকের নিচে থাকা এই ফলিকলগুলোই নতুন চুল তৈরি করে।
চুল কত দ্রুত বাড়বে, কতটা ঘন হবে কিংবা কতটা স্বাস্থ্যকর হবে, তা মূলত নির্ভর করে কয়েকটি বিষয়ে। যেমন - বংশগত বৈশিষ্ট্য, শরীরের হরমোনের ভারসাম্য, সামগ্রিক স্বাস্থ্য ও পুষ্টিকর খাবার গ্রহণের ওপর।
সাধারণত প্রতিটি চুল একটি নির্দিষ্ট জীবনচক্র অনুসরণ করে।
অ্যানাজেন পর্যায়: এটি চুলের সক্রিয় বৃদ্ধির সময়। এই পর্যায়ে চুল নিয়মিত বাড়তে থাকে এবং এটি কয়েক বছর পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে।
ক্যাটাজেন পর্যায়: এটি একটি স্বল্প সময়ের পরিবর্তনের ধাপ। এই সময়ে চুলের বৃদ্ধি থেমে যায় এবং ফলিকল ছোট হতে শুরু করে।
টেলোজেন পর্যায়: এটি বিশ্রামের পর্যায়। এই ধাপ শেষ হলে পুরোনো চুল স্বাভাবিকভাবে ঝরে পড়ে এবং তার জায়গায় নতুন চুল গজাতে শুরু করে।
মাথা ন্যাড়া করলে কেবল ত্বকের ওপরে থাকা চুলের অংশটি কেটে যায়। কিন্তু ত্বকের নিচে থাকা হেয়ার ফলিকলের কোনো পরিবর্তন হয় না। ফলে চুলের স্বাভাবিক বৃদ্ধি আগের মতোই চলতে থাকে।
ন্যাড়া করার পর চুল ঘন মনে হয় কেন?
অনেকেই বলেন, মাথা ন্যাড়া করার পর নতুন চুল আগের তুলনায় মোটা বা কালো দেখায়। আসলে এটি একটি চোখের ভুল ধারণা।
স্বাভাবিকভাবে বাড়তে থাকা চুলের আগা ধীরে ধীরে সরু ও নরম হয়ে যায়। কিন্তু রেজার দিয়ে চুল কাটা হলে চুলের মাথা ভোঁতা হয়ে যায়। পরে সেই চুল আবার বড় হতে শুরু করলে সেটি তুলনামূলক মোটা, শক্ত ও গাঢ় দেখায়।
এই পরিবর্তন শুধু চেহারায় দেখা যায়। চুলের প্রকৃত গঠন, ঘনত্ব বা শক্তিতে কোনো পরিবর্তন আসে না।
ছোটবেলায় মাথা ন্যাড়া করার প্রচলিত বিশ্বাস
বাংলাদেশসহ বিশ্বের অনেক সংস্কৃতিতে শিশুর মাথা ন্যাড়া করার একটি দীর্ঘদিনের প্রচলন রয়েছে। অনেকেই বিশ্বাস করেন, এতে ভবিষ্যতে চুল আরও ভালোভাবে গজায়। অনেক ক্ষেত্রে এই প্রথার সাংস্কৃতিক বা ধর্মীয় গুরুত্ব থাকতে পারে। তবে বৈজ্ঞানিকভাবে এটি চুলের ফলিকলের বিকাশে কোনো প্রভাব ফেলে না।
যদি কোনো শিশুর বংশগত কারণে ঘন চুল হওয়ার বৈশিষ্ট্য থাকে, তাহলে ন্যাড়া করা হোক বা না হোক, তার চুল স্বাভাবিকভাবেই ঘন হবে। আবার যদি স্বাভাবিকভাবেই চুল পাতলা হয়, তাহলে ন্যাড়া করলেও সেই বৈশিষ্ট্য বদলাবে না।
তবে একটি বিষয় ঘটতে পারে। জন্মের পর থাকা অসমান বেবি হেয়ার কেটে যাওয়ার ফলে নতুন চুল সমানভাবে উঠতে পারে। এতে অনেকের কাছে চুল আগের চেয়ে ভালো হয়েছে বলে মনে হয়।
তাহলে মাথা ন্যাড়া করার কোনো উপকার নেই?
চুল গজানোর ক্ষেত্রে না থাকলেও মাথা ন্যাড়া করার কিছু পরোক্ষ সুবিধা থাকতে পারে।
মাথার ত্বক পরিষ্কার রাখা সহজ হয়। ঘাম, অতিরিক্ত তেল এবং বিভিন্ন হেয়ার প্রোডাক্টের জমে থাকা অংশ সহজে পরিষ্কার করা যায়। এতে মাথার ত্বক পরিচ্ছন্ন থাকে এবং ফলিকলের জন্য ভালো পরিবেশ তৈরি হয়।
এ ছাড়া যারা দীর্ঘদিন ধরে অতিরিক্ত হিট স্টাইলিং, রাসায়নিক ট্রিটমেন্ট বা পরিবেশগত কারণে চুলের ক্ষতির শিকার হয়েছেন, তাদের অনেকেই নতুনভাবে চুলের যত্ন নেওয়ার জন্য মাথা ন্যাড়া করার সিদ্ধান্ত নেন।
তবে এই সুবিধাগুলো আসে ভালো স্ক্যাল্প কেয়ার ও পরিচ্ছন্নতার কারণে, ন্যাড়া করার কারণে নয়।
সূত্র: দ্য ওয়েলনেস কর্নার







