logo

স্বপ্নের ইউরোপ যাত্রা /ইতালির কথা বলে লিবিয়ায় নিয়ে মুক্তিপণ দাবি, ছেলেকে বাঁচাতে নাকফুলও বিক্রি মায়ের

আফছার হোসাইন
আফছার হোসাইন, মিশর
ইতালির কথা বলে লিবিয়ায় নিয়ে মুক্তিপণ দাবি, ছেলেকে বাঁচাতে নাকফুলও বিক্রি মায়ের
স্বপ্নের ইউরোপের যাত্রার আগে মায়ের সাথে আল আমিন। ছবি: এশিয়া পোস্ট কোলাজ

স্বামীহারা লুৎফা বেগমের বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন ছেলে সৈয়দ মো. আল আমিন। তাঁর স্বামীও এক সময় বিদেশ বিভুঁইয়ে ছিলেন। মায়ের চাওয়া, ছেলেকে তিনি বিদেশ যেতে দেবেন না। ছেলে লেখাপড়া শেষ করে নিজের পায়ে দাঁড়াবে এবং দেশে থেকেই কিছু একটা করবে। কিন্তু আল আমিনের স্বপ্ন যে করেই হোক তাকে ইউরোপ যেতে হবে। পরিচিত এক আত্মীয়ের মাধ্যমে শেষ পর্যন্ত ইতালি যাওয়ার সেই স্বপ্ন পূরণের পথে পা বাড়ায় আল আমিন।

কিন্তু দালালরা তাকে মিথ্যা আশ্বাসে লিবিয়ায় নিয়ে গিয়ে তুলে দেয় মাফিয়া চক্রের হাতে। সেখান থেকে দফায় দফায় মুক্তিপণ দাবি করা হয়। ছেলেকে বাঁচাতে কয়েক দফায় ৪২ লাখ তুলে দেন লুৎফা বেগম। এজন্য বিক্রি করেন জমিজমা, গয়না এমনকি নাঁকফুলটাও। কিন্তু ২ বছরেও ছেলেকে দেশে ফেরাতে পারেননি তিনি। দীর্ঘ অনিশ্চয়তা ও উৎকণ্ঠার পর অবশেষে আল আমিনের সন্ধান মিলেছে মিশরে।

মিশর থেকে দেশে ফিরলেন ভূমধ্যসাগরে উদ্ধার হওয়া আরও ৪১ বাংলাদেশি

গত ১৪ সেপ্টেম্বর লিবিয়ার তবরুক থেকে গ্রিসের উদ্দেশে রাবারের নৌকায় যাত্রা করা ৪৬ অভিবাসনপ্রত্যাশীর মধ্যে ছিলেন আল আমিন। ভূমধ্যসাগরে মিশরের সিদি বারানি উপকূলের কাছে একটি বাণিজ্যিক জাহাজ তাঁদের উদ্ধার করে। এশিয়া পোস্টের মিশর প্রতিবেদকের সঙ্গে মুঠোফোনে কথা বলতে গিয়ে লুৎফা বেগম তুলে ধরেন ছেলের ইউরোপযাত্রার স্বপ্ন, দালালদের নানা প্রতিশ্রুতি, লিবিয়ায় অপহরণ ও মুক্তিপণ দাবির অভিযোগ এবং সন্তানকে বাঁচাতে একজন মায়ের সর্বস্ব হারানোর মর্মান্তিক কাহিনি।

পড়াশোনা ছেড়ে ইউরোপ যাওয়ার স্বপ্ন

লুৎফা বেগম জানান, মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর আল আমিন আর পড়াশোনা চালিয়ে যেতে চায়নি। ইউরোপে যাওয়ার স্বপ্নে বিভোর ছেলে প্রায়ই তাঁকে বলত, বাংলাদেশে থাকতে চায় না; বিদেশে গিয়ে নিজের ভবিষ্যৎ গড়তে চায়। প্রথমে মা ছেলেকে দেশে থেকেই পড়াশোনা শেষ করার পরামর্শ দেন। তাঁর স্বামীও বিদেশে থাকতেন। তিনি চেয়েছিলেন, ছেলে লেখাপড়া শেষ করে নিজের পায়ে দাঁড়াক। কিন্তু পরিচিত এক আত্মীয়ের মাধ্যমে ইতালিতে যাওয়ার প্রস্তাব পাওয়ার পর আল আমিনের আগ্রহ আরও বেড়ে যায়।

একমাত্র বোন ও মায়ের সঙ্গে আল আমিন
একমাত্র বোন ও মায়ের সঙ্গে আল আমিন

মায়ের অভিযোগ, শিপন নামের পরিচিত এক ব্যক্তি তাঁকে এবং তার ছেলেকে নানাভাবে প্ররোচিত করেন। পরিচিত লোকজনের মাধ্যমে বৈধ ভিসায় সরাসরি ইতালি পাঠানোর আশ্বাস দেওয়া হয়। আত্মীয়তার সম্পর্ক ও পরিচিত মানুষের কথায় বিশ্বাস করে শেষ পর্যন্ত ছেলেকে বিদেশে পাঠাতে রাজি হন লুৎফা বেগম।

ভূমধ্যসাগরে উদ্ধার ৬ বাংলাদেশিকে ফেরত পাঠাল মিশর

ছেলেকে ইতালি পাঠানোর জন্য ১৬ লাখ টাকার চুক্তি হয়। প্রথমে ১৪ লাখ টাকা প্রদান করা হবে এবং বাকি দুই লাখ টাকা ইতালিতে পৌঁছানোর পর দেওয়ার কথা ছিল। চুক্তি অনুযায়ী টাকা দেওয়ার পর ছেলেকে নিয়ে ঢাকার বিমানবন্দরে যান লুৎফা বেগম। কিন্তু যাত্রার সময় তাঁকে জানানো হয়, আল আমিনকে দুবাই হয়ে যেতে হবে। প্রথমে বিষয়টিকে স্বাভাবিক ট্রানজিট মনে করলেও পরে জানতে পারেন, ছেলেকে দুবাইয়ে দীর্ঘ সময় অবস্থান করতে হচ্ছে।

একপর্যায়ে আল আমিনকে লিবিয়ায় নেওয়ার কথা জানতে পেরে তীব্র আপত্তি জানান তিনি। সরাসরি ইতালি যাওয়ার ব্যবস্থা না হলে ছেলেকে দেশে ফিরিয়ে দেওয়ার অনুরোধও জানান তিনি। কিন্তু তার সেই অনুরোধ উপেক্ষা করে আল আমিনকে লিবিয়ায় নেওয়া হয়।

লিবিয়ায় মুক্তিপণ দাবি, অসহায় মায়ের আকুতি

লিবিয়ায় পৌঁছানোর পর প্রায় এক সপ্তাহ ছেলের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেননি লুৎফা বেগম। পরে আল আমিন ফোন করে জানায়, তাকে লিবিয়ায় নিয়ে আসা হয়েছে। তিনি ছেলেকে ফেরত পাঠাতে শিপনে এবং খাইরুল নামের সংশ্লিষ্ট এক ব্যক্তির কাছে বারবার ছেলেকে দেশে ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য অনুরোধ করেন। কিন্তু শিপন আশ্বাস দিলেও ছেলেকে ফেরানোর ব্যবস্থা করেনি। একপর্যায়ে তাঁকে জানানো হয়, আল আমিনকে মাফিয়াদের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। ছেলেকে নির্যাতনের ভিডিও দেখিয়ে দাবি করা হয় মোটা অঙ্কের অর্থ। ছেলেকে নির্যাতনের দৃশ্য সহ্য করতে না পেরে বারবার মূর্ছা যান তিনি।

মিশর উপকূলে ভেসে এলো খালি নৌকা, যাত্রী কোথায়?

আল আমিনকে মুক্ত করার আশ্বাসে তিনি ও তাঁর বোনের জামাই মিলে দালাল চক্রকে আরও ২৪ লাখ টাকা দেন। একপর্যায়ে আল আমিন দিয়ে ফোনে মাফিয়ারা তাকে মুক্ত করার জন্য আরও ২০ লাখ টাকা দাবি করে। এভাবে কয়েক দফায় সব মিলিয়ে প্রায় ৪২ লাখ টাকা দিতে হয় দালাল চক্রকে। কিন্তু দুই বছরেও ছেলেকে দেশে ফেরত পাঠায়নি তারা। এই টাকা জোগাড় করতে নিজের গয়না বিক্রি করেন লুৎফা বেগম। এমনকি বিক্রি করে দেন নাকফুলটিও।

বিপুল অর্থ ব্যয় করেও সন্তানকে ফেরত না পেয়ে শেষ পর্যন্ত দালাল চক্রের বিরুদ্ধে মামলা করেন লুৎফা বেগম। মামলায় শিপন, রাশেদ, খাইরুল ও ইব্রাহিমসহ ৬ জনকে আসামি করা হয়েছে বলে জানান তিনি। মামলাটি বর্তমানে সিআইডিতে তদন্তাধীন আছে বলেও জানান লুৎফা বেগম।

দুই বছর পর আবারও ইউরোপের পথে আল আমিন

লুৎফা বেগমের বর্ণনা অনুযায়ী, লিবিয়ায় আল আমিনকে উদ্ধার করা হলেও বাংলাদেশে ফেরানো সম্ভব হয়নি। দীর্ঘ সময় সেখানে থাকার পর আবারও ইউরোপে যাওয়ার প্রলোভন দেখানো হয় তাঁকে। দেশ থেকে রওয়ানা হওয়ার সময় আল আমিনের বয়স ছিল প্রায় ১৯ বছর। বর্তমানে তাঁর বয়স ২১ বছর। এবার ইব্রাহিম নামের এক ব্যক্তি তাকে কম খরচে গ্রিসে যাওয়ার প্রস্তাব দেন। সেখানে পৌঁছাতে পারলে কাজ করে ঋণ শোধ করা যাবে বলেও তাঁকে আশ্বস্ত করা হয়।

আগের যাত্রায় বিপুল অর্থ খরচ করে সর্বস্ব হারানোর পর নতুন করে টাকা দেওয়া লুৎফা বেগমের পক্ষে সম্ভব ছিল না। কিন্তু ছেলের বারবার অনুরোধ এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির আশ্বাসে শেষ পর্যন্ত মেয়ের জামাইয়ের কাছ থেকে দেড় লাখ টাকা ধার নেন তিনি। সেই টাকা ইব্রাহিমের দেওয়া ব্যাংক হিসাবে জমা দেন বলে দাবি তাঁর। কিন্তু আবারও ছেলের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।

নৌকাডুবির খবর শুনে দিশেহারা মা

প্রায় ১৭ থেকে ১৮ দিন আল আমিনের কোনো খোঁজ পাননি মা লুৎফা বেগম। এরই মধ্যে ভূমধ্যসাগরে অভিবাসনপ্রত্যাশীদের বহনকারী একটি নৌকাডুবির খবর পান তিনি। সেই নৌকায় তাঁর ছেলেও ছিল কিনা এমন আশঙ্কা জাগে মনে। সেসময় নানাভাবে ছেলের খোঁজ নেয়ার চেষ্টা করেন। দীর্ঘ উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তার পর অবশেষে আল আমিনের সন্ধান পান তিনি।

সাগরে নৌযান বিকল, মিশর উপকূলে বাংলাদেশিসহ ৫৪ জন উদ্ধার

জানতে পারেন, ৪৬ জন অভিবাসনপ্রত্যাশীর সঙ্গে মিশরের মাতরুহ পুলিশের হেফাজতে রয়েছেন আল আমিন। গত ১১ অক্টোবর মিশরের আল-আমাইন পুলিশ স্টেশনে আল আমিনের সঙ্গে দেখা করেন কায়রোয় বাংলাদেশ দূতাবাসের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রদূত ও শ্রম কাউন্সিলর। শ্রম কাউন্সিলরের মুঠোফোনে ছেলের সঙ্গে কথা বলে তাঁর বেঁচে থাকার খবর পান লুৎফা বেগম। দীর্ঘ উৎকণ্ঠার পর ছেলের জীবিত থাকার খবর পেয়ে স্বস্তি ও কৃতজ্ঞতায় আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করেন তিনি। ধন্যবাদ জানান দূতাবাসের কর্মকর্তাদেরও।