মুসোলিনির ছায়ায় যে অস্ট্রিয়ার বিশ্বকাপ স্বপ্ন ভেঙেছিল

আর্জেন্টিনার বিপক্ষে আজ অস্ট্রিয়া নামবে অঘটনের স্বপ্ন নিয়ে। রালফ রাংনিকের দল এখন হাই প্রেসিং, দ্রুত আক্রমণ আর শারীরিক তীব্রতার জন্য আলোচনায়। কিন্তু অস্ট্রিয়ার ফুটবল ইতিহাসে এমন এক সময়ও ছিল, যখন তারা অঘটন ঘটানোর দল ছিল না; বরং বিশ্বকাপ জেতার অন্যতম বড় দাবিদার ছিল। সেই দলকে বলা হতো ভুন্ডারটিম, বাংলায় যার অর্থ দাঁড়ায় বিস্ময়-দল।
১৯৩৪ বিশ্বকাপ। আয়োজক ইতালি। মঞ্চের পেছনে বেনিতো মুসোলিনির ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রযন্ত্র। আর মাঠে অস্ট্রিয়ার সেই শিল্পীসুলভ দল, যারা বল পায়ে রেখে, ছোট পাসে, জায়গা বদলে আধুনিক ফুটবলের এক আগাম ইঙ্গিত দিচ্ছিল। ইতিহাসের পাতায় ফলটা সোজা: সেমিফাইনালে ইতালির কাছে ১-০ গোলে হেরেছিল অস্ট্রিয়া। কিন্তু অস্ট্রিয়ার ফুটবল স্মৃতিতে সেই হার শুধু হার নয়; সেটি এক অমীমাংসিত ক্ষত, বিতর্কিত রেফারিং আর মুসোলিনির ছায়ায় ঢাকা এক বিশ্বকাপ স্বপ্নের গল্প।
ভুন্ডারটিমের জন্ম হুগো মাইসলের হাত ধরে। সাবেক ফুটবলার, সংগঠক, রেফারি ও ফুটবল চিন্তক মাইসল ছিলেন অস্ট্রিয়ান ফুটবলের বড় স্থপতি। ১৯১২ সালে তিনি অস্ট্রিয়া জাতীয় দলের দায়িত্ব নেন। ইংলিশ কোচ জিমি হোগানের ভাবনা থেকে তিনি যে পাসিং ফুটবলের ধারণা পেয়েছিলেন, সেটিকে অস্ট্রিয়ার মাটিতে নতুন রূপ দেন।

তখন ফুটবল অনেক বেশি সরাসরি, শারীরিক এবং এলোমেলো ছিল। কিন্তু মাইসলের অস্ট্রিয়া বলকে মাটিতে রাখত। খেলোয়াড়েরা জায়গা বদল করতেন, পাস দিয়ে প্রতিপক্ষকে টানতেন, মাঝমাঠ থেকে আক্রমণ গড়তেন। অনেক ফুটবল ইতিহাসবিদ তাই এই দলকে আধুনিক পজেশন ফুটবলের পূর্বসূরিদের একটি মনে করেন। পরের যুগে ব্রাজিল, নেদারল্যান্ডস বা স্পেন যে ধরনের বল-পায়ে ফুটবলে বিশ্বকে মুগ্ধ করেছে, তার অনেক বীজ অস্ট্রিয়ার ভুন্ডারটিমে খুঁজে পাওয়া যায়।

এই দলের প্রাণ ছিলেন মাথিয়াস সিন্ডেলার। তাকে বলা হতো ফুটবলের মোৎসার্ট। পাতলা গড়নের জন্য তার আরেক নাম ছিল কাগজের মানুষ। সিন্ডেলার ছিলেন ফরোয়ার্ড, কিন্তু শুধু গোলদাতা নন। তিনি নিচে নামতেন, পাস দিতেন, জায়গা তৈরি করতেন, প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডারদের টেনে বের করতেন। আজকের ফুটবলে যাকে ফলস নাইন বলা হয়, সেই ধারণার সঙ্গে তার খেলার মিল খুঁজে পাওয়া যায়।
১৯৩৪ বিশ্বকাপের আগে অস্ট্রিয়া ছিল ইউরোপের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দলগুলোর একটি। জার্মানির বিপক্ষে বড় জয়, হাঙ্গেরি, সুইজারল্যান্ড, বেলজিয়াম ও স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে দাপুটে ফল, ইতালির বিপক্ষেও স্মরণীয় জয়—সব মিলিয়ে তারা তখন শুধু প্রতিভাবান দল ছিল না, ছিল ভয় জাগানো দল। তাই ইতালির মাটিতে বিশ্বকাপে নামার সময় অস্ট্রিয়া কেবল অংশগ্রহণকারী ছিল না; তারা ছিল শিরোপার দাবিদারদের একটি।
প্রথম ম্যাচে ফ্রান্সকে অতিরিক্ত সময়ে ৩-২ গোলে হারায় অস্ট্রিয়া। এরপর কোয়ার্টার ফাইনালে হাঙ্গেরিকে ২-১ গোলে হারিয়ে সেমিফাইনালে ওঠে তারা। সেখানে অপেক্ষা করছিল স্বাগতিক ইতালি। ম্যাচের ভেন্যু মিলানের সান সিরো। তারিখ ৩ জুন, ১৯৩৪।

ইতালি তখন শুধু একটি ফুটবল দল নয়, মুসোলিনির রাজনৈতিক প্রকল্পেরও অংশ। ফ্যাসিবাদী শাসক বিশ্বকাপকে ব্যবহার করতে চেয়েছিলেন শক্তিশালী, শৃঙ্খলাবদ্ধ ও বিজয়ী ইতালির প্রচারণার মঞ্চ হিসেবে। ঘরের মাঠে বিশ্বকাপ আয়োজন, জনসমর্থন, রাষ্ট্রীয় আবহ এবং রাজনৈতিক চাপ—সব মিলিয়ে ইতালির ওপর ছিল জয়ের প্রবল প্রত্যাশা। অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে সেমিফাইনাল তাই কেবল একটি ফুটবল ম্যাচ ছিল না; সেটি ছিল রাজনৈতিক ছায়ায় মোড়া এক লড়াই।
সেই ম্যাচের গল্প আজও বিতর্কিত। প্রবল বৃষ্টিতে মাঠ কাদা হয়ে যায়। অস্ট্রিয়ার পাসিং ফুটবল বাধাগ্রস্ত হয়, ইতালির বেশি শারীরিক ও সরাসরি খেলা তুলনামূলক সুবিধা পায়। তবে অস্ট্রিয়ানদের অভিযোগ ছিল, শুধু আবহাওয়াই তাদের হারায়নি; রেফারিংও বড় ভূমিকা রেখেছিল।
ম্যাচের একমাত্র গোল করেন ইতালির আর্জেন্টাইন বংশোদ্ভূত ফরোয়ার্ড এনরিকে গুয়াইতা। গোলের আগে ঘটে বিতর্কিত মুহূর্ত। জিউসেপ্পে মিয়াজ্জা অস্ট্রিয়ার গোলরক্ষক পিটার প্লাৎজারের সঙ্গে চ্যালেঞ্জে জড়ান। অস্ট্রিয়ানদের দাবি ছিল, মিয়াজ্জার ধাক্কায় গোলরক্ষক বলের নিয়ন্ত্রণ হারান। এরপর বল সামনে পড়ে যায় এবং গুয়াইতা সেটি জালে পাঠান। অস্ট্রিয়া ফাউলের দাবি করলেও সুইডিশ রেফারি ইভান একলিন্দ গোলটি দেন।

এই সিদ্ধান্ত ঘিরেই বিতর্ক সবচেয়ে বেশি। অস্ট্রিয়ার দাবি ছিল, গোলটি বাতিল হওয়া উচিত ছিল। শুধু সেই গোল নয়, ম্যাচজুড়ে ইতালির কড়া ট্যাকলে রেফারি অনেক সময় নরম ছিলেন বলেও অভিযোগ ওঠে। সিন্ডেলারকে বারবার আঘাত করা হয়েছিল—এমন বর্ণনাও বিভিন্ন ইতিহাসভিত্তিক লেখায় পাওয়া যায়।
ইভান একলিন্দের নাম তাই ১৯৩৪ বিশ্বকাপের সবচেয়ে বিতর্কিত চরিত্রগুলোর একটি হয়ে আছে। তার বিরুদ্ধে সরাসরি ঘুষ নেওয়ার প্রমাণ কখনো মেলেনি। তবে বহু ঐতিহাসিক বিবরণে দাবি করা হয়েছে, ইতালির গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচের আগে মুসোলিনির সঙ্গে রেফারিদের যোগাযোগ বা সাক্ষাৎ হয়েছিল। এসব দাবির নির্দিষ্ট প্রমাণ না থাকলেও সন্দেহটি ১৯৩৪ বিশ্বকাপের ইতিহাস থেকে মুছে যায়নি।
ইতালি ম্যাচটি ১-০ গোলে জিতে ফাইনালে ওঠে। পরে চেকোস্লোভাকিয়াকে অতিরিক্ত সময়ে ২-১ গোলে হারিয়ে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়। অদ্ভুতভাবে, অস্ট্রিয়া-ইতালি সেমিফাইনালের সেই রেফারি একলিন্দই ফাইনালও পরিচালনা করেন। এটিও বিতর্ককে আরও বাড়িয়ে দেয়। অনেকের চোখে ১৯৩৪ বিশ্বকাপ তাই শুধু ইতালির প্রথম বিশ্বকাপ জয় নয়; এটি ছিল ফুটবল, রাজনীতি ও ক্ষমতার এক জটিল মিশ্রণ।
অস্ট্রিয়ার জন্য পরিণতি ছিল হৃদয়ভাঙা। সুন্দর ফুটবল খেলেও তারা ফাইনালে উঠতে পারেনি। তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে জার্মানির কাছে ৩-২ গোলে হেরে চতুর্থ হয়। যে দলকে অনেকেই টুর্নামেন্টের সবচেয়ে নান্দনিক দল বলছিলেন, তারা ট্রফি ছাড়াই বাড়ি ফেরে।
ভুন্ডারটিমের গল্প এখানেই শেষ হয়নি, তবে শীর্ষে ওঠার সেই সুযোগ আর ফিরে আসেনি। ১৯৩৬ বার্লিন অলিম্পিকে অস্ট্রিয়া রুপা জেতে, সেখানেও ইতালির কাছে হারে। ১৯৩৭ সালে হুগো মাইসলের মৃত্যু দলটির জন্য বড় ধাক্কা হয়ে আসে। এরপর ১৯৩৮ সালে নাৎসি জার্মানি অস্ট্রিয়াকে সংযুক্ত করে নেয়। অস্ট্রিয়ার জাতীয় দল কার্যত বিলুপ্ত হয়, আর বিশ্বকাপে আলাদা দেশ হিসেবে খেলার সুযোগ হারায়।
সিন্ডেলারের গল্প আরও করুণ। অস্ট্রিয়া সংযুক্তির পর তাকে জার্মান জাতীয় দলের হয়ে খেলতে বলা হয়েছিল বলে ইতিহাসে প্রচলিত আছে, কিন্তু তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন। ১৯৩৮ সালের তথাকথিত পুনর্মিলনী ম্যাচে জার্মানির বিপক্ষে অস্ট্রিয়ার ২-০ জয়ে তিনি গোল করেন। নাৎসি কর্মকর্তাদের সামনে তার উদ্যাপন পরে প্রতীকি অর্থ পায়। ১৯৩৯ সালে তাকে তার সঙ্গিনীর সঙ্গে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। সরকারি ব্যাখ্যায় কার্বন মনোক্সাইড বিষক্রিয়ার কথা বলা হলেও তার মৃত্যু ঘিরে রহস্য কখনো পুরোপুরি কাটেনি।
এই কারণেই অস্ট্রিয়ার ভুন্ডারটিম শুধু একটি ফুটবল দল নয়। এটি হারানো সম্ভাবনার গল্প, রাজনৈতিক অন্ধকারে চাপা পড়ে যাওয়া এক সুন্দর ফুটবল দর্শনের গল্প, এবং বিশ্বকাপের সেই সময়ের স্মৃতি, যখন ফুটবল কখনো কখনো মাঠের বাইরের শক্তির কাছেও অসহায় হয়ে পড়েছিল।
আজ রাংনিকের অস্ট্রিয়া যখন আর্জেন্টিনার সামনে দাঁড়াবে, সেই ১৯৩৪ সালের দলের সঙ্গে সরাসরি তুলনা করা ঠিক হবে না। ফুটবল বদলেছে, যুগ বদলেছে, অস্ট্রিয়ার অবস্থানও বদলেছে। তবু ইতিহাসের ধারায় একটি মিল আছে। অস্ট্রিয়া আবারও বড় মঞ্চে এক বিশ্বচ্যাম্পিয়নের সামনে। সামনে মেসির আর্জেন্টিনা। আর তাদের পেছনে দাঁড়িয়ে আছে সেই পুরোনো স্মৃতি—একদিন অস্ট্রিয়া বিশ্বকাপ জেতার মতো ফুটবল খেলেছিল।
রাংনিকের দল বল দখল করে শিল্পীসুলভ ফুটবল খেলার জন্য পরিচিত নয়। তারা খেলে চাপ দিয়ে, দ্রুত এগিয়ে গিয়ে, ছোট জায়গায় প্রতিপক্ষকে আটকে। সিন্ডেলারের ছন্দ নেই, আছে তীব্রতা, সংঘবদ্ধতা এবং দ্বিতীয় বলের লড়াই। কিন্তু বিশ্বচ্যাম্পিয়নকে অস্বস্তিতে ফেলার স্বপ্নে তারা আজও সেই পুরোনো অস্ট্রিয়ার উত্তরাধিকার বহন করে। ভুন্ডারটিমের সৌন্দর্য আর বর্তমান অস্ট্রিয়ার জেদ এক নয়, তবু দুই গল্পের কেন্দ্রে আছে একই সতর্কতা: অস্ট্রিয়াকে কখনো শুধু ছোট দল ভেবে নেওয়া বিপজ্জনক।







