ব্রাজিলে রিয়াল মাদ্রিদের ডিএনএ বসাচ্ছেন আনচেলত্তি

বিশ্বকাপের শেষ ষোলোতে ব্রাজিল জাপানকে হারিয়েছে ২-১ গোলে। স্কোরলাইন খুব সাধারণ মনে হতে পারে, কিন্তু ম্যাচের ভেতরের গল্পটা অনেক বড়। এটি শুধু শেষ মুহূর্তের এক জয় নয়, বরং কার্লো আনচেলত্তির ব্রাজিল আসলে কোন পথে যাচ্ছে, তার একটি শক্ত ইঙ্গিতও।
জাপানের বিপক্ষে ব্রাজিল নিখুঁত ছিল না। বরং অনেক সময় অস্বস্তিকর ছিল। দানিলোর ভুল পাস থেকে গোল হজম, কাসেমিরোর গতির ঘাটতি, প্রথমার্ধে আক্রমণের ছন্দহীনতা, ভিনিসিয়ুস জুনিয়রকে সঠিক জায়গায় ব্যবহার করতে সময় নেওয়া, সব মিলিয়ে ম্যাচের বড় অংশে ব্রাজিলকে অজেয় মনে হয়নি।
কিন্তু আনচেলত্তির দলগুলোকে বোঝার জন্য শুধু সৌন্দর্য দেখা যথেষ্ট নয়। তার দলগুলো অনেক সময় বিশৃঙ্খলার মধ্যেই নিজেদের সবচেয়ে বিপজ্জনক রূপ দেখায়। স্প্যানিশ জায়ান্ট রিয়াল মাদ্রিদে তিনি বারবার সেটি দেখিয়েছেন। ম্যাচ হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে, প্রতিপক্ষ এগিয়ে, যুক্তি বলছে আর সময় নেই, ঠিক তখনই তার দল যেন অন্য এক বিশ্বাস থেকে ফিরে আসে।
২০২২ চ্যাম্পিয়নস লিগে রিয়াল মাদ্রিদের সেই চরিত্র দেখা গিয়েছিল পিএসজি, চেলসি ও ম্যানচেস্টার সিটির বিপক্ষে। ম্যাচগুলো সব সময় গোছানো ছিল না, কিন্তু শেষ মুহূর্তে তারা পথ খুঁজে নিয়েছিল। রিয়ালের সেই ফুটবল ছিল নিখুঁত নিয়ন্ত্রণের নয়, বরং চাপ, ধৈর্য, স্নায়ু এবং শেষ পর্যন্ত বিশ্বাস ধরে রাখার ফুটবল।
জাপানের বিপক্ষে ব্রাজিলেও সেই ছাপ দেখা গেল। প্রথমার্ধে পিছিয়ে পড়ার পর দলটি ভেঙে পড়েনি। তাড়াহুড়ো করে ম্যাচকে আরও অগোছালো করেনি। বিরতির পর আনচেলত্তি বদল আনলেন, ব্রাজিল চাপ বাড়াল, মাঝমাঠের খেলোয়াড়রা বক্সে ঢুকতে শুরু করলেন, ভিনিসিয়ুস আরও কার্যকর জায়গা পেলেন। তারপর কাসেমিরোর হেডে সমতা।
এই কাসেমিরোই ম্যাচের দ্বৈত প্রতীক। জাপানের গোলের সময় তার গতির ঘাটতি চোখে পড়েছে। কিন্তু দ্বিতীয়ার্ধে তিনিই ব্রাজিলকে ম্যাচে ফেরালেন। আনচেলত্তির পুরোনো সৈনিকরা হয়তো আগের মতো দ্রুত নন, কিন্তু বড় মুহূর্ত পড়ার ক্ষমতা এখনো তাদের আছে। এই অভিজ্ঞতার ওপর আস্থা রাখেন বলেই আনচেলত্তি ঝুঁকি নেন।

আর শেষ মুহূর্তের গোল? সেটি ছিল আনচেলত্তি ফুটবলের আরেক পরিচিত দৃশ্য। ম্যাচ যখন অতিরিক্ত সময়ের দিকে যাচ্ছে, তখনও ব্রাজিল বিশ্বাস হারায়নি। তরুণ তুর্কি রায়ানের চাপ, ব্রুনো গিমারায়েসের ঠান্ডা মাথার পাস এবং বদলি গ্যাব্রিয়েল মার্তিনেল্লির ফিনিশিং মিলে তৈরি হলো সেই মুহূর্ত, যা এক দলকে ভেঙে দেয়, আর অন্য দলকে বিশ্বাস করায় যে তারা এখনো টিকে আছে।
এই জায়গাতেই ব্রাজিলের সঙ্গে রিয়াল মাদ্রিদের মিলটা সবচেয়ে স্পষ্ট। বিশ্বকাপ একসময় ব্রাজিলের নিজস্ব মঞ্চ ছিল, যেমন চ্যাম্পিয়নস লিগ রিয়াল মাদ্রিদের। প্রতিপক্ষ জানত, ব্রাজিলকে হারাতে হলে শুধু ভালো খেললেই হবে না, শেষ বাঁশি পর্যন্ত তাদের থামিয়ে রাখতে হবে। সেই ভয়টাই সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কিছুটা কমে গিয়েছিল। আনচেলত্তি সেটি ফেরাতে চাইছেন।
তবে এই জয় ব্রাজিলের সব সমস্যার উত্তর নয়। দানিলোর ভুল দেখিয়েছে, বিল্ডআপে চাপ পড়লে ব্রাজিল বিপদে পড়তে পারে। কাসেমিরোর গতি নিয়ে প্রশ্ন থাকবে। পাকেতার চোট, নেইমারের ব্যবহার, ভিনিসিয়ুসের পজিশন, রক্ষণভাগের ভারসাম্য, সবই আলোচনায় থাকবে। কিন্তু বিশ্বকাপের নকআউট শুধু নির্ভুল দলের প্রতিযোগিতা নয়। অনেক সময় এটি টিকে থাকা দলের প্রতিযোগিতা।

আনচেলত্তির সবচেয়ে বড় শক্তি সম্ভবত এখানেই। তিনি ব্রাজিলকে শুধু সুন্দর ফুটবল খেলাতে আসেননি। তিনি এমন একটি দল বানাতে চাইছেন, যারা খারাপ সময় পার করতে পারবে, নিজের ভুল সামলাতে পারবে, ম্যাচের ভেতর ভেঙে না পড়ে শেষ আঘাতের জন্য অপেক্ষা করতে পারবে।
ব্রাজিল ঐতিহ্যগতভাবে সৌন্দর্য, প্রতিভা ও আক্রমণের প্রতীক। আনচেলত্তি সেই পরিচয় মুছে দিচ্ছেন না। বরং তার সঙ্গে যোগ করছেন রিয়াল মাদ্রিদের মতো নকআউট স্নায়ু। এমন এক মানসিকতা, যেখানে দল জানে, ম্যাচ শেষ না হওয়া পর্যন্ত গল্প শেষ নয়।
জাপানের বিপক্ষে ব্রাজিল সবচেয়ে সুন্দর ছিল না। সবচেয়ে নিখুঁতও ছিল না। কিন্তু তারা বেঁচে ছিল, অপেক্ষা করেছে, আঘাত করেছে। বিশ্বকাপ জিততে অনেক সময় এটুকুই যথেষ্ট হয়ে যায়।
আনচেলত্তি সেই সিনেমা আগেও দেখেছেন। এবার তিনি চাইছেন, ব্রাজিল যেন সেটির নায়ক হয়।





