১০০ ম্যাচ শেষে কাঠগড়ায় বিশ্বকাপের রেফারিং

বিশ্বকাপের ১০০ ম্যাচ শেষ। গোল, প্রত্যাবর্তন আর বিদায়ের গল্পের পাশাপাশি আলোচনার বড় অংশ দখল করে নিয়েছে রেফারিং। বিশেষ করে গত দুই সপ্তাহে ভিএআর, বলের সেন্সর ও নতুন নিয়মের প্রয়োগ নিয়ে বিতর্ক ছড়িয়ে পড়েছে প্রায় প্রতিটি ম্যাচের পর।
ভিএআর চালুর পর বিশ্বকাপে রেফারির বড় ভুল কমে আসবে, এমনটাই আশা ছিল। আগের দুটি আসরে প্রযুক্তি বহু সিদ্ধান্ত সংশোধনও করেছে। কিন্তু ২০২৬ বিশ্বকাপে প্রযুক্তিই যেন নতুন বিতর্কের উৎস হয়ে উঠেছে।
গ্রুপ পর্বের প্রথম দুই রাউন্ড তুলনামূলক শান্ত ছিল। ব্রাজিলের একটি গোল বাতিল হওয়া কিংবা কয়েকটি পেনাল্টি না দেওয়া নিয়ে আলোচনা হলেও পরিস্থিতি এতটা উত্তপ্ত হয়নি। নকআউট পর্ব শুরু হতেই বদলে যায় চিত্র।

মিশরের বিপক্ষে ইরানের শেষ মুহূর্তের গোলটি অল্প ব্যবধানের অফসাইডে বাতিল হয়। প্রযুক্তির হিসাবে সিদ্ধান্তটি সঠিক ছিল। তবে সেই গোল বাতিল হওয়ায় বিশ্বকাপ থেকে ছিটকে যায় ইরান। স্বাভাবিকভাবেই মাঠের সিদ্ধান্তের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে আবেগ।
নতুন নিয়ম প্রয়োগের ধারাবাহিকতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। তুরস্কের বিপক্ষে মুখ ঢেকে কথা বলায় সরাসরি লাল কার্ড দেখেন প্যারাগুয়ের মিগেল আলমিরোন। সম্ভাব্য অপমানজনক ভাষা ঠেকাতে চালু করা নিয়মটি পরিচিতি পেয়েছে ‘ভিনিসিয়ুস আইন’ নামে। পরে একই ধরনের আচরণে সবার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়ায় তৈরি হয় অসঙ্গতির অভিযোগ।
প্রযুক্তিনির্ভর সবচেয়ে আলোচিত সিদ্ধান্তগুলোর একটি আসে পর্তুগাল ও ক্রোয়েশিয়ার ম্যাচে। ক্রোয়েশিয়ার ইগর মাতানোভিচ বল স্পর্শের বিষয়টি অস্বীকার করেছিলেন। ভিডিওতেও স্পর্শটি পরিষ্কার ছিল না। কিন্তু বলের ভেতরের সেন্সর সামান্য স্পর্শ শনাক্ত করে। বাতিল হয় ক্রোয়েশিয়ার সমতাসূচক গোল।
জার্মানি ও প্যারাগুয়ের ম্যাচে অতিরিক্ত সময়ের শেষ দিকে জার্মানির একটি গোল বাতিল করে ভিএআর। গোলরক্ষককে বাধা দেওয়ার নতুন নিয়মের আওতায় সিদ্ধান্তটি নেওয়া হয়। গোলটি হলে জার্মানি পরের রাউন্ডে যেতে পারত।

তবে মাঠের সিদ্ধান্ত ছাপিয়ে সবচেয়ে বড় বিতর্ক তৈরি করে ফোলারিন বালোগুনের নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার ঘটনা। যুক্তরাষ্ট্রের ফরোয়ার্ডকে লাল কার্ডের পরও পরের ম্যাচে খেলার অনুমতি দেয় ফিফার স্বাধীন শৃঙ্খলা কমিটি। পরে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানান, তিনি বিষয়টি নিয়ে ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর সঙ্গে কথা বলেছিলেন। এই ঘটনায় রেফারিং নয়, ফিফার বিচারিক প্রক্রিয়ার স্বাধীনতা ও স্বচ্ছতাই প্রশ্নের মুখে পড়ে।
মিশরের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার জয়ের পর বিতর্ক আরও বাড়ে। ভিএআরের সাহায্যে আক্রমণের শুরুতে ফাউলের কারণে মিশরের একটি গোল বাতিল করা হয়। মিশরের দাবি, এনজো ফার্নান্দেজের জয়সূচক গোলের আগে প্রায় একই ধরনের ঘটনা ঘটলেও ভিএআর হস্তক্ষেপ করেনি। পরে ফিফার কাছে আনুষ্ঠানিক অভিযোগও জমা দেয় মিশরীয় ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন।
কোয়ার্টার ফাইনালে স্পেন ও বেলজিয়ামের ম্যাচেও দুই দলের পেনাল্টি বক্সে দুটি হ্যান্ডবলের আবেদন ওঠে। ভিএআর দুটি ঘটনাই পরীক্ষা করে, কিন্তু কোনোটিকেই পেনাল্টি দেওয়ার মতো মনে করেনি। পরাজয়ের পর বেলজিয়াম কোচ রুডি গার্সিয়া একটি সিদ্ধান্ত নিয়ে অসন্তোষ জানান।

সবচেয়ে উত্তপ্ত রাত আসে শেষ দুটি কোয়ার্টার ফাইনালে। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে নরওয়ের একটি গোল আর্লিং হলান্ডের ধাক্কার কারণে বাতিল হয়। পরে ইংল্যান্ডকে দেওয়া একটি পেনাল্টিও ভিএআরের পর তুলে নেন রেফারি ক্লেমঁ তুরপাঁ।
জুড বেলিংহামের প্রথম গোলের আগে বল আকাশে থাকা ক্যামেরার তারে লেগেছিল বলে অভিযোগ করে নরওয়ে। ভিডিওতে বলের গতিপথ হঠাৎ বদলে গেছে বলে মনে হলেও ফিফা জানায়, বলের সেন্সরে কোনো স্পর্শ ধরা পড়েনি। প্রযুক্তির সেই ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট হতে পারেনি নরওয়ে।
আর্জেন্টিনা ও সুইজারল্যান্ড ম্যাচে প্রথমে লিয়ান্দ্রো পারেদেসকে হলুদ কার্ড দেখিয়েছিলেন রেফারি। ভিএআর জানায়, ডাইভ দেওয়ার অপরাধটি করেছিলেন ব্রিল এমবোলো। ভুল খেলোয়াড়কে কার্ড দেখানোর নিয়মে সিদ্ধান্ত সংশোধন করা হয়। এমবোলোর সেটি ছিল দ্বিতীয় হলুদ কার্ড। ফলে তাঁকে মাঠ ছাড়তে হয়। ফিফার রেফারিং প্রধান পিয়েরলুইজি কোলিনা সিদ্ধান্তটিকে প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার হিসেবে দেখলেও সুইসদের অভিযোগ, আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়দের একই ধরনের ডাইভ শাস্তি পায়নি।

প্রতিটি বিতর্কিত সিদ্ধান্ত যে ভুল, তা নয়। বেশ কয়েকটি সিদ্ধান্ত নিয়ম ও প্রযুক্তির হিসাবে সঠিক প্রমাণিত হয়েছে। মূল সংকট তৈরি হয়েছে একই ধরনের ঘটনায় ভিন্ন ব্যাখ্যা, সিদ্ধান্ত জানানোর অস্বচ্ছতা এবং প্রযুক্তির তথ্যের সঙ্গে চোখে দেখা ঘটনার ব্যবধান থেকে।
প্রযুক্তি এখন বলের গায়ে চুলের স্পর্শও শনাক্ত করতে পারে। কিন্তু সেই প্রযুক্তি যদি খেলোয়াড়, কোচ ও দর্শকের আস্থা অর্জন করতে না পারে, তাহলে বিতর্ক থামবে না।




