কুইরোজের ঘানায় আটকে গেল ইংল্যান্ড

এশিয়া পোস্ট স্পোর্টস
কুইরোজের ঘানায় আটকে গেল ইংল্যান্ড
ছবি: সংগৃহীত

বল ছিল ইংল্যান্ডের পায়ে, কিন্তু ম্যাচের ছন্দ ছিল ঘানার পরিকল্পনায়। বস্টনে বিশ্বকাপের গ্রুপ ‘এল’-এর ম্যাচে কার্লোস কুইরোজের শৃঙ্খল রক্ষণ ভাঙতে পারেনি থমাস টুখেলের ইংল্যান্ড। জুড বেলিংহাম, হ্যারি কেইন, অ্যান্থনি গর্ডনরা বড় কিছু করতে না পারায় ঘানার সঙ্গে গোলশূন্য ড্র নিয়েই মাঠ ছাড়তে হলো ইংল্যান্ডকে।

Advertisement

প্রথম ম্যাচে ক্রোয়েশিয়াকে ৪-২ গোলে হারিয়ে বিশ্বকাপ শুরু করেছিল ইংল্যান্ড। সেই জয়ের পর ঘানার বিপক্ষে জিতলেই শেষ ৩২-এর পথে বড় স্বস্তি পেত তারা। কিন্তু কুইরোজের ঘানা ঠিক সেটিই হতে দিল না। নিচে নেমে গুছিয়ে রক্ষণ, মাঝমাঠে শারীরিক লড়াই, আর সুযোগ পেলেই পাল্টা আক্রমণ—এই পরিকল্পনাতেই ইংল্যান্ডকে আটকে দিল আফ্রিকান দলটি।

ম্যাচটি হয়েছে বস্টন স্টেডিয়ামে। বৃষ্টি ও মেঘলা আবহাওয়ার মধ্যে ইংল্যান্ড সমর্থকেরা গ্যালারিতে বড় উপস্থিতি জানান দিয়েছিলেন। পরিবেশ অনেকটাই ইংল্যান্ডের ঘরের মাঠের মতো ছিল। কিন্তু মাঠের খেলায় সেই আবেগের প্রতিফলন দেখা যায়নি। বলের দখল ছিল টুখেলের দলের, কিন্তু ধার ছিল না আক্রমণে।

ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে চার গোল করা ইংল্যান্ড এদিন শুরু থেকেই ঘানার নিচু রক্ষণে আটকে যায়। বেলিংহাম বল পেতে নিচে নেমেছেন, কেইন বারবার ডিফেন্ডারদের মাঝে হারিয়ে গেছেন, গর্ডন রক্ষণে পরিশ্রম করলেও আক্রমণে প্রভাব ফেলতে পারেননি। ননি মাদুয়েকেও ঘানার রক্ষণকে যথেষ্ট নাড়াতে পারেননি।

টুখেল একাদশে বদল এনেছিলেন মূলত রক্ষণে। জন স্টোনস ও নিকো ও’রাইলির জায়গায় শুরু করেন মার্ক গেহি ও জেড স্পেন্স। শারীরিকভাবে শক্তিশালী ঘানার বিপক্ষে রক্ষণে স্থিতি আনার চেষ্টাই ছিল তার ভাবনায়। রক্ষণে ইংল্যান্ড খুব বেশি বিপদে পড়েনি, কিন্তু বড় সমস্যা ছিল সামনে। এত বল পায়েও তারা পরিষ্কার সুযোগ তৈরি করতে পারেনি।

প্রথমার্ধে ম্যাচের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য সুযোগ আসে ডেকলান রাইসের পা থেকে। বক্সের বাইরে থেকে তার জোরালো শট অল্পের জন্য ক্রসবারের ওপর দিয়ে যায়। এরপর ইংল্যান্ড বল ঘুরিয়েছে, প্রান্ত বদলেছে, মাঝ দিয়ে ঢোকার চেষ্টা করেছে, কিন্তু ঘানার রক্ষণ খুব কমই ফাঁক দিয়েছে।

ঘানার পরিকল্পনা ছিল পরিষ্কার। কুইরোজ ইংল্যান্ডকে জায়গা দেননি। থমাস পার্টে মাঝমাঠে অভিজ্ঞতা ও শারীরিক উপস্থিতি দিয়ে দলকে গুছিয়ে রাখেন। জেরোম ওপোকু, জোনাস আদজেতেই, গিডিওন মেনসাহরা রক্ষণে সতর্ক ছিলেন। ইংল্যান্ডের তারকা আক্রমণভাগ তাই বারবার দেয়ালে ধাক্কা খেয়েছে।

প্রথমার্ধে কোনো দলই লক্ষ্যে শট নিতে পারেনি। ইংল্যান্ডের বলের দখল ছিল অনেক বেশি, কিন্তু সেটি গোলের সুযোগে রূপ নেয়নি। ঘানা তখনও নিজেদের পরিকল্পনা থেকে সরে আসেনি। তারা জানত, ম্যাচ যত এগোবে, ইংল্যান্ডের অস্থিরতা তত বাড়বে।

বিরতির পরও দৃশ্য খুব বদলায়নি। ইংল্যান্ডের দখল ছিল, কিন্তু গতি কম। বেলিংহাম ম্যাচে প্রভাব ফেলতে পারছিলেন না। একসময় তাকে তুলে মর্গান রজার্সকে নামান টুখেল। পরে বুকায়ো সাকা ও মার্কাস র‍্যাশফোর্ডও মাঠে আসেন। কিন্তু বদলিও ইংল্যান্ডকে জয়ের পথ দেখাতে পারেনি।

ঘানা শুধু রক্ষণেই আটকে ছিল না। সুযোগ পেলেই তারা পাল্টা আক্রমণে ওঠার চেষ্টা করেছে। জর্ডান আয়ু, ইনাকি উইলিয়ামস, আঁতোয়ান সেমেনিওরা ইংল্যান্ড রক্ষণকে ব্যস্ত রেখেছেন। দ্বিতীয়ার্ধে ঘানার কয়েকটি আক্রমণ ইংল্যান্ডকে অস্বস্তিতে ফেলেছিল। তবে শেষ পাস বা শেষ শটের অভাবে তারাও গোল পায়নি।

শেষ দিকে ইংল্যান্ডের সবচেয়ে বড় সুযোগ আসে নিকো ও’রাইলির হেডে। রিস জেমসের ক্রস থেকে তাঁর হেড লাগে ক্রসবারে। ফিরতি বল পড়ে কেইনের সামনে। খুব কাছ থেকে সুযোগ পেলেও ইংল্যান্ড অধিনায়ক বল জালে রাখতে পারেননি। সেটিই যেন ইংল্যান্ডের রাতের প্রতীক: দখল আছে, চাপ আছে, কিন্তু শেষ কাজ নেই।

যোগ করা সময়েও চাপ বাড়ায় ইংল্যান্ড। মার্ক গেহির একটি প্রচেষ্টাও ঘানার রক্ষণ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু গোল আসেনি। শেষ বাঁশি বাজতেই ঘানার ডাগআউটে স্বস্তি, ইংল্যান্ডের মুখে হতাশা।

পরিসংখ্যান ইংল্যান্ডের আধিপত্যই দেখায়। বলের দখলে তারা অনেক এগিয়ে ছিল, শটও বেশি নিয়েছে। তবে ফুটবল শুধু দখলের খেলা নয়। সুযোগ কাজে লাগানো এবং প্রতিপক্ষের পরিকল্পনা ভাঙার ক্ষমতাও দরকার। সেই জায়গাতেই ব্যর্থ টুখেলের দল।

ঘানার জন্য এই ড্র বড় অর্জন। প্রথম ম্যাচে পানামাকে ১-০ গোলে হারানোর পর ইংল্যান্ডের বিপক্ষে পয়েন্ট তুলে তারা শেষ ৩২-এর খুব কাছাকাছি চলে গেছে। এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে জায়গা নিশ্চিত না হলেও ৪ পয়েন্টে কুইরোজের দল শক্ত অবস্থানে আছে।

ইংল্যান্ডের জন্য হিসাব খুব খারাপ নয়, কিন্তু সতর্কবার্তা স্পষ্ট। দুই ম্যাচে ৪ পয়েন্ট নিয়ে তারাও এগিয়ে আছে। তবে গ্রুপসেরা হওয়া, শেষ ৩২-এর পথ এবং বড় দলের মানসিকতা—সব ক্ষেত্রেই এই ড্র প্রশ্ন তুলে দিল। ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে আক্রমণাত্মক ঝলক দেখানো দলটি ঘানার বিপক্ষে সেই ধার ধরে রাখতে পারেনি।