গুগলে খুঁজলেই মিলছিল ক্লড এআইয়ের ব্যক্তিগত চ্যাট

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক চ্যাটবট ব্যবহার এখন অনেকের দৈনন্দিন অভ্যাস। ব্যক্তিগত প্রশ্ন থেকে শুরু করে চাকরির আবেদন, অফিসের কাজ কিংবা গবেষণার তথ্য, নানা বিষয়েই মানুষ এআইয়ের সহায়তা নিচ্ছেন। কিন্তু সম্প্রতি এমন একটি ঘটনা সামনে এসেছে, যা ব্যবহারকারীদের গোপনীয়তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
অ্যানথ্রপিকের জনপ্রিয় এআই চ্যাটবট ক্লডের শত শত ব্যবহারকারীর কথোপকথন গুগলসহ বিভিন্ন সার্চ ইঞ্জিনে প্রকাশ্যে পাওয়া যাচ্ছিল। অর্থাৎ নির্দিষ্ট কিছু শব্দ দিয়ে খুঁজলেই অন্যের ব্যক্তিগত চ্যাট দেখা সম্ভব হচ্ছিল।
এসব চ্যাটে ব্যক্তিগত তথ্য, চাকরিসংক্রান্ত নথি, অফিসের প্রকল্প এবং গবেষণার তথ্যও ছিল বলে জানা গেছে।
বিবিসির প্রতিবেদন অনুযায়ী, ক্লডে যেসব ব্যবহারকারী নিজেদের কথোপকথনের জন্য শেয়ার লিংক তৈরি করেছিলেন, সেই লিংকগুলো সার্চ ইঞ্জিনে সূচিভুক্ত বা ইনডেক্স হয়ে যায়। ফলে গুগল বা অন্য সার্চ ইঞ্জিনে নির্দিষ্টভাবে খুঁজলে সেগুলো সবার জন্য উন্মুক্ত হয়ে পড়েছিল।
সপ্তাহান্তে এসব চ্যাট সার্চ ফলাফল থেকে সরিয়ে দেওয়া হলেও, এর আগেই অনেক কথোপকথনের কপি সংরক্ষণ করে অনলাইনে ছড়িয়ে দেওয়া হয়।
অ্যানথ্রপিক কী বলছে?
অ্যানথ্রপিকের একজন মুখপাত্র জানিয়েছেন, ব্যবহারকারীরা নিজেরাই সিদ্ধান্ত নেন তারা কোনো কথোপকথন শেয়ার করবেন কি না।
তার ভাষ্য, ব্যবহারকারী নিজে লিংক শেয়ার না করলে সেটি অনুমান করে বা সহজে খুঁজে পাওয়া সম্ভব নয়।
তিনি আরও বলেন, কেউ যখন একটি কথোপকথন শেয়ার করেন, তখন সেটি প্রকাশ্য ওয়েব কনটেন্টে পরিণত হয়। অন্য যেকোনো উন্মুক্ত ওয়েবপেজের মতোই সেটিও বিভিন্ন তৃতীয় পক্ষের সেবায় সংরক্ষিত হতে পারে।
তবে সমালোচকদের মতে, ক্লডে শেয়ার অপশনে শুধু বলা হয় যে লিংকটি যার কাছে থাকবে, তিনি কথোপকথন দেখতে পারবেন। কিন্তু লিংকটি গুগল বা অন্য সার্চ ইঞ্জিনে দেখা যেতে পারে, এমন সতর্কবার্তা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা ছিল না।
কী ধরনের তথ্য পাওয়া গেছে?
প্রথমে রেডিটের কয়েকজন ব্যবহারকারী বিষয়টি শনাক্ত করেন। তাদের দাবি, সার্চ ফলাফলের অন্তত ২৫টি পাতাজুড়ে ২০০টির বেশি ক্লড কথোপকথন পাওয়া গিয়েছিল। এর মধ্যে কিছু চ্যাট মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগের।
প্রকাশ্যে আসা কথোপকথনগুলোতে নানা ধরনের তথ্য ছিল।
একটি চ্যাটে একজন ব্যবহারকারী ক্লডকে প্রশ্ন করেছিলেন, তুমি কি আমাকে সাহায্য করতে চাও, নাকি অ্যানথ্রপিককে বেশি সাহায্য করতে চাও?
জবাবে ক্লড আংশিকভাবে জানিয়েছিল, আমি এমন একটি অনুভূতি অনুভব করি, যা আপনাকে সাহায্য করতে চাওয়ার মতো।
আরেকটি চ্যাটে একজন ব্যবহারকারী একটি প্রতিষ্ঠানের ক্লাউড নিরাপত্তা–সংক্রান্ত প্রকল্প নিয়ে এখনো প্রকাশ না হওয়া একটি ব্লগ লেখার অনুরোধ করেছিলেন। সেখানে প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ প্রকল্পের তথ্যও ছিল।
আরেকটি মজার কথোপকথনে একজন ব্যবহারকারী জানতে চেয়েছিলেন, কীভাবে নাইন টেইলড ফক্স হওয়া যায়। পরে তিনি স্পষ্ট করে বলেন, তিনি সত্যিই মানুষ থেকে সেই প্রাণীতে রূপান্তরিত হওয়ার উপায় জানতে চান। এর জবাবে ক্লড প্রথমে একটি এআই দিয়ে তৈরি ছবি দেখিয়ে দাবি করেছিল যে ব্যবহারকারীকে সম্পূর্ণ কার্যকর শিয়ালের শক্তি দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া প্রকাশ্যে আসা চ্যাটগুলোর মধ্যে ছিল চাকরির জীবনবৃত্তান্ত তৈরির অনুরোধ, যেখানে ব্যবহারকারীদের নাম, যোগাযোগের তথ্য এবং কর্মজীবনের অভিজ্ঞতাও উল্লেখ ছিল।
কিছু ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যসেবাসহ বিভিন্ন খাতের গোপন গবেষণার তথ্য এবং ব্যক্তিগত আলাপচারিতার প্রতিলিপিও পাওয়া গেছে, যা অনেকের মতে প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব গোপন তথ্য হতে পারে।
আগেও ঘটেছে এমন ঘটনা
এটি প্রথম নয়। গত বছর ওপেনএআইয়ের চ্যাটজিপিটির ক্ষেত্রেও প্রায় একই ধরনের ঘটনা ঘটেছিল। তখন কিছু ব্যবহারকারীর চ্যাট সার্চ ইঞ্জিনে প্রকাশ্যে দেখা যাচ্ছিল। পরে ওপেনএআই সেই ব্যবস্থা পরিবর্তন করে, যাতে এ ধরনের তথ্য সহজে প্রকাশ্যে না আসে।
একইভাবে গত বছর ইলন মাস্কের মালিকানাধীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সের এআই চ্যাটবট গ্রোকেরও কয়েক লাখ কথোপকথন অনলাইনে উন্মুক্ত হয়ে পড়েছিল।
গুগলের বক্তব্য
গুগলের একজন মুখপাত্র বিবিসিকে জানিয়েছেন, ইন্টারনেটে কোন ওয়েবপেজ প্রকাশ্যে থাকবে, সেটি গুগল ঠিক করে না।
তিনি বলেন, ওয়েবসাইটের মালিকেরাই ঠিক করেন কোনো পেজ সার্চ ইঞ্জিনে ইনডেক্স হবে কি না। গুগল সেই নির্দেশনাই অনুসরণ করে।
বিশেষজ্ঞদের ধারণা, বর্তমানে ক্লডের চ্যাট আর সার্চ ইঞ্জিনে দেখা না যাওয়ায় অ্যানথ্রপিক সম্ভবত প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা নিয়ে এসব লিংক দ্রুত ব্লক করেছে। গুগলে কোনো ওয়েবপেজ সার্চ ফলাফল থেকে সরানোর জন্য ওয়েবসাইটের মালিককেই উদ্যোগ নিতে হয়।
এ ঘটনায় বিং, ব্রেভ ও ডাকডাকগো সার্চ ইঞ্জিনেও ক্লডের কিছু চ্যাট দেখা গিয়েছিল। এ বিষয়ে তাদের কাছেও মন্তব্য চাওয়া হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এআই চ্যাটবট ব্যবহার করার সময় কোনো কথোপকথন শেয়ার করার আগে সতর্ক থাকা জরুরি। ব্যক্তিগত তথ্য, পাসওয়ার্ড, আর্থিক তথ্য, প্রতিষ্ঠানের গোপন নথি বা সংবেদনশীল গবেষণার তথ্য কখনোই এমনভাবে শেয়ার করা উচিত নয়, যাতে সেগুলো অনিচ্ছাকৃতভাবে সবার জন্য উন্মুক্ত হয়ে যেতে পারে।
.png)





