অক্সিজেন ছাড়াই আধা ঘণ্টা সমুদ্রে, যেভাবে বেঁচে ফিরলেন ডুবুরি

এশিয়া পোস্ট ডেস্ক
অক্সিজেন ছাড়াই আধা ঘণ্টা সমুদ্রে, যেভাবে বেঁচে ফিরলেন ডুবুরি
ডাইভিং বেলে বিশ্রাম নিচ্ছেন ক্রিস লেমনস। একজন ডুবুরি হিসেবে তিনি সমুদ্রের তলদেশে তেল পরিকাঠামোর রক্ষণাবেক্ষণের কাজে দিনে ছয় ঘণ্টা সময় কাটাতেন। ছবি: সংগৃহীত

গভীর সমুদ্রের তলদেশে কাজ করার সময় হঠাৎ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল অক্সিজেনের লাইন। দীর্ঘ ৩০ মিনিট অক্সিজেন ছাড়াই কাটল পানির নিচে। অলৌকিক শোনালেও এমনই এক অবিশ্বাস্য ঘটনার মুখোমুখি হয়ে কোনো শারীরিক ক্ষতি ছাড়াই অলৌকিকভাবে বেঁচে ফিরেছেন ক্রিস লেমনস নামে এক অভিজ্ঞ ব্রিটিশ স্যাচুরেশন ডুবুরি।

Advertisement

ভাগ্য, নিখুঁত পেশাদার প্রশিক্ষণ এবং সফল বৈজ্ঞানিক কৌশেলে মৃত্যুর মুখ থেকে তার ফিরে আসার এই রোমাঞ্চকর কাহিনী অবলম্বনে সম্প্রতি ‘লাস্ট ব্রেথ’ নামে একটি পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রও নির্মিত হয়েছে। এ চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন উডি হ্যারেলসন, সিমু লিউ, ফিন কোল এবং ক্লিফ কার্টিস।

কানাডার সিবিসি রেডিও ওয়ানের ফ্ল্যাগশিপ কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স প্রোগ্রাম দ্য কারেন্ট-এর ম্যাট গ্যালোওয়েকে ক্রিস লেমনস জানান, যে দিনটি তার জীবন প্রায় কেড়ে নিতে বসেছিল, সেটি অন্য যেকোনো দিনের মতোই শুরু হয়েছিল। তিনি বলেন, ‘এটি অফিসে অত্যন্ত স্বাভাবিক একটি দিন ছিল।’

ঘটনাটি ঘটেছিল উত্তর সাগরের ঠিক মাঝে, ভূপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১০০ মিটার নিচে। ক্রিস লেমনস তখন অফশোর অয়েল রিগের (তেল উত্তোলনের প্ল্যাটফর্ম) একটি বৃহৎ তেলের ম্যানিফোল্ডে পাইপলাইন সরানোর কাজ করছিলেন। সেখানে ছিল তার সেই ‘অফিস’। তার কাছে সমুদ্রের তলদেশের অফিসটি ছিল খুবই স্বাভাবিক।

বাঁ থেকে ডনকান অ্যালকক, ক্রিস লেমনস, ডেভ ইউয়াসা এবং ক্রেইগ ফ্রেডরিক। দুর্ঘটনার দিনের ক্রু সদস্যরা গত ২৫ ফেব্রুয়ারি নিউ ইয়র্ক সিটির এএমসি লিংকন স্কয়ার থিয়েটারে ‘লাস্ট ব্রেথ’ চলচ্চিত্রের প্রিমিয়ারে অংশ নেন। ছবি: সংগৃহীত
বাঁ থেকে ডনকান অ্যালকক, ক্রিস লেমনস, ডেভ ইউয়াসা এবং ক্রেইগ ফ্রেডরিক। দুর্ঘটনার দিনের ক্রু সদস্যরা গত ২৫ ফেব্রুয়ারি নিউ ইয়র্ক সিটির এএমসি লিংকন স্কয়ার থিয়েটারে ‘লাস্ট ব্রেথ’ চলচ্চিত্রের প্রিমিয়ারে অংশ নেন। ছবি: সংগৃহীত

অফশোর অয়েল রিগগুলোর রক্ষণাবেক্ষণের কাজে একজন স্যাচুরেশন ডাইভার হিসেবে প্রতিদিন ছয় ঘণ্টা সময় কাটাতেন। স্যাচুরেশন ডুবুরিরা সমুদ্রের তলদেশের অত্যন্ত তীব্র চাপের সঙ্গে নিজেদের মানিয়ে নেওয়ার জন্য একনাগাড়ে কয়েক দিন থেকে কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত একটি চাপযুক্ত চেম্বারের ভেতরে কাজ করেন।

৮ হাজার টনের জাহাজের সঙ্গে লড়াই

সেদিন কাজ করার সময় হঠাৎ জাহাজের কম্পিউটার সিস্টেমে ত্রুটি দেখা দেয়। প্রচণ্ড ঢেউ ও বাতাসে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে ওপরের মূল জাহাজটি। তিন সদস্যের ডুবুরি দলের সুপারভাইজার অবিলম্বে তাদের ডাইভিং বেলে ফিরে আসার নির্দেশ দেন।

সহকর্মী ডেভিড ইউয়াসা কোনোমতে সাঁতরে বের হতে পারলেও লেমনসের ৪৫ মিটার লম্বা ‘আম্বিলিক্যাল কর্ড’ বা সংযোগকারী পাইপটি ম্যানিফোল্ডের লোহার কাঠামোতে আটকে যায়। এই পাইপটিই ছিল তার জীবন রক্ষাকারী তাপ ও শ্বাস নেওয়ার একমাত্র উৎস। ওপরে ৮ হাজার টনের বিশাল জাহাজের টানে পাইপটিতে টান বাড়তেই থাকে।

লেমনস বলেন, ‘হঠাৎ করে আমি মূলত একটি বিশাল জাহাজের নোঙরে পরিণত হয়েছিলাম। আর স্পষ্টতই, এমন পরিস্থিতিতে জয়ী কেবল একজনই হতে পারে।’

এক পর্যায়ে ইউয়াসা তাকে সাহায্য করতে এগিয়ে এলেও নিজের কেবলের দৈর্ঘ্য শেষ হয়ে যাওয়ায় ব্যর্থ হন। এরপর এক প্রবল টানে ইউয়াসাকে নিয়ে ডাইভিং বেলটি অন্ধকারের দিকে চলে যায়। এর পরপর শটগান ফোটার মতো বিকট শব্দ করে ছিঁড়ে যায় লেমনসের বেচে থাকার মূল লাইন।

নিয়ন্ত্রণহীন নৌকাটি ইউয়াসাকে তার সহকর্মীর কাছ থেকে দূরে এবং গভীর সমুদ্রের অন্ধকারের দিকে টেনে নিয়ে যাওয়ার আগে দুই ডুবুরি শেষবারের মতো একে অপরের দিকে তাকান।

মৃত্যুর মুখে এক অদ্ভুত শান্তি

পানির নিচে তখন ঘুটঘুটে অন্ধকার। লেমনস দ্রুত তার পিঠে থাকা জরুরি রিজার্ভ এয়ার ট্যাংকের ভালভ (বাতাসের চাপ নিয়ন্ত্রণ, সংরক্ষণ ও সরবরাহকারী যন্ত্র) খুলে দেন, যা দিয়ে বড়জোর ৮ থেকে ৯ মিনিট শ্বাস নেওয়া সম্ভব ছিল। একা ও সম্পূর্ণ অসহায় অবস্থায় তিনি তেলের কাঠামোর ওপরে উঠে জাহাজের খোঁজ করেন, কিন্তু কোথাও কিছু ছিল না।

লেমনস বলেন, ‘আমি যখন বুঝলাম নিজেকে বাঁচানোর কোনো ক্ষমতা আমার নেই এবং কেউ পাশে নেই, তখন মনের ভেতর এক অদ্ভুত শান্তি অনুভূতি হলো। আমি খুব দ্রুত নিজেকে এই বাস্তবতার কাছে সঁপে দিয়েছিলাম যে, সম্ভবত এটিই সেই জায়গা যেখানে আমি মারা যাচ্ছি!’

লন্ডনে এক সেমিনারে নিজের অভিজ্ঞতা নিয়ে বক্তব্য দিচ্ছেন লেমনস। ছবি: সংগৃহীত
লন্ডনে এক সেমিনারে নিজের অভিজ্ঞতা নিয়ে বক্তব্য দিচ্ছেন লেমনস। ছবি: সংগৃহীত

তিনি সমুদ্রের তলদেশে কাঠামোর ওপর কুণ্ডলী পাকিয়ে শুয়ে পড়েন, যাতে পরে তাকে খুঁজে পেতে সুবিধা হয়। কেমব্রিজের মধ্যবিত্ত পরিবারে বড় হওয়া ৩২ বছর বয়সি লেমনস তখন ভাবছিলেন তার অপূর্ণ স্বপ্ন, ভ্রমণ, নিজের বাড়ি কিংবা সন্তান না হওয়ার আফসোস নিয়ে। বাবা-মাকে মৃত্যুর খবর দেওয়ার কথা ভাবতে ভাবতে একপর্যায়ে তার শ্বাসপ্রশ্বাস কঠিন হয়ে পড়ে এবং তিনি জ্ঞান হারান।

ভাগ্য নাকি নিখুঁত বিজ্ঞান

ততক্ষণে ওপরের ক্রুরা জাহাজের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেয়ে আরওভি নামক ক্যামেরা যুক্ত একটি চালকবিহীন সাবমেরিন নিচে পাঠান এবং সহকর্মী ইউয়াসার সহায়তায় লেমনসকে উদ্ধার করে ডাইভিং বেলে ফিরিয়ে আনেন। কিন্তু ততক্ষণে কেটে গেছে দীর্ঘ আধা ঘণ্টা। সাধারণত এত সময় অক্সিজেন না থাকলে মানুষের মস্তিষ্কের স্থায়ী ক্ষতি বা মৃত্যু হওয়া নিশ্চিত।

লেমনস নিজেকে ভাগ্যবান মনে করলেও জার্মানির ফিজিওলজির অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক জোচেন শিপকে তার তৈরি করা কেস রিপোর্টে এ ঘটনাকে দেখছেন ভিন্নভাবে। তার মতে, এটি ভাগ্য নয় বরং বিজ্ঞানের নিখুঁত প্রক্রিয়া এবং দুর্দান্ত প্রশিক্ষণ।

অধ্যাপক শিপকে জানান, ‘লেমনস যখন মৃত্যুর কথা ভেবে শান্ত হয়ে যান, তখন তার শ্বাসপ্রশ্বাস ধীর হয়ে আসে, যা অক্সিজেন কম খরচ করতে সাহায্য করে। এছাড়া ডুবুরিদের ব্যবহৃত হেলিওক্স (হিলিয়াম ও অক্সিজেন) গ্যাসের মিশ্রণ শরীরকে দ্রুত ঠাণ্ডা করে দেয়।’

তিনি আরও বলেন, ‘ডাইভিং বেলে আনার সময় লেমনসের শরীরের তাপমাত্রা ছিল মাত্র ২৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। শীতল তাপমাত্রায় মানুষের শরীরের কোষে অক্সিজেনের চাহিদা অনেক কমে যায়, যা লেমনসকে দীর্ঘক্ষণ বাঁচিয়ে রাখতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করেছে। পাশাপাশি লেমনসের চমৎকার শারীরিক গঠন এবং উদ্ধারকারী দলের নিখুঁত ও দ্রুত পদক্ষেপও এর পেছনে কাজ করেছে।’

এই অবিশ্বাস্য ঘটনার মাত্র তিন সপ্তাহের মাথায় ক্রিস লেমনস আবার তার পুরনো পেশায় ফিরে যান এবং আরও ১০ বছর ডুবুরি হিসেবে কাজ করেন। ভাগ্য, বিজ্ঞান, নিখুঁততা বা অন্য যেকোনো কারণেই হোক না কেন, লেমনস জানান, তিনি বেঁচে আছেন এতেই তিনি খুশি।

তিনি বলেন, ‘এই ঘটনা থেকে কোনো বড় ধরনের আত্মোপলব্ধি বা জীবন পরিবর্তন আসেনি। হয়তো কেবল মৃত্যুর প্রতি একটি ‘তীব্র সচেতনতা’ তৈরি হয়েছে। আমি বুঝেছি, জীবন আসলেই তার নিজের গতিতে চলে। জিনিসগুলো দ্রুত ভুলে যাওয়া হয় এবং আপনি এগিয়ে যান এবং... অস্তিত্বের সংকীর্ণতা হঠাৎ করে দখল করে নেয়।’

তবে জীবন নিয়ে কোনো বড় আত্মোপলব্ধি না ঘটলেও মৃত্যুর প্রতি তার এক ধরনের তীব্র সচেতনতা তৈরি হয়েছে, এটা সত্য। বর্তমানে তিনি পানির নিচে যাওয়া ছেড়ে দিয়েছেন। এখন তিনি ডাইভ সুপারভাইজার হিসেবে নিরাপদ শুকনো স্থানে বসে কাজ পরিচালনা করেন এবং বিভিন্ন সেমিনারে নিজের এই জীবন জয়ের গল্প শুনিয়ে বেড়ান।


সূত্র: সিবিসি