আমেরিকার স্বাধীনতার ২৫০ বছর, ইতিহাস ধামাচাপার চেষ্টা

এশিয়া পোস্ট ডেস্ক
আমেরিকার স্বাধীনতার ২৫০ বছর, ইতিহাস ধামাচাপার চেষ্টা
যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভানিয়ার ফিলাডেলফিয়ায় প্রেসিডেন্টের বাসভবনের পাশ দিয়ে লোকজন হেঁটে যাচ্ছেন। ছবি: সংগৃহীত

বর্ণিল আলো আর উৎসবের আমেজে যুক্তরাষ্ট্র উদযাপন করছে তার ২৫০তম স্বাধীনতা দিবস। আড়াইশ বছরের এই ঐতিহাসিক মাইলফলক ঘিরে পুরো দেশ মেতে উঠেছে ড্রোন শো, চোখ ধাঁধানো আতশবাজি আর প্যারেডের মহোৎসবে। তবে এই জাঁকজমকপূর্ণ উদযাপনের আড়ালে দেখা দিয়েছে একটি প্রশ্ন। দেশটি কি তার আসল ইতিহাস স্বীকার করছে, নাকি সুকৌশলে তা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা চলছে? ইতিহাসবিদ ও সমালোচকদের মতে, এই পুরো আয়োজনটি আসলে ইতিহাসকে সুকৌশলে ‘শোধন’ করার একটা রাজনৈতিক প্রচেষ্টা মাত্র।

১৭৭৬ সালের ৪ জুলাই তেরোটি ব্রিটিশ উপনিবেশের প্রতিনিধিরা ঐতিহাসিক ‘স্বাধীনতার ঘোষণা’ গ্রহণ করেছিলেন। এর মাধ্যমে গ্রেট ব্রিটেন থেকে মুক্ত হয়ে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের জন্ম হয়। ‘সেকেন্ড কন্টিনেন্টাল কংগ্রেস’ এই স্বাধীনতার ঘোষণা অনুমোদন করে। এই দলিলের অন্যতম প্রধান লেখক ছিলেন থমাস জেফারসন, যিনি পরবর্তীতে দেশটির তৃতীয় প্রেসিডেন্ট হয়েছিলেন।

এবারের ঐতিহাসিক দিবসটি উদযাপনে কোনো কমতি রাখা হয়নি। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মাউন্ট রাশমোরের পাহাড়ে দাঁড়িয়ে আমেরিকার বীরত্বের জয়গান গাইছেন। সরকারি অর্থায়নে ‘ফ্রিডম ট্রাক’ নামের ভ্রাম্যমাণ জাদুঘর আমেরিকার বিপ্লব আর স্বাধীনতার গল্প ফেরি করে বেড়াচ্ছে দেশময়। ফিলাডেলফিয়ার আকাশে ড্রোনের আলোয় ফুটিয়ে তোলা হচ্ছে চাঁদে মানুষের পা রাখার মতো গৌরবময় সব অর্জন।

সমালোচকদের মতে, আমেরিকার জন্ম যেমন স্বাধীনতার হাত ধরে, ঠিক তেমনই এর ভিত্তি গড়ে উঠেছে দাসপ্রথা, কৃষ্ণাঙ্গদের ওপর নির্যাতন আর আদিবাসীদের জমি কেড়ে নেওয়ার মতো নির্মম সত্যের ওপর। জাঁকজমকের আড়ালে এই সত্যগুলো নিয়ে এখন চলছে দ্বন্দ্ব।

সম্প্রতি ফিলাডেলফিয়ার ঐতিহাসিক ‘প্রেসিডেন্টস হাউস’ থেকে দাসপ্রথা সম্পর্কিত প্রদর্শনীর প্যানেলগুলো সরিয়ে নিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। সরকারের যুক্তি, এসব বিষয় সমাজে ‘বিভাজন’ তৈরি করে। তাই এগুলো বাদ দিয়ে শুধু দেশের মূল আদর্শ ও ইতিবাচক দিকগুলো প্রচার করা উচিত। অন্যদিকে ইতিহাসবিদদের দাবি, এর মাধ্যমে আমেরিকার প্রকৃত ইতিহাসকে আড়াল করে একতরফা দেশপ্রেম চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে।

ইতিহাসের এই রাজনৈতিক লড়াইয়ে বড় ধাক্কা খেয়েছে দেশটির বিভিন্ন সংখ্যালঘু ও প্রান্তিক গোষ্ঠীর ইতিহাস সংরক্ষণকারী প্রতিষ্ঠানগুলো। নতুন সরকারি নিয়ম অনুযায়ী, যেসব জাদুঘর আমেরিকার ‘ইতিবাচক ও অনুপ্রেরণামূলক’ গল্প শোনাবে, কেবল তারাই সরকারি তহবিল পাবে। এর ফলে বিপাকে পড়েছে কৃষ্ণাঙ্গ, আদিবাসী কিংবা লিঙ্গবৈচিত্র্য সম্প্রদায়ের সংগ্রামের ইতিহাস তুলে ধরা জাদুঘরগুলো। অনুদান হারিয়ে অনেক ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠান এখন চরম আর্থিক সংকটে ভুগছে। অনেকে বাধ্য হয়ে সরকারি অনুদানের আবেদন করাই ছেড়ে দিয়েছেন।

রাজনৈতিক ও সামাজিক এই লড়াইয়ের সঙ্গে এবার যুক্ত হয়েছে প্রকৃতির রুদ্ররূপও। একদিকে তীব্র তাপদাহের কারণে ওয়াশিংটন ডিসি’র মেলা বন্ধ করতে হচ্ছে। অন্যদিকে আমেরিকার পশ্চিমাঞ্চলে জ্বলছে দাবানল। এই দাবানলের কারণে অনেক জায়গায় স্বাধীনতা দিবসের ঐতিহ্যবাহী আতশবাজি প্রদর্শনী বাতিল করতে হয়েছে।

সব মিলিয়ে, আমেরিকার এই ২৫০তম স্বাধীনতা দিবস যেন এক অদ্ভুত বৈপরীত্যের প্রতীক। একদল আমেরিকান যখন আড়াইশ বছরের সাফল্য নিয়ে উৎসবে মেতে আছেন, অন্যদল তখন প্রশ্ন তুলছেন। তারা জানতে চাচ্ছেন, যাদের রক্ত আর ঘামের ওপর এই দেশ দাঁড়িয়ে, তাদের ইতিহাসকে বাদ দিয়ে এই স্বাধীনতার পূর্ণতা আছে কি না।

সূত্র: রয়টার্স