ইরানের ভেতরে মোসাদের গোপন মিশন, বেরিয়ে এল চাঞ্চল্যকর তথ্য

ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে আবারও হুমকি-ধমকি দিয়ে আসছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। দেশটিতে দ্বিতীয় দফায় হামলা করতে করতেও করেননি। মিত্র দেশ ইসরায়েল নাকি আপত্তি জানিয়েছে। এদিকে অ্যাক্সিওস জানিয়েছে, হামলা চালানোর জন্য ইরানের গোপন তথ্য ও নথি ওয়াশিংটনের কাছে হস্তান্তর তেল আবিব। এর একদিন পরই ইরানের অভ্যন্তরে ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের গোপন মিশন নিয়ে একটি ভিডিও সাক্ষাৎকার প্রকাশ করেছে চ্যানেল ১২ (কেশেত)।
আন্তর্জাতিক মনোযোগ আকর্ষণ করেছে অনুসন্ধানী অনুষ্ঠান ইউভদাতে সম্প্রচারিত বিশেষ প্রতিবেদনটি। সেখানে ‘আরাশ’ নামের (ছদ্মনাম) এক ব্যক্তি স্বঘোষিত ইরানের ভেতরে মোসাদের জন্য কাজ করার বিশ্বাসযোগ্য অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছেন। এই সাক্ষাৎকারটি ইরান ও ইসরায়েলের বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠেছে।
সংবাদমাধ্যম জেরুজালেম পোস্ট বলছে, প্রতিবেদনে আরাশ নিজেকে আফগান বংশোদ্ভুত ইরানি নাগরিক দাবি করেছেন। তিনি মোসাদ কর্তৃপক্ষের নির্দেশে একটি গোপন অস্ত্র ও গুপ্তচরী দলকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। এই অভিজ্ঞতা আরও স্পষ্ট করে দেয় যে, তিনি ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থার ভেতরে সরাসরি যোগাযোগ রেখেছেন এবং একটি বড় ধরনের অভিযান বাস্তবায়নে দায়িত্ব পালন করেছেন।
ইউভদা‑তে সম্প্রচারিত অংশে আরাশ বলেছেন, ২০২৫ সালের জুন মাসে ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে সংঘর্ষের সময় তিনি এবং তার দল একটি বিশেষ অস্ত্র ব্যবস্থা সেট‑আপ করেন, যা ইসরায়েলের লক্ষ্যবস্তু হওয়া একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র লঞ্চারকে ধ্বংস করার জন্য পরিকল্পিত ছিল। তিনি জানান, অভিযানটি রাতের অন্ধকারে শুরু হয় এবং তিনি তেল আবিবে মোসাদ সদর দপ্তরের সঙ্গে নিয়মিত সরাসরি যোগাযোগ রেখেছিলেন। আরাশ নিজেকে ‘মোসাদের চোখ’ হিসেবে অভিহিত করেন।
আরাশ আরও বলেন, অস্ত্র সেটআপ করতে তার দলকে প্রায় ১ ঘণ্টা ৪০ মিনিট সময় লেগেছিল। পরিকল্পনা অনুযায়ী সকালের দিকে যখন ‘সিগন্যাল’ পাওয়া গেল, তখন তিনি যন্ত্রটি সক্রিয় করেন এবং লক্ষ্য ক্ষেপণাস্ত্র লঞ্চারটি ধ্বংস হতে দেখে।
দ্য ইকোনমিক টাইমস বলছে, এই সাক্ষাৎকারটি শুধু এক ব্যক্তি বা এক অভিযানেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং প্রতিবেদনটি ইঙ্গিত দেয় যে মোসাদ ইরানের ভেতরে গোপন অপারেশনে আফগান নাগরিকদের বা আফগান বংশোদ্ভূত ইরানি নাগরিকদের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভর করছে। এর কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, এই ধরনের লোকেরা ভাষা, সংস্কৃতি ও সামাজিক পরিবেশ সম্পর্কে পূর্ব-জ্ঞান রাখে এবং সহজেই স্থানীয় পরিবেশে মিশে যেতে পারে, যা বিদেশি গোয়েন্দাদের জন্য কঠিন।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এই ধরনের অপারেশনগুলো ইরানের কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থার মধ্যে প্রবেশ করার জন্য নতুন কৌশল হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। আঞ্চলিক ভাষা ও সমবায় নেটওয়ার্ক থাকার কারণে আফগান ও তার মতো পরিচয়ের ব্যক্তিরা সন্দেহ কম আকর্ষণ করে এবং কাজ সম্পন্ন করার জন্য ছদ্মব্যক্তিত্ব গড়ে তুলতে সুবিধা পায়। এই ধরনের নেটওয়ার্ক কেবল ইরানেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং পুরো অঞ্চলজুড়ে, বিশেষ করে পাকিস্তান ও অন্যান্য দেশেও আফগান নাগরিকদের ভূমিকা তথ্য সংগ্রহ, লজিস্টিক সহায়তা এবং গুপ্তচরী কার্যক্রমে দীর্ঘদিন ধরে লক্ষ্য করা গেছে।
মোসাদের এই পদ্ধতি গোয়েন্দা কর্মের ইতিহাসে নতুন নয়, তবে এই ধরনের ব্যক্তিগত সাক্ষাৎকার ও অপারেশনের প্রতিশ্রুতি প্রকাশ্যে আসাটা বিরল ঘটনা। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা ইতোমধ্যেই এই ঘটনাকে সিরিয়া, লেবানন বা অন্যান্য অঞ্চলের মতো ভূমধ্য-পূর্ব ও দক্ষিণে এশিয়ার সংকট অঞ্চলের সঙ্গে তুলনা করছেন, যেখানে স্থানীয় বা অভিবাসী নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে তথ্য সংগ্রহ ও কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়েছে।
ইরান‑ইসরায়েল সংঘাতের এই আবহে, ঘটনাটি বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন আলোচনার ঝড় তুলেছে, বিশেষ করে ইরানি এলিট ও নিরাপত্তা সংস্থার ভেতরে গোপন যোগাযোগ ও অপারেশনের ব্যাপারে। মোসাদ বা ইসরায়েল সরকার এখনো এই প্রকাশিত সাক্ষাৎকার বা অভিযানের বিষয়ে সরকারি মন্তব্য দেয়নি।
অবশ্য গত বছর ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হামলার পর থেকেই দেশের অভ্যন্তরে গুপ্তচরবৃত্তিকারীদের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নিয়েছে ইরান। অভিযোগ প্রমাণ হলেই কঠোর শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে আসছে। ইরান হিউম্যান রাইটসের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জুন থেকে এ পর্যন্ত দেশটিতে প্রায় এক হাজার ৫০০ জনকে ফাঁসি দেওয়া হয়েছে। অবশ্য এ নিয়ে উদ্বেগ জানিয়ে আসছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো।