Advertisement

৫৭ জনের মৃত্যুর পর ফিরে যাচ্ছেন অভিবাসীরা

এশিয়া পোস্ট ডেস্ক
৫৭ জনের মৃত্যুর পর ফিরে যাচ্ছেন অভিবাসীরা
সাঁতার কেটে সীমান্ত অতিক্রম করা বেশির ভাগ অভিবাসী মরক্কো ফিরে যাচ্ছেন। ছবি: রয়টার্স

উত্তর আফ্রিকায় স্পেনের ভূখণ্ড সেউতায় অভিবাসীদের একটি বিশাল অনুপ্রবেশকে ঠেকিয়ে দেওয়ার দাবি করেছে দেশটির সরকার। স্থানীয় সময় শুক্রবার (৩১ জুলাই) সেউতায় স্পেন সরকারের প্রতিনিধি জানিয়েছেন, স্থল ও সমুদ্রপথে সীমান্ত অতিক্রম করা ৫০ হাজারেরও বেশি মানুষের অধিকাংশই ইতোমধ্যে স্বেচ্ছায় ফেরত যেতে শুরু করেছেন। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

সেউতায় স্পেন সরকারের প্রতিনিধি জানান, সীমান্ত এলাকার স্প্যানিশ অংশে ৫৭টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে এবং মরক্কো অংশেও হতাহতের ঘটনা ঘটে থাকতে পারে। সীমান্ত প্রাচীরের ব্রেকওয়াটারে (ঢেউ নিরোধক বাঁধ) ওঠার চেষ্টা করার সময় অনেকে পানিতে ডুবে এবং অনেকে চাপা পড়ে মারা যান।

স্পেনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) সকাল থেকে প্রায় ৫০ হাজার মানুষ সীমান্ত পার হয়েছিলেন। ধারণা করা হচ্ছে, শুক্রবার বিকেল ৬টার মধ্যে তাদের মধ্যে ৪৮ হাজার ৩০০ জনই ফেরত চলে গেছেন। তবে সেউতার স্থানীয় সরকারের প্রধান জুয়ান জেসুস ভিভাস জানান, গত দুদিনে প্রায় ৬০ হাজার মানুষ সীমান্তে জোরপূর্বক প্রবেশের চেষ্টা চালিয়েছিলেন।

এদিকে মরক্কোর ভূখণ্ড থেকে ভূমধ্যসাগরে ছড়িয়ে থাকা ক্ষুদ্র স্প্যানিশ ভূখণ্ড সেউতায় যাতে নতুন করে কেউ প্রবেশ করতে না পারে, সেজন্য সীমান্ত গেটগুলোতে মরক্কোর নিরাপত্তা বাহিনী লাঠিচার্জ ও টিয়ার গ্যাস ছুঁড়ে জনতাকে ছত্রভঙ্গ করে দেয়।

সীমান্তে এই হঠাৎ অনুপ্রবেশের ঘটনাটি ইউরোপজুড়ে বিভেদ সৃষ্টি করেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) অন্যান্য সদস্যরাষ্ট্রের নেতারা এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য স্পেনের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।

ইতালি জানিয়েছে, তারা স্পেনের সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সীমান্তমুক্ত ‘শেনজেন’ চুক্তি সাময়িকভাবে স্থগিত করছে। এই ব্যবস্থার ফলে দুই দেশের মধ্যে বিমান বা জাহাজে ভ্রমণকারী যাত্রীরা প্রভাবিত হবেন। তবে স্পেন সরকার জানিয়েছে, ইতালির এই পদক্ষেপ ইইউ চুক্তির পরিপন্থী।

মরক্কোর নিরাপত্তা বাহিনী লাঠিচার্জ ও টিয়ার গ্যাস ছুঁড়ে অভিবাসীদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়। ছবি: রয়টার্স
মরক্কোর নিরাপত্তা বাহিনী লাঠিচার্জ ও টিয়ার গ্যাস ছুঁড়ে অভিবাসীদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়। ছবি: রয়টার্স

‘আমি ফিরে যাচ্ছি’

সীমান্ত এলাকায় রয়টার্সের প্রতিনিধিরা দেখতে পান, দাঙ্গা সরঞ্জাম পরা মরক্কোর পুলিশ বেড়ার কাছে জড়ো হওয়া মানুষকে ছত্রভঙ্গ করতে টিয়ার গ্যাস ব্যবহার করছে। সংঘর্ষের স্থানে জলকামানবাহী গাড়ি মোতায়েন করতে দেখা যায় এবং একটি বাস ও সাতটি প্রাইভেটকার পোড়া অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখা যায়।

অন্যদিকে, স্পেনের সীমান্তের একাংশে তাদের সামরিক যানবাহন সারিবদ্ধভাবে রাখা ছিল। সেখান থেকে শত শত অভিবাসীকে মরক্কোর পাহাড়ি অঞ্চল থেকে সীমান্তের দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখা যায়, কিন্তু তারা সীমান্ত পার হতে পারছিলেন না।

কয়েকশত মানুষকে সীমান্ত পোস্ট ও বেড়ার ফাঁক গলে পুনরায় মরক্কোতে ফিরে যেতে দেখা গেছে। তাদের কয়েকজন জানান, সেউতায় তারা কোনো খাবার বা আশ্রয়ের ব্যবস্থা করতে পারেননি।

তাঞ্জিয়ার থেকে আসা এক তরুণ রয়টার্সের মরক্কান প্রতিনিধিকে বলেন, ‘সত্যি বলতে আমি কেন এসেছি তা নিজেই জানি না। এখন আবার ফিরে যাচ্ছি। সঙ্গে টাকা আনা সত্ত্বেও গতকাল দুপুরের পর থেকে কিছু খাইনি। আমরা যা করছি তা সঠিক নয় এবং এতে কোনো আনন্দও নেই।’

লারাচে বন্দর নগরীর ২০ বছর বয়সী হেয়ারড্রেসার আইমান (ছদ্মনাম) জানান, পাঁচ ঘণ্টা সাঁতার কেটে বুধবার তিনি সীমান্ত অতিক্রম করেছিলেন। তিনি বলেন, সেউতার ভেতরে কোনো খাবার ছিল না এবং স্প্যানিশ সেনাবাহিনী আমাদের নিষ্ঠুরভাবে বের করে দিয়েছে।

অনুপ্রবেশ ঠেকাতে স্পেনের সীমান্তের একাংশে সামরিক যানবাহন সারিবদ্ধভাবে মোতায়েন ছিল। ছবি: রয়টার্স
অনুপ্রবেশ ঠেকাতে স্পেনের সীমান্তের একাংশে সামরিক যানবাহন সারিবদ্ধভাবে মোতায়েন ছিল। ছবি: রয়টার্স

নজিরবিহীন অনুপ্রবেশ

স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ শুক্রবার সেউতা সফর করেন, সেখানে বিক্ষোভকারীরা তাকে ভুয়া বলে স্লোগান দেন। তিনি এই গণ-অনুপ্রবেশকে ‘স্পেনের আঞ্চলিক সার্বভৌমত্বের লঙ্ঘন’ বলে আখ্যা দেন এবং জানান, মরক্কোর পূর্ণ সহযোগিতায় অবৈধভাবে প্রবেশকারীদের দ্রুত নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর কাজ জোরদার করা হচ্ছে।

উত্তর মরক্কোর সীমান্তবর্তী স্পেনের স্বায়ত্তশাসিত দুটি শহর হলো সেউতা ও মেলিলা। আফ্রিকায় ইউরোপীয় ইউনিয়নের একমাত্র স্থল সীমান্ত রয়েছে এই শহর দুটিতে। উভয় শহরেই সময়ে সময়ে ইউরোপে প্রবেশের চেষ্টাকারী অভিবাসীদের চাপ বাড়ে, তবে বৃহস্পতিবারের এই অনুপ্রবেশের মাত্রা ছিল নজিরবিহীন।

ইউরোপের ডানপন্থী রাজনৈতিক দলগুলো এই ঘটনার জন্য স্পেনের শিথিল অভিবাসন নীতিকে দায়ী করেছে, যার মধ্যে চলতি বছরে লাখ লাখ অবৈধ অভিবাসীকে দেওয়া সাধারণ ক্ষমাও অন্তর্ভুক্ত।

ইতালির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্তোনিও তাজানি দাবি করেছিলেন, স্পেনের সাধারণ ক্ষমার নীতিই মানব পাচারকে উৎসাহিত করেছে। এ ঘটনায় স্পেন ইতালির রাষ্ট্রদূতকে তলব করে তাজানির বক্তব্যের প্রতিবাদ জানিয়েছে।

এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্যাবিনেট বৈঠকে সেউতার এই ঘটনাকে ‘আক্রমণের মতো’ বলে মন্তব্য করেন। আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনের দিকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, রিপাবলিকানরা নির্বাচিত না হলে আমাদের দেশেও একই ঘটনা ঘটবে, এমনকি এর চেয়েও খারাপ হতে পারে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর এই ঘটনার জন্য সরাসরি স্পেন সরকারকেই দায়ী করেছে। পোস্টে বলা হয়েছে, এই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাটি ইউরোপে গণ-অবৈধ অভিবাসনকে উৎসাহিত ও সহজ করার বিষয়ে স্প্যানিশ সরকারের নেওয়া মনগড়া প্রচেষ্টার সরাসরি ফল। এই হুমকি থেকে দেশে ও বিদেশে আমেরিকানদের রক্ষা করতে আমরা প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ বিবেচনা করছি এবং একই ধরনের বিকল্প ভাবা অন্যান্য ইউরোপীয় সহযোগীদের সহায়তা করতে প্রস্তুত।

এদিকে, ফরাসি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরেন্ট নুনেজ জানিয়েছেন, শনিবারের মধ্যে স্প্যানিশ সীমান্তে পুলিশি উপস্থিতি পাঁচ গুণ বাড়ানো হবে। পাশাপাশি আকাশপথে নজরদারি ও ট্রেনে টহল জোরদার করা হবে।

সাধারণত ইউরোপীয় দেশগুলোর জন্য শেনজেন অঞ্চলের অভ্যন্তরীণ সীমান্তে তল্লাশি চালানো নিষিদ্ধ, তবে ব্যতিক্রমী পরিস্থিতিতে সাময়িকভাবে এই তল্লাশি পুনরায় শুরু করা যায়।

এক্সে দেওয়া এক পোস্টে স্পেনের গার্দিয়া সিভিল পুলিশ অ্যাসোসিয়েশন জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার হঠাৎ সীমান্তে অভিবাসীদের চাপ বাড়ায় তা সামলানোর মতো পর্যাপ্ত পুলিশ সেখানে ছিল না, যার ফলে অনুপ্রেবেশ ঠেকানো সম্ভব হয়নি।

স্পেনের আঞ্চলিক নীতিবিষয়ক মন্ত্রী অ্যাঞ্জেল ভিক্টর তোরেস বলেন, এই অনুপ্রবেশ বাড়ার পেছনে চলতি মাসের শুরুতে দেওয়া স্পেনের সুপ্রিম কোর্টের একটি রায় ভূমিকা রেখে থাকতে পারে। সেই রায়ে বলা হয়েছিল, সমুদ্রপথে সেউতা বা মেলিলায় পৌঁছানোর চেষ্টা করার সময় আটক হওয়া অভিবাসীদের সীমান্ত থেকে তাৎক্ষণিকভাবে ফেরত পাঠানো যাবে না। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রায়টিতে তাদের চূড়ান্ত বহিষ্কারে কোনো বাধা ছিল না।

সীমান্তের মরক্কো অংশে নিরাপত্তা বাহিনীর জোরালো তৎপরতা সত্ত্বেও সারা রাত হাজার হাজার অভিবাসী ফ্নিদেক শহরে ভিড় জমান। তবে তাদের অধিকাংশই পার হতে ব্যর্থ হন। শুক্রবার বিকেলের দিকে কেউ কেউ ফিরতে শুরু করেন।

সীমান্ত গেট অবরুদ্ধ থাকায় কিছু দল বেড়ার চারপাশ ঘুরে অন্য পথ খোঁজার চেষ্টা করে। তাঞ্জিয়ার থেকে আসা ৩২ বছর বয়সী ইব্রাহিম বলেন, ‘আমার পৌঁছাতে দেরি হয়ে গিয়েছিল।’ তিনি গেট দিয়ে ঢোকার আশায় এলেও এসে দেখেন গেট সম্পূর্ণ বন্ধ।