আবারও বিক্ষোভে উত্তাল নেপাল, বালেন শাহের পদত্যাগ দাবি

এশিয়া পোস্ট ডেস্ক
আবারও বিক্ষোভে উত্তাল নেপাল, বালেন শাহের পদত্যাগ দাবি
বালেন শাহ। ছবি: সংগৃহীত

জেন-জি আন্দোলনের মুখে সরকার পতনের পর মাত্র কয়েক মাস আগে নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন সরকার গঠন করেছে নেপাল। এবার নেপালের সেই সরকারের বিরুদ্ধে আবারও রাজপথে নেমেছে ক্ষুব্ধ তরুণ সমাজ।

রাজধানী কাঠমান্ডুর রাস্তায় এক রাইড-শেয়ারিং চালকের আত্মহত্যার ঘটনাকে কেন্দ্র করে এই বিক্ষোভ শুরু হয়েছে। সাধারণ মানুষের অভিযোগ, প্রধানমন্ত্রী তথা সরকারপ্রধান বালেন্দ্র (বালেন) শাহের কঠোর ও দমনমূলক নীতির কারণে এই করুণ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। দেশের জেনারেশন জেড (জেন-জি) বা নতুন প্রজন্মের হাজার হাজার তরুণ এখন এই ঘটনার বিচার, সরকারের জবাবদিহিতা এবং বালেন শাহর পদত্যাগ চেয়ে আন্দোলন চালাচ্ছেন।

সংবাদমাধ্যম এনডিটিবির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রোববার (১২ জুলাই) রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ সরকারি ভবন সিংহলিল দরবার সেক্রেটারিয়েটের সামনে শত শত তরুণ প্ল্যাকার্ড ও ব্যানার নিয়ে তীব্র বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন। আন্দোলনকারীরা ‘দরিদ্রদের ওপর অত্যাচার বন্ধ করো’ এবং ‘মানবাধিকার রক্ষা করো’ বলে স্লোগান দিতে থাকেন। একই সঙ্গে তারা সরকারের উচ্ছেদ অভিযানের শিকার হওয়া নদী তীরের বস্তিবাসীদের পুনর্বাসন এবং বেআইনি গ্রেপ্তার বন্ধের দাবি জানান।

সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত বৃহস্পতিবার কাঠমান্ডুর একটি সড়কে গণেশ নেপালি (২৫) নামের এক তরুণ রাইড-শেয়ারিং চালক তার মোটরসাইকেল নিয়ে এক গ্রাহকের জন্য অপেক্ষা করছিলেন। এ সময় কাঠমান্ডু মিউনিসিপ্যাল (পৌর) পুলিশ এসে হঠাৎ করেই তার বাইকের চাকায় লক লাগিয়ে দেয়।

পৌর পুলিশের এমন আচরণ ও রুটি-রুজি বন্ধের প্রতিবাদে চরম ক্ষোভে ও হতাশায় গণেশ নিজের শরীরে পেট্রোল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেন। আশঙ্কাজনক অবস্থায় তাকে হাসপাতালে নেওয়া হলে পরদিন শুক্রবার তিনি মারা যান। এই মর্মান্তিক মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়তে সাধারণ মানুষের ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটে এবং তারা বালেন শাহর প্রশাসনের বিরুদ্ধে রাজপথে নামেন।

স্থানীয়দের অভিযোগ, ২০২২ সালে মেয়র এবং পরবর্তীতে সরকারপ্রধান হিসেবে বালেন্দ্র (বালেন) শাহ দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে কাঠমান্ডু নগর পুলিশের আগ্রাসী মনোভাব চরম আকার ধারণ করে। ফুটপাত ও অস্থায়ী বাজার উচ্ছেদ এবং নদী তীরের বস্তি ভাঙার ক্ষেত্রে বালেন শাহ প্রশাসন অত্যন্ত কঠোর ও নির্মম নীতি গ্রহণ করে।

বেশ কয়েকবার এই উচ্ছেদ অভিযানগুলো রক্তাক্ত সংঘর্ষে রূপ নেয়। শহরের সবচেয়ে গরিব ও অসহায় মানুষদের প্রতি সরকারের এই চরম নিষ্ঠুরতা সাধারণ মানুষকে দারুণভাবে ক্ষুব্ধ করে তুলেছে। এর ফলেই আজ তার পদত্যাগের দাবিতে সোচ্চার হয়েছে নেপালের তরুণ প্রজন্ম।

স্থানীয় মিউনিসিপ্যাল প্রশাসন তাদের সাংবিধানিক সীমার বাইরে গিয়ে কাজ করছে বলে মত দিয়েছেন আইন বিশেষজ্ঞরা। সিনিয়র অ্যাডভোকেট রাজু চাপাগাইন জানান, নেপালের আইন অনুযায়ী স্থানীয় পৌর পুলিশের কাজ হলো নাগরিকদের বুঝিয়ে এবং সঙ্গে নিয়ে শহরের প্রশাসনিক কাজে সহায়তা করা। তাদের কোনো লাঠিচার্জ, দাঙ্গা দমন বা বলপ্রয়োগের আইনি ক্ষমতা নেই। রাস্তায় ট্রাফিকের কোনো সমস্যা হলে তা ট্রাফিক পুলিশের দেখার কথা। কিন্তু এখানে পৌর পুলিশ সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে গরিব বিক্রেতাদের তাড়া করছে এবং সাধারণ মানুষের ওপর শারীরিক নির্যাতন চালাচ্ছে।

নেপালের সংবিধান অনুযায়ী গঠিত ‘কাঠমান্ডু মিউনিসিপ্যাল পুলিশ অ্যাক্ট ২০২৩’ মতে, এই বাহিনীর মূল কাজ সরকারি পার্ক রক্ষা, পরিচ্ছন্নতা তদারকি এবং উৎসবের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা করা। নেপাল পুলিশের প্রাক্তন ডেপুটি ইন্সপেক্টর জেনারেল পূর্ণচন্দ্র জোশী জানান, যে কোনো বড় ধরনের আইন-শৃঙ্খলা জনিত সমস্যায় তারা মূল নেপাল পুলিশকে ডাকতে বাধ্য, নিজেরা কোনো পদক্ষেপ নিতে পারে না।

তবে আইনের তোয়াক্কা না করে দিনমজুরদের ওপর পুলিশি নির্যাতনের বেশ কিছু ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। বালেন শাহ সরকারের এই আগ্রাসী ও দরিদ্রবিরোধী শাসন ব্যবস্থা এখন নেপালের অন্যান্য শহরেও মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়ছে বলে দাবি করেছেন আন্দোলনকারীরা।