তীব্র দাবদাহে ফ্রান্সে দুই শিশুসহ ১৮ জনের মৃত্যু

ইউরোপজুড়ে তীব্র দাবদাহ বয়ে যাচ্ছে। সোমবার (২২ জুন) কয়েকটি শহরে তাপমাত্রার পূর্বের সব রেকর্ড ভেঙে গেছে। তীব্র এই গরমের কারণে ফ্রান্সে অন্তত ১৮ জনের মৃত্যু হয়েছে, যার মধ্যে দুই শিশুও রয়েছে। দাবদাহের কারণে ফ্রান্সের বহু স্কুল বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে অথবা ক্লাসের সময়সূচি পরিবর্তন করা হয়েছে।
ফ্রান্সের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় কার্পেনত্রাস শহরের এক সরকারি কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বাড়ির সামনে পার্ক করা নিজেদের গাড়ির ভেতর থেকে ২ ও ৪ বছর বয়সি দুটি শিশুকে অচেতন অবস্থায় উদ্ধার করেন তাদের মা। প্রথম উদ্ধারকারীরা চেষ্টা করেও তাদের জ্ঞান ফেরাতে পারেননি। এ ছাড়া বোর্দো অঞ্চলে গরমজনিত স্বাস্থ্য সমস্যায় ৮০ থেকে ৯৫ বছর বয়সি তিন প্রবীণ নাগরিকের মৃত্যু হয়েছে।
ফ্রান্সে তীব্র গরমে স্বস্তি পেতে নদী বা জলাশয়ে নামার পর গত দুই দিনে পানিতে ডুবে ১৩ জন মারা গেছেন। ফ্রান্সের সিভিল সেফটি সার্ভিসের মুখপাত্র জেরোম বোলাঞ্জার নাগরিকদের কেবল নজরদারি বা লাইফগার্ড আছে এমন স্থানেই সাঁতার কাটার আহ্বান জানিয়েছেন।
গত বছর দাবদাহের সময় ফ্রান্সে পানিতে ডুবে মৃত্যুর হার ১৭২ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছিল।
ফ্রান্সের বোর্দোতে তাপমাত্রা ৪১.৯ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছায়, যা গত আগস্টের রেকর্ডকে ছাড়িয়ে গেছে। মধ্য ফ্রান্সের পোয়াতিয়ে শহরে তাপমাত্রা ৪১.২ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছায়, যা ১৯৪৭ সালের পর সর্বোচ্চ। অন্যদিকে, স্পেনের তুলনামূলক শীতল উত্তরাঞ্চলীয় শহর সান সেবাস্তিয়ানের তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছানোর পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে, যা এই শহরের জুনের গড় তাপমাত্রার দ্বিগুণেরও বেশি।
বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার এপ্রিলের রিপোর্ট অনুযায়ী, ইউরোপ বৈশ্বিক গড়ের চেয়ে দ্বিগুণ গতিতে উত্তপ্ত হচ্ছে।
যুক্তরাজ্যের জাতীয় আবহাওয়া দপ্তর মেট অফিস জানিয়েছে, চার দিনের এই দাবদাহে দেশের কিছু অংশে তাপমাত্রা ৩৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে যেতে পারে। এটি হলে ১৯৫৭ ও ১৯৭৬ সালের জুনের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৩৫.৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসের রেকর্ড সহজেই ভেঙে যাবে। মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগেই যুক্তরাজ্য মে মাসের সর্বোচ্চ তাপমাত্রার রেকর্ড ভেঙেছিল।
তীব্র গরমের কারণে সোমবার ইতালির ১২টি শহরে রেড অ্যালার্ট জারি করা হয়েছে। দেশটির তুরিন শহরে অতিরিক্ত গরমের কারণে বিদ্যুৎ গ্রিডের ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি হওয়ায় বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যুৎ বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে বিদ্যুৎ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান আইরেন কর্মীদের শিফট দ্বিগুণ করেছে এবং অতিরিক্ত জেনারেটর যুক্ত করছে।
ওমেগা ব্লক
লন্ডনের ইম্পেরিয়াল কলেজের চরম আবহাওয়া ও জলবায়ু গবেষক ক্লেয়ার বার্নস জানান, ইউরোপের এই দাবদাহের পেছনে রয়েছে ‘ওমেগা ব্লক’ নামক একটি আবহাওয়া পরিস্থিতি। গ্রিক অক্ষর ওমেগার (Ω) মতো দেখতে এই বায়ুপ্রবাহের মাঝখানে গরম বাতাস আটকে থাকে এবং দুই পাশে শীতল বাতাস থাকে।
এটি সাহারা মরুভূমি তথা উত্তর আফ্রিকা থেকে গরম বাতাস টেনে আনছে। এই বায়ুপ্রবাহ অত্যন্ত ধীরগতির হওয়ায় এবং বাতাস বা মৃদু হাওয়া না থাকায় মানুষ কোনো স্বস্তি পাচ্ছে না। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণেই এই ধরনের দাবদাহ ও ঝড় আরও তীব্র এবং দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে।
আক্রান্ত বন্যপ্রাণীও
তীব্র গরমে কেবল মানুষই নয়, বন্যপ্রাণীরাও চরম সংকটে পড়েছে। বেলজিয়ামের একটি বন্যপ্রাণী পুনর্বাসন কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা রোমেন দে জেগেরে জানান, ঘরের চালের নিচে বা কার্নিশে বাসা বাঁধা সোয়ালো, চড়ুই ও শালিকের মতো পাখিরা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। চালের ওপর তাপমাত্রা ৫০ থেকে ৬০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছানোয় পাখিরা আক্ষরিক অর্থেই বাসার ভেতর সেদ্ধ হয়ে মারা যাওয়ার চেয়ে নিচে লাফিয়ে পড়া বেছে নিচ্ছে। গত তিন দিনে তাদের আশ্রয়কেন্দ্রে এই ধরনের ১৫০টি পাখি ও প্রাণী আনা হয়েছে।






