প্রবাসীদের টাকা দিচ্ছে না জীবন বীমা করপোরেশন

চার মাসেরও বেশি সময় ধরে জীবন বীমা করপোরেশনে (জেবিসি) আটকে আছে ৩ হাজার ১৪৬ প্রবাসী কর্মীর ১০৪ কোটি ৪৯ লাখ টাকা। এর মধ্যে বিদেশে মারা যাওয়া ৯৩১ প্রবাসীর পরিবারও রয়েছে। এখনও নিজেদের পাওনা ৯৩ কোটি ১০ লাখ টাকা বুঝে পায়নি তারা। ওয়েজ আনার্স কল্যাণ বোর্ড প্রবাসীদের বীমা কাগজপত্র যাচাইবাছাই করে বীমা করপোরেশনের কাছে পাঠালেও দীর্ঘদিনেও বীমা কর্তৃপক্ষের কাছে সে টাকা পাচ্ছে না ভুক্তভোগীরা।
ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড ও জেবিসির অভ্যন্তরীণ নথি এবং সাম্প্রতিক সভার কার্যবিবরণীতে উঠে এসেছে এমন তথ্য।
চুক্তি অনুযায়ী, কোনো প্রবাসী কর্মী বিদেশে মারা গেলে বা স্থায়ী পঙ্গুত্ব বরণ করলে দ্রুততম সময়ে বীমার টাকা পরিশোধের আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে। তবে বাস্তবে দিনের পর দিন সরকারি দপ্তরে ঘুরেও টাকা পাচ্ছে না হাজারো পরিবার।
২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত ২ হাজার ২১০ জন কর্মী চাকরি হারিয়ে বা অসুস্থ হয়ে দেশে ফিরেছেন। তাদের বীমা দাবি বাবদ বকেয়া ১১ কোটি ৩ লাখ টাকা। এ ছাড়া অন্য পাঁচজন প্রবাসীর বিশেষ বীমা দাবিতে বকেয়া রয়েছে ৩৫ লাখ টাকা।
২০১৮ সালের কল্যাণ বোর্ড আইনের অধীনে প্রবাসীদের জন্য বাধ্যতামূলক বীমা চালু হয়। ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে জেবিসির সঙ্গে চুক্তি সই হয়। সবশেষ ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে এটি নবায়ন করা হয়।
পাঁচ বছর মেয়াদি পলিসির জন্য এক হাজার টাকা করে প্রিমিয়াম দিতে হয়। কর্মী মারা গেলে তার পরিবার সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা পায়। আর চাকরি হারিয়ে বা পঙ্গু হয়ে ফিরলে মেলে নির্দিষ্ট আর্থিক সুবিধা।
বীমা চালুর পর থেকে এ পর্যন্ত ৫৭ লাখ ৭৩ হাজার ৬২ জন এর আওতায় এসেছেন। এর বিপরীতে কল্যাণ বোর্ড জেবিসিকে প্রিমিয়াম বাবদ মোট ৪৮৮ কোটি ৫২ লাখ টাকা পরিশোধ করেছে।
কল্যাণ বোর্ডকে দুষছে জীবন বীমা করপোরেশন
জেবিসির অভ্যন্তরীণ হিসাব বলছে, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত ২ লাখ ২৮ হাজার ১০০ জন প্রবাসীর প্রিমিয়াম বাবদ ২২ কোটি ৮১ লাখ টাকা কল্যাণ বোর্ড এখনো জেবিসির তহবিলে জমা দেয়নি। আগের কিছু দাবি সমন্বয়ের পর জেবিসির মোট পাওনা দাঁড়িয়েছে ২২ কোটি ৩০ লাখ ৬৩ হাজার টাকা।
নথি অনুযায়ী, প্রবাসীদের কাছ থেকে আদায় করা মোট প্রিমিয়ামের মাত্র ৫৬ দশমিক ১১ শতাংশ বীমা দাবি হিসেবে ব্যয় হয়েছে। বাকি ৪৩ দশমিক ৮৯ শতাংশ থেকে গেছে উদ্বৃত্ত হিসেবে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে জীবন বীমা করপোরেশনের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, ‘কল্যাণ বোর্ড থেকে প্রবাসীদের প্রিমিয়ামের টাকা সময়মতো জমা না হলে আমাদের পক্ষে বিশাল অঙ্কের বীমা দাবি দ্রুত নিষ্পত্তি করা কঠিন হয়ে পড়ে। আমাদেরও নিজস্ব অডিট ও তহবিল ব্যবস্থাপনার নিয়ম মেনে চলতে হয়। কল্যাণ বোর্ড তাদের বকেয়া ২২ দশমিক ৩০ কোটি টাকা পরিশোধ করলে এই জটিলতার সমাধান সম্ভব।’
মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য
চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, দাবি জমা হওয়ার ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে যাচাই করে টাকা ছাড় করার কথা। তবে ওয়েজ আনার্স কল্যাণ বোর্ড প্রবাসীদের বীমা কাগজপত্র যাচাইবাছাই করে বীমা করপোরেশনের কাছে পাঠালেও দীর্ঘদিনেও বীমা কর্তৃপক্ষের কাছে সে টাকা পাচ্ছে না ভুক্তভোগীরা।
কুমিল্লার লাকসামের বাসিন্দা মফিজুল ইসলাম (ছদ্মনাম)। ২০২৫ সালের নভেম্বরে তার ছেলে মালয়েশিয়ায় সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান।
মফিজুল ইসলাম বলেন, ‘ছেলের লাশ দেশে আনার পর ধারদেনা শোধ করতে বীমার টাকার জন্য কল্যাণ বোর্ড আর জীবন বীমার অফিসে কয়েকবার ঘুরেছি। কল্যাণ বোর্ড বলে তারা ফাইল পাঠিয়ে দিয়েছে। আর জীবন বীমা অফিস বলে ওপর থেকে অনুমোদন আসেনি। আমাদের মতো গরিব মানুষের টাকা এভাবে আটকে থাকলে আমরা কোথায় যাব?’
এমন পরিস্থিতির সুযোগে দৌরাত্ম্য বেড়েছে মধ্যস্বত্বভোগীদের। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের একাধিক কর্মকর্তা এশিয়া পোস্টের কাছে বিষয়টি স্বীকার করেছেন।
তারা জানান, প্রবাসী কর্মীদের পরিবারের সদস্যরা ১০ লাখ টাকার জন্য ছোটাছুটি করেন। মাঝখান থেকে একটা মধ্যস্বত্বভোগী বা দালালচক্র সেখানে ঢুকে পড়ে। তারা দ্রুত টাকা পাইয়ে দেওয়ার বদলে উল্টো নিজেরা ৫০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা পর্যন্ত হাতিয়ে নিচ্ছে। জেলা পর্যায়ে অনেক ক্ষেত্রে বোর্ডের কর্মীরাও এসবে জড়িয়ে পড়েন।
সমন্বয় সভায় নতুন সিদ্ধান্ত
সংকট নিরসনে গত ১ জুলাই আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের অতিরিক্ত সচিব ও জেবিসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. সাঈদুর কুতুবের সভাপতিত্বে উচ্চপর্যায়ের পর্যালোচনা সভা হয়। সভায় ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের মহাপরিচালক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘বীমা দাবি পরিশোধের দীর্ঘসূত্রতার কারণে প্রবাসী কর্মী ও তাদের পরিবারের অর্থবহ কল্যাণ নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। এতে সরকারের এই মহৎ উদ্যোগের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে।’
উদ্ভূত পরিস্থিতি সামাল দিতে সভায় বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বকেয়া ৩ হাজার ১৪৬টি দাবি ১৫ জুলাইয়ের মধ্যে যাচাই-বাছাই শেষে দ্রুত নিষ্পত্তি করতে জেবিসিকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি, দুই সংস্থার ডাটাবেজ লিংকেজ স্থাপন করা হবে যাতে কর্মী বিদেশ যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই বীমা তথ্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে আপডেট হয়ে যায়।
নিট লভ্যাংশ ও ১৫ শতাংশ সার্ভিস চার্জের হিসাব পুনঃপরীক্ষা করে চলতি মাসের মধ্যেই কল্যাণ বোর্ডের প্রাপ্য অংশ হস্তান্তর প্রক্রিয়া শুরু করা এবং প্রতি তিন মাস পর পর দুই সংস্থার ফিন্যান্সিয়াল উইং যৌথ সভার মাধ্যমে প্রিমিয়াম ও দাবির হিসাব মেলানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে সভায়।
চুক্তির নেপথ্যে
ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের একাধিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এশিয়া পোস্টকে জানান, শুরুতে বোর্ড নিজেই ‘মৃত প্রবাসী কর্মীর পরিবারের সুরক্ষা স্কিম’ নামে উদ্যোগ চালুর পরিকল্পনা করেছিল। তবে জীবন বীমা করপোরেশনের তৎকালীন চেয়ারম্যান নিজেকে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর বান্ধবী পরিচয় দিয়ে একপ্রকার চাপ তৈরি করে কাজটি নিয়ে যান।
তখন লাভজনক মনে করে এটি নিলেও বর্তমানে প্রবাসীদের বীমা দাবি মেটাতে গড়িমসি করছে প্রতিষ্ঠানটি। কর্মী মারা গেলে ১০ লাখ টাকা, ছয় মাসের মধ্যে ফেরত আসলে ৫০ হাজার টাকা এবং অঙ্গহানির বীমা দাবিগুলো দিতে দেরি করায় বিপুল পরিমাণ টাকা এখন বকেয়া পড়ে আছে। অথচ কল্যাণ বোর্ডের নিজস্ব আর্থিক অনুদানগুলো দুই মাসের মধ্যেই ভুক্তভোগীদের দেওয়ার চেষ্টা করা হয়।
ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের কর্মকর্তারা জানান, জেলা পর্যায়ে তদন্তের সমস্যার কারণে অনেক সময় বীমার টাকা পেতে দেরি হয়। বিশেষ করে পরিবারের তথ্য না মেলা বা ওয়ারিশদের দ্বন্দ্বের কারণে তদন্ত প্রতিবেদন আসতে দুই-তিন মাস লেগে যায়। তবে বোর্ডের নিজস্ব সেবাগুলো যথাসময়ে দেওয়া হলেও বীমার টাকা পেতে ছয় মাস থেকে এক বছর পর্যন্ত লেগে যায়। এতে বোর্ডের ভাবমূর্তি নষ্ট হচ্ছে।
নিয়ম অনুযায়ী কল্যাণ বোর্ডের ৩ লাখ টাকা পাওয়ার ১৫ দিনের মধ্যে বীমার টাকা পাওয়ার কথা থাকলেও তা মাসের পর মাস ঝুলে থাকছে। সংকট নিরসনে দুই সংস্থার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মধ্যে বৈঠক হলেও জেবিসির দেওয়া পরিসংখ্যানে সন্তুষ্ট হতে পারেনি কল্যাণ বোর্ড। সরকারি প্রতিষ্ঠান হিসেবে চুক্তির শর্ত অনুযায়ী মৃত প্রবাসীর পরিবারকে দ্রুত ১০ লাখ টাকা দেওয়ার তাগিদ দিয়েছে তারা। কারণ টাকা পেতে বিলম্ব হওয়ায় একদিকে যেমন অসহায় পরিবারগুলো জেলা অফিসে অনবরত যোগাযোগ করছে, অন্যদিকে এই সুযোগে একটি দালালচক্র সক্রিয় হয়ে ওঠে। প্রবাসীদের পরিবারগুলো টাকার জন্য ছোটাছুটি করার সুযোগে দালালরা দ্রুত টাকা পাইয়ে দেওয়ার নাম করে ৫০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা পর্যন্ত হাতিয়ে নিচ্ছে।
প্রিমিয়াম বাড়ানোর চেষ্টা জীবন বীমার
নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘চুক্তির শুরুতে জীবন বীমা করপোরেশন বেশ লাভজনক অবস্থায় ছিল। তবে এখন প্রবাসীদের বীমা দাবির পরিমাণ ১০ লাখ টাকা করা হয়েছে। পাশাপাশি মৃত্যুর হারও বেড়েছে। এতে আগের মতো লাভ করতে পারছে না জেবিসি। এ জন্য তারা প্রিমিয়াম বাড়ানোর ফন্দি আঁটছে এবং টাকা দিতে গড়িমসি করছে। তবে প্রিমিয়াম বাড়ানোর কোনো পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের নেই। এতে প্রবাসীদের অভিবাসন ব্যয় আরও বেড়ে যাবে।’
এই কর্মকর্তা জানান, বর্তমান সরকার প্রবাসীদের সুযোগ-সুবিধা বাড়াতে কাজ করছে। তাই যে কোনো মূল্যে ১০ লাখ টাকার এই বীমা সুবিধা চালু রাখা হবে। জীবন বীমা করপোরেশন যদি এই পলিসি চালাতে না পারে, সে ক্ষেত্রে মন্ত্রণালয় নিজস্ব উদ্যোগে ‘সুরক্ষা স্কিম’ চালু করে এই সুবিধা অব্যাহত রাখার চিন্তাভাবনা করছে।
দুই প্রতিষ্ঠানের বক্তব্য
প্রবাসীদের বীমার টাকার বিষয়ে ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের মহাপরিচালক মো. আসাদুজ্জামান এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘বীমার একটি নির্দিষ্ট মেয়াদ থাকে। বীমা করলেই যে টাকা পাওয়া যাবে, তা নয়। মেয়াদের মধ্যে কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে এবং তার বিপরীতে দাবি (ক্লেইম) করা হলে তবেই টাকা মিলবে। মেয়াদ শেষ হয়ে গেলে আর কিছু পাওয়া যায় না, এটাই বীমা কোম্পানির ব্যবসা।’
জেবিসির কাছ থেকে পাওনা আদায়ের পরিকল্পনার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এই সংকট নিয়ে আমরা একসঙ্গে বসেছিলাম। ওনারা ওনাদের মতো করে চেষ্টা করছেন। আমাদের নিজস্ব বোর্ড ও কর্তৃপক্ষ আছে, বিষয়টি আমরা দেখব। তবে তারা আমাদের টাকা দেবে। আমরা আমাদের বকেয়া টাকার অন্তত ৫০ শতাংশ দ্রুত চেয়েছি। আশা করি, সেটি তারা দেবে। এই টাকা পাওয়া গেলে আমরা জরুরি বীমা দাবিগুলো দ্রুত মিটিয়ে ফেলতে পারব।’
জেবিসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. সাঈদুর কুতুব এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘বীমার প্রিমিয়াম থেকে যে আয় হচ্ছে, তার তুলনায় প্রায় তিন গুণ বেশি টাকা বীমা দাবি হিসেবে পরিশোধ করতে হচ্ছে। এর ফলে চলতি চুক্তির মেয়াদ শেষে বিপুল পরিমাণ ঘাটতি তৈরি হবে।
চুক্তি অনুযায়ী, এই ঘাটতির ৫০ শতাংশ করে উভয় প্রতিষ্ঠানকে বহন করতে হবে। এতে দুই সংস্থাই বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়বে। তাই এটি পুনঃমূল্যায়ন করে নতুন করে চুক্তি সম্পাদন করা জরুরি।’




