মাসুদ সাঈদীর ইস্তানবুল হোটেলে বিনিয়োগকারীদের ১৭৫ কোটি টাকা গেল কোথায়

‘আমাদের গল্পের শুরু এক সাগরকন্যাকে ঘিরে…’ এমন মোহনীয় সংলাপ শুনিয়ে ক্রেতা ও বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করে ‘ইস্তানবুল হোটেল অ্যান্ড রিসোর্ট লিমিটেড’। সাগরকন্যা কুয়াকাটায় নির্মাণ হচ্ছে বিলাসবহুল এই পাঁচ তারকা হোটেল। প্রকল্প পরিকল্পনা অনুযায়ী সাগরপাড়ের ৩০ বিঘা জমিতে নির্মাণ হবে ১৭ তলা দুটি ভবন— একটির নাম হবে ‘সানরাইজ’, অন্যটির ‘সানসেট’। এর চারপাশ ঘিরে থাকবে একাধিক কটেজ ও ভিলা। সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে সংগৃহীত অর্থে নির্মাণ হবে হোটেলটি। বিনিয়োগকারীরা হোটেল নির্মাণ শেষ হওয়ার পর মালিকানা এবং মুনাফা তো পাবেনই, সঙ্গে থাকছে আরও নানা সুবিধা। পাঁচ তারকা এই হোটেলে বছরে তিন দিন ও দুই রাত বিনামূল্যে থাকতেও পারবেন প্রত্যেক বিনিয়োগকারী। এসব প্রতিশ্রুতির পাশাপাশি বিনিয়োগকারীদের ভরসা অর্জনের জন্য আরও প্রতিশ্রুতি দিয়েছে ইস্তানবুল হোটেল কর্তৃপক্ষ।
সেই প্রতিশ্রুতিতে বিশ্বাস রেখে এ প্রকল্পে বড় অঙ্কের টাকা বিনিয়োগ করেছেন অন্তত ১০ হাজার সাধারণ বিনিয়োগকারী। সর্বনিম্ন বিনিয়োগ তিন লাখ টাকা হিসেবে এ পর্যন্ত তারা ৩০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ সংগ্রহ করেছেন। তবে প্রকল্প এলাকা সরেজমিন পরিদর্শন করে দেখা গেছে, এখনও উল্লেখযোগ্য কোনো কাজ শুরুই হয়নি। এমনকি প্রকল্পের জমিতে বাউন্ডারি দেয়াল নির্মাণের কাজও সম্পন্ন হয়নি এখনও। বিষয়টি নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে সন্দেহ সৃষ্টি হয়েছে।
সেই সূত্র ধরে আলোচিত এ হোটেল প্রকল্প নিয়ে অনুসন্ধান শুরু করে এশিয়া পোস্ট। বিস্তারিত অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে লম্বা ফিরিস্তি। বিনিয়োগকারী আকৃষ্ট করতে রাজনৈতিক দল ও ব্যক্তির নাম ব্যবহারের প্রমাণ যেমন মিলেছে, তেমনি ইস্তানবুল হোটেল প্রকল্পের আর্থিক হিসাব-নিকাশেও বেরিয়ে এসেছে বড় গরমিল। প্রতিষ্ঠানটির বিক্রয়কর্মীরা, প্রায় ৩০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ পেয়েছেন দাবি করলেও গত ৯ মাসে ব্যাংকিং চ্যানেলে বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে সর্বমোট ১৯০ কোটি টাকা সংগ্রহের প্রমাণ পেয়েছে এশিয়া পোস্ট। বাকি টাকা কোথায় কার কাছ থেকে কী প্রক্রিয়ায় সংগ্রহ করা হয়েছে, সে বিষয়ে কোনো সদুত্তর পাওয়া যায়নি। ব্যাংকিং চ্যানেলে সংগ্রহ করা ১৯০ কোটি টাকার মধ্যে ১৭৫ কোটি টাকা অর্থাৎ এই বিনিয়োগের প্রায় ৯২ শতাংশেরও বেশি টাকা তুলে ফেলা হয়েছে।
কোম্পানির মালিক কারা
‘ইস্তানবুল হোটেল অ্যান্ড রিসোর্ট লিমিটেডের’ কোম্পানি রেজিস্ট্রেশনের তথ্য অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান পিরোজপুর-১ আসনের (পিরোজপুর সদর, নাজিরপুর ও ইন্দুরকানী) সংসদ সদস্য মাসুদ সাঈদী। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী মনোনীত প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। এর আগে তিনি ইন্দুরকানী উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ছিলেন।

২০ হাজার শেয়ারের এ কোম্পানির মালিকানায় আছেন আরও তিনজন। তারা হলেন ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডিএম এমদাদুল হক এবং পরিচালক মো. আবু তৈয়ব ও হাফিজুর রহমান। মালিকানায় থাকা এই চারজনের প্রত্যেকের নামে ৫ হাজার করে শেয়ার রয়েছে। অর্থাৎ তারা একেকজন কোম্পানির ২৫ শতাংশের মালিক।
কোন ব্যাংকে কত লেনদেন
এশিয়া পোস্টের অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য বলছে, বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহের জন্য অন্তত আটটি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট পরিচালনা করে ‘ইস্তানবুল হোটেল অ্যান্ড রিসোর্ট লিমিটেড’। এর মধ্যে ইসলামী ব্যাংক, আল আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক, ব্যাংক এশিয়া ও শাহজালাল ইসলামী ব্যাংকে একটি করে মোট চারটি এবং সিটি ব্যাংক ও প্রিমিয়ার ব্যাংকে দুটি করে আরও চারটি অ্যাকাউন্ট রয়েছে। পাশাপাশি বিকাশ ও নগদের মতো মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমেও বিনিয়োগ সংগ্রহ করা হয়। এ ছাড়া নগদ টাকায় বিনিয়োগ করার সুযোগ রয়েছে। এশিয়া পোস্টের অনুসন্ধানে ইস্তানবুলের আটটি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকে সাতটির তথ্য মিলেছে। সেখানে দেখা যাচ্ছে, গত সপ্তাহ পর্যন্ত ইস্তানবুলের সাতটি ব্যাংক হিসাবে জমা হয়েছে মোট ১৯০ কোটি টাকা। তবে সর্বশেষ স্থিতি (ব্যালেন্স) রয়েছে মাত্র ১৫ কোটি টাকা। অর্থাৎ বাকি ১৭৫ কোটি টাকা এরই মধ্যে তুলে ফেলা হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে ইস্তানবুল হোটেল ও রিসোর্টের আট অ্যাকাউন্টের মধ্যে সাতটির বিস্তারিত তথ্য যাচাই করেছে এশিয়া পোস্ট। সেখানে দেখা গেছে, সবচেয়ে বেশি টাকা জমা হয়েছে ইসলামী ব্যাংকের বনানী শাখার অ্যাকাউন্টে (অ্যাকাউন্ট নম্বরের শেষ সংখ্যা ১৮)। জমার পরিমাণ ৮২ কোটি ৩৬ লাখ টাকা। এই অ্যাকাউন্ট থেকে তুলে ফেলা হয়েছে ৭৫ কোটি ৭৮ লাখ ৫৩ হাজার টাকা। বর্তমানে রয়েছে ৬ কোটি ৫৭ লাখ টাকা। আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকের গুলশান লিংক রোড শাখায় (অ্যাকাউন্ট নম্বরের শেষ সংখ্যা ৮৮) জমা হওয়া ১২ কোটি ৪৮ লাখ টাকার মধ্যে ১১ কোটি ৪৫ লাখ তুলে ফেলা পর এখন জমা রয়েছে ১ কোটি তিন লাখ টাকা। প্রিমিয়ার ব্যাংকের বংশাল শাখায় (অ্যাকাউন্ট নম্বরের শেষ সংখ্যা ৭৪) জমা হয়েছে ২৩ কোটি টাকা, তুলে নেওয়া হয়েছে ২২ কোটি ৫২ লাখ, জমা আছে ৪৮ লাখ টাকা। প্রিমিয়ার ব্যাংকের মহাখালী শাখায় (অ্যাকাউন্ট নম্বরের শেষ সংখ্যা ৩১) জমা পড়েছে ৩২ কোটি টাকা। ৩১ কোটি ২০ লাখ তুলে নেওয়ার পর এখন রয়েছে ৮০ লাখ টাকা। ব্যাংক এশিয়ার বনানী-১১ শাখায় (অ্যাকাউন্ট নম্বরের শেষ সংখ্যা ০৪) ২৩ কোটি ৮৩ লাখ জমা হওয়ার পর তুলে নেওয়া হয় ২৩ কোটি ৮২ লাখ। রয়েছে এক লাখ ৬৯ হাজার ৪১০ টাকা।

এ ছাড়া সিটি ব্যাংক বনানী শাখায় (অ্যাকাউন্ট নম্বরের শেষ সংখ্যা ৬৪) জমা হয় চার কোটি দুই লাখ টাকা। এখান থেকে কোনো টাকা তোলা হয়নি। অন্যদিকে সিটি ব্যাংক মতিঝিল শাখায় (অ্যাকাউন্ট নম্বরের শেষ সংখ্যা ৪১) জমা হয় ১৩ কোটি তিন লাখ টাকা। তুলে নেওয়া হয়েছে ৯ কোটি ৯২ লাখ। বর্তমানে রয়েছে তিন কোটি ১১ লাখ টাকা। এ ছাড়া শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক বনানী শাখায় একটি অ্যাকাউন্ট (অ্যাকাউন্ট নম্বরের শেষ সংখ্যা ১৪) রয়েছে ইস্তানবুল হোটেল রিসোর্টের নামে।
কোন শেয়ারের কত দাম, বিক্রি কত টাকায়
ইস্তানবুল হোটেল অ্যান্ড রিসোর্ট প্রকল্পে বিনিয়োগ সংগহ করা হচ্ছে পাঁচটি পৃথক প্যাকেজে। সাধারণ প্যাকেজে একটি শেয়ার, ব্রোঞ্জে তিনটি, সিলভারে পাঁচটি, গোল্ডে ১০টি এবং প্লাটিনাম প্যাকেজে ২০টি শেয়ার পাবেন বিনিয়োগকারী। এভাবে মালিকানা শেয়ার মোট ২৬ হাজার প্যাকেজ তৈরি করা হয়েছে। এর মধ্যে ১০ হাজার প্যাকেজ কোম্পানি নিজে রেখে বাকি ১৬ হাজার প্যাকেজ বিক্রির জন্য বাজারে বিনিয়োগকারী খোঁজা হচ্ছে। ইতিমধ্যে ১০ হাজার প্যাকেজ বিক্রি হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন কোম্পানির সংশ্লিষ্টরা। এই ২৬ হাজার প্যাকেজে মোট শেয়ারের পরিমাণ ৪৩ হাজার ৬০০টি। প্রতিটি শেয়ারের বিপরীতে ক্রেতাকে ২৫ বর্গফুট জমি ও স্থাপনার অংশীদারত্ব দেওয়ার কথা বলছে ইস্তানবুল।
চলতি মে মাসের সর্বশেষ তথ্য অনুসারে, প্রতি শেয়ারের মূল্য কিস্তিতে চার লাখ টাকা হলেও এককালীন পরিশোধে ৪০ হাজার টাকা ছাড় দিয়ে নেওয়া হচ্ছে তিন লাখ ৬০ হাজার টাকা। বুকিং ২৫ হাজার এবং ডাউন পেমেন্ট আরও ২৫ হাজার, মোট ৫০ হাজার টাকায় বিক্রি করে মালিকানার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে ইস্তানবুল কর্তৃপক্ষ।

ইস্তানবুল হোটেল অ্যান্ড রিসোর্ট লিমিটেডের পরিচালক কাজী মিজানুর রহমান জানান, ‘এরই মধ্যে ২২ হাজার শেয়ার বিক্রি হয়েছে।’ প্রতি শেয়ারের দাম গড়ে তিন লাখ টাকা ধরলেও ২২ হাজার শেয়ারের বিপরীতে তাদের সংগৃহীত বিনিয়োগের পরিমাণ দাঁড়ায় ৬৬০ কোটি টাকা।
অবশ্য ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডিএম এমদাদুল হকের তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত ১০ হাজার ব্যক্তি তাদের প্যাকেজ কিনেছেন। অর্থাৎ প্যাকেজ বিক্রি হয়েছে ১০ হাজারটি। এর মধ্যে প্রত্যেকে সর্বনিম্ন একটি শেয়ার নিলে এবং সর্বনিম্ন মূল্য ৩ লাখ করে হলেও এখন পর্যন্ত তাদের বিক্রির পরিমাণ দাঁড়ায় ৩০০ কোটি টাকা।
আইন না মেনেই শেয়ার বিক্রি, বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন
দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী, কোনো কোম্পানি যদি জনসাধারণের কাছে শেয়ার বা বিনিয়োগের প্রস্তাব দেয়, তবে তাকে বাংলাদেশে প্রকাশ্যে শেয়ার বিক্রির নিয়ন্ত্রক সংস্থা ‘বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন’ (বিএসইসি) থেকে অনুমোদন নিতে হয়। আইনে এমন বাধ্যবাধকতা থাকলেও ইস্তানবুল হোটেল প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা বিএসইসির কোনো অনুমোদনপত্র দেখাতে পারেনি। তাছাড়া প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানি পাবলিকলি শেয়ার বিক্রি করাও বেআইনি।
এ বিষয়ে কোম্পানি আইন বিশেষজ্ঞ অ্যাডভোকেট ড. এসএ অপু এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘বাংলাদেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী কোনো কোম্পানি যদি জনসাধারণের কাছে শেয়ার বা বিনিয়োগের প্রস্তাব দেয়, তবে তাকে নির্দিষ্ট কিছু নিয়ম মেনে চলতে হয়। প্রকাশ্যে শেয়ার বিক্রির জন্য নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন কিছু নিয়ম নির্ধারণ করে দিয়েছে। এ ছাড়া যৌথ মূলধন কোম্পানি ও ফার্মসমূহের পরিদপ্তরের (আরজেএসসি) নিয়ম অনুযায়ী কোনো প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানি চাইলেই যত্রতত্র সাধারণ মানুষের কাছে শেয়ার বিক্রি করতে পারে না। জনসাধারণের কাছে শেয়ার বিক্রির জন্য ওই কোম্পানিকে অবশ্যই পাবলিক লিমিটেড কোম্পানি হিসেবে নিবন্ধিত হতে হবে।’
নথিপত্র বিশ্লেষণ করে এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ‘ইস্তানবুল হোটেল অ্যান্ড রিসোর্ট লিমিটেড’ কোনো পাবলিক লিমিটেড কোম্পানি নয়।
বিশ্বাসে ভর করে সিংহভাগ বিনিয়োগ
‘ইস্তানবুল হোটেল অ্যান্ড রিসোর্ট লিমিটেড’-এ কীভাবে বিনিয়োগ হচ্ছে তা জানতে ক্রেতা পরিচয়ে প্রতিষ্ঠানটির অন্তত পাঁচ বিক্রয় কর্মীর সঙ্গে কথা বলেন এশিয়া পোস্টের প্রতিবেদক। রাজধানীতে কর্মরত এই বিক্রয়কর্মীরা অবলীলায় স্বীকার করেছেন, বেশিরভাগ মানুষ কাগজপত্র নয়, বিশ্বাসের ওপর ভর করেই বিনিয়োগ করছেন!
বিক্রয় কর্মীর কাছে প্রকল্পের জন্য কেনা জমির কাগজ ও অন্যান্য অনুমোদনের প্রমাণাদি দেখতে চাইলে কুয়াকাটা পৌরসভা থেকে ভবন নির্মাণের অবস্থানগত একটি অনুমতিপত্র ছাড়া আর কিছুই দেখাতে পারেনি। আলাপচারিতায় পাঁচ বিক্রয় প্রতিনিধি জানান, তারা নিজেরাও কোনোদিন জমি পরিদর্শনে কুয়াকাটা যাননি।
বিক্রয় প্রতিনিধি হিসেবে এশিয়া পোস্ট প্রতিবেদকের সঙ্গে আলাপকারী পাঁচজনের মধ্যে একজন ইস্তানবুল হোটেল অ্যান্ড রিসোর্টের অ্যাসিস্ট্যান্ট জেনারেল ম্যানেজার মিজানুর রহমান তুহিন। তিনি বলেন, ‘যারা বিনিয়োগ করছেন তারা কেউই পূর্ণাঙ্গ দলিলাদি কিংবা এসব অনুমোদন দেখতে চায় না। শুধু বিশ্বাসের ওপর ভর করে প্রয়াত দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ছেলে সংসদ সদস্য মাসুদ সাঈদীর বক্তব্য শুনে বিনিয়োগ করছেন। ’
জমির দলিল দেখতে চাইলে ক্রেতা পরিচয়ধারী এশিয়া পোস্টের প্রতিবেদককে তুহিন বলেন, ‘আপনি ক্রিটিক্যাল মানুষের সঙ্গে থাকতে থাকতে নিজেকে ক্রিটিক্যাল বানিয়ে ফেলেছেন, তাই জমির দলিল দেখতে চাচ্ছেন। আপনি যদি শেয়ার কিনতেই চাইতেন তাহলে অবশ্যই আমাদের কাজের ভিডিও দেখে বিশ্বাস করতেন।’
কোম্পানির প্রচারপত্রে মাওলানা সাঈদী ও জামায়াত
ইস্তানবুল হোটেল অ্যান্ড রিসোর্ট লিমিটেডের শেয়ার বিক্রির জন্য তৈরিকৃত প্রচারপত্রে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও দলটির প্রয়াত নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর নাম ব্যবহার করা হয়েছে। প্রচারপত্রে মাসুদ সাঈদীর ছবি ছেপে তাকে প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। মাসুদ সাঈদীর অন্যান্য পরিচয় হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে তিনি দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ছেলে এবং জামায়াত ইসলামীর পিরোজপুর-১ আসনে জামায়াতের সংসদ সদস্য।

প্রচারপত্রের পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটির শেয়ার বিক্রয়ের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরাও ‘ইস্তানবুল হোটেল অ্যান্ড রিসোর্ট লিমিটেডকে’ জামায়াতে ইসলামীর প্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রচার করেন। এ বিষয়ে এশিয়া পোস্টের সঙ্গে কথা হয় প্রতিষ্ঠানটির সেলস ও মার্কেটিং ম্যানেজার মো. রাকিবুল ইসলামের সঙ্গে। তিনিও টেলিফোনে বলেন, ‘এটি জামায়াতে ইসলামীর প্রতিষ্ঠান। মাসুদ সাঈদী জামায়াতের এমপি।’
প্রকল্পের সঙ্গে জামায়াতের সম্পর্ক কী
তবে এই প্রকল্পের সঙ্গে জামায়াত ইসলামীর কোনো সম্পর্ক নেই বলে জানিয়েছেন ইস্তানবুল হোটেল অ্যান্ড রিসোর্ট লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডিএম এনামুল হক। এশিয়া পোস্টকে তিনি বলেন, ‘আমরা কোথাও কোনো প্রোগ্রামে জামায়াতে ইসলামীর কোনো মেহমানকে আমন্ত্রণ জানাই না। হ্যাঁ, মাসুদ সাঈদী জামায়াতে ইসলামী করেন। তিনি জামায়াতে ইসলামী থেকে এমপি নির্বাচিত হয়েছেন। তার বাবা জামায়াতে ইসলামীর নেতা ও প্রখ্যাত আলেম ছিলেন। এগুলো তো গোপন করার কিছু নেই। মাসুদ সাঈদী কে, তা সারা পৃথিবী জানে।’
এ বিষয়ে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর অ্যাসিস্টেন্ট সেক্রেটারি জেনারেল এবং কেন্দ্রীয় প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের প্রধান এহসানুল মাহবুব জুবায়ের এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘শুধু ইস্তানবুল হোটেল নয়, কোনো ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর কোনো সম্পর্ক নেই। জামায়াতে ইসলামী একটি ইসলামিক ধারার রাজনৈতিক দল। আমাদের কোনো পর্যায়ে সাংগঠনিকভাবে বা দলীয়ভাবে কোনো ব্যবসা, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বা ব্যবসায়িক কোনো গ্রুপের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক নেই।’
তিনি আরও বলেন, ‘জামায়াত করে এমন লোক হয়তো ব্যবসা করেন, চাকরি করেন; যা অন্যান্য দলেও আছে। যারা ব্যবসা করবেন তারা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বা কোম্পানির নিয়ম মেনে করবেন। যিনি এই ব্যবসায় জড়িত হবেন তিনি এগুলো মেনে বা শর্তসমূহ তার যদি পছন্দ হয় তবে তিনি এগুলোতে যাবেন। এ ব্যবসায় জড়িত হওয়ার ক্ষেত্রেও স্বাধীন।’
প্রতিষ্ঠানটির প্রচারপত্রে মাসুদ সাঈদীর পরিচয়ে জামায়াতে ইসলামীর এমপি উল্লেখ করা হয়েছে এবং বিক্রয় প্রতিনিধিরা বিশ্বস্ততা অর্জনের জন্য এটি জামায়াতের লোকজন দ্বারা পরিচালিত বলে প্রচার করেন, এ তথ্যও জানানো হয় এহসানুল মাহবুব জুবায়েরকে। এ বিষয়ে দলগতভাবে জামায়াতে ইসলামীর অবস্থান জানতে চাইলে জুবায়ের এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘এমন যদি কিছু করে থাকে তাহলে তাদের বোর্ড অব ডিরেক্টরস আছে বা শেয়ারহোল্ডারদের নিয়ে যে মিটিং হয় সেখানে তারা তা আলোচনা করবেন। কেউ ব্যবসা করলে সেই দায়িত্ব তার, দল হিসেবে জামায়াত কারও ব্যবসার দায়িত্ব নেয় না। বরং আমাদের পক্ষ থেকে বাংলাদেশের নিয়ম অনুযায়ী ব্যবসা করার পরামর্শ থাকে।’
বিনিয়োগকারীরা যা বলছেন
ঢাকার বাসিন্দা আলমগীর হোসেন প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান মাসুদ সাঈদীকে বিশ্বাস করে তিনটি শেয়ার কিনেছেন। তিনি বলেন, ‘আমি শেয়ার কেনার পর একসঙ্গে ৬০০ বিনিয়োগকারীকে প্রজেক্ট দেখাতে কুয়াকাটায় নিয়ে যায়। তখন সেখানে আমাদের নিয়ে সাইনবোর্ড তুলে বাউন্ডারির কাজ শুরু করে। প্রতিষ্ঠানের খরচে অন্য হোটেলে আমাদের তিন দিন, দুই রাত রাখে। বিশ্বাস করে শেয়ার কিনেছি, দেখি শেষ পর্যন্ত কী হয়। আশা করি তারা বিশ্বাস ভঙ্গ করবে না।’
শেয়ারহোল্ডার হিসেবে কোম্পানির বা প্রোজেক্টের কোনো সিদ্ধান্ত নিতে তাকে ডাকা হয়েছে কি না, জানতে চাইলে আলমগীর বলেন, ‘না, কখনও না। শেয়ার বিক্রির পর এমন কোনো বিষয়ে তারা আমাকে দাওয়াত করেনি, পরামর্শও চায়নি। ছোট অংশ হলেও কোম্পানির কোনো সিদ্ধান্তে অবশ্যই শেয়ারহোল্ডারদের ডাকা উচিত, পরামর্শ নেওয়া উচিত।’
যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী মুরশিদ আলম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিজ্ঞাপনে মাসুদ সাঈদীকে দেখে বিনিয়োগে আগ্রহী হয়েছিলেন। কিন্তু একটি প্রোজেক্টে এক হাজারের বেশি বিক্রয় প্রতিনিধির খবর পেয়ে সন্দেহ জাগে তার। বনানীর অফিসে গিয়ে ম্যানেজার (সেলস অ্যান্ড মার্কেটিং) মো. রাকিবুল ইসলামের সঙ্গে কথা বলেন। মুরশিদ বলেন, ‘তিনি (রাকিবুল ইসলাম) কিছু প্রশ্নের যথার্থ উত্তর দিতে পারেননি। তাতেই আমি বুঝে নিই, এ প্রজেক্টে ঝামেলা হতে পারে। তাই এখানে আর বিনিয়োগে সাহস করিনি।’
প্রকল্পে কী কী থাকবে, নির্মাণ শেষ হবে কবে
‘ইস্তানবুল হোটেল অ্যান্ড রিসোর্ট’ প্রকল্পে ‘সানরাইজ’ ও ‘সানসেট’ নামে দুটি ১৭ তলা ভবন নির্মাণ হবে। এ ছাড়া থাকবে মসজিদ, পার্কিং, সেমিনার রুম, রেস্টুরেন্ট, গার্ডেন, ফাস্টফুড, সুইমিং পুল, জিম, বোটিং, খেলার মাঠ ও কফি জোন। একই সঙ্গে ছোট ছোট নান্দনিক কটেজ, ফ্যামিলি কটেজ ও সিঙ্গেল কটেজ, রিজারভেশন কাউন্টার এবং ওয়েটিং রুমসহ নানা সুবিধা থাকার কথা রয়েছে। প্রকল্পের প্রথম অংশ মসজিদ, মোটেল ও সার্ভিস বিল্ডিংয়ের কাজ ২০২৭ সাল নাগাদ সম্পন্ন হবে। ৭০টি কটেজ ২০২৮ সালে এবং দুটি হোটেল টাওয়ারসহ পুরো প্রকল্প ২০৩০ সাল নাগাদ সম্পন্ন হওয়ার কথা।
নির্মাণকাজের বর্তমান অবস্থা
এশিয়া পোস্ট প্রতিবেদক গত শনিবার সরেজমিনে প্রকল্প এলাকায় গিয়ে দেখতে পান, পটুয়াখালী জেলার মহিপুর থানায় কুয়াকাটা সমুদ্রসৈকত থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার দূরে প্রধান সড়কের পাশে ধানক্ষেতে এই হোটেল নির্মাণের জন্য জমি নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে জমির এক পাশে কেবল ইটের বাউন্ডারি নির্মাণ করা হচ্ছে। এ ছাড়া জমির ওপর কাঠের একটি ঘর নির্মাণের জন্য কিছু খুঁটি ও চাল বসানো হয়েছে। বাউন্ডারি ও কাঠের ঘরের যে কাজ করা হয়েছে তার খরচ ২০ লাখ টাকার বেশি হবে না বলে মনে করেন স্থানীয়রা।

কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালকের বক্তব্য
ইস্তানবুল হোটেল অ্যান্ড রিসোর্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডিএম এমদাদুল হক এশিয়া পোস্টকে জানান, ‘প্যাকেজ হিসেবে ২৬ হাজার শেয়ারের মধ্যে ১০ হাজারের মতো মানুষ আমাদের শেয়ার কিনেছে।’ তাতে কত টাকা কালেকশন হয়েছে জানতে চাইলে তিনি জানান, ‘এই শেয়ার বিক্রিতে ৭০ থেকে ৮০ কোটি সংগ্রহ হতে পারে।’
কিন্তু এশিয়া পোস্টের হাতে আসা ব্যাংক হিসাবের তথ্য তার সামনে উপস্থাপন করা অ্যাকাউন্টে ১৯০ কোটি টাকা জমা এবং ১৭৫ কোটি টাকা উত্তোলন করা হয়েছে জানালে তিনি দাবি করেন, ‘এ তথ্যটি সঠিক না। এটি হয়তো অন্যভাবে কাউন্ট করেছে। যে টাকাটা অ্যাকাউন্টে এসেছে সেই টাকাটি আমরা তুলে আবার এফডিআর করেছি। ফলে ওই এফডিআরটি কাউন্ট করে অনেকে এভাবে মনে করতে পারে।’
মাসুদ সাঈদীর বক্তব্য
উল্লিখিত অভিযোগের বিষয়ে মাসুদ সাঈদীর সঙ্গে যোগাযোগ করে জমা হওয়া ১৯০ কোটি টাকা এবং ১৭৫ কোটি টাকা উত্তোলনের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আপনি কোথাও ভুল করছেন মনে হয়। আপনি আবার ভালোমতো চেক করেন। আমি এখন দেশের বাইরে আছি। আমি বাংলাদেশে আসার পর আপনি অফিসে আসবেন। ইনশাআল্লাহ আপনার সব প্রশ্নের উত্তর দিয়ে দেব এবং কাগজ দেখিয়ে দেব। তবে আপনি কোনো ভুল করছেন, ভুল তথ্যের ভিত্তিতেই আপনি প্রশ্ন করছেন।






