কক্সবাজারে বাড়ছে পাহাড়ধস, নেপথ্যে যত কারণ

বঙ্গোপসাগরের তীরে বহুমাত্রিক দুর্যোগপ্রবণ জেলা কক্সবাজারে এখন বর্ষা এলেই প্রাণঘাতী হয়ে উঠছে পাহাড়ধস। একসময় ঘূর্ণিঝড় বা জলোচ্ছ্বাসকে প্রধান দুর্যোগ মনে করা হলেও এখন প্রতি বছরই পাহাড়ধসে ঘটছে ব্যাপক প্রাণহানি। গবেষকরা বলছেন, পাহাড়ধস একটি প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া হলেও এই অঞ্চলের পাহাড়ের বিশেষ ভূতাত্ত্বিক গঠন, অতিবৃষ্টি এবং নির্বিচারে পাহাড় কাটার মতো মানবসৃষ্ট কর্মকাণ্ডের কারণে জেলাটিতে এই ঝুঁকি ও বিপর্যয় ক্রমান্বয়ে বাড়ছে।
কক্সবাজার অঞ্চলের পাহাড়ধস নিয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগের গবেষণায় দেখা গেছে, ২০০১ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত কক্সবাজারে ১২৪টি পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটে। ফলে চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামের পর কক্সবাজারও এখন দেশের অন্যতম পাহাড়ধসপ্রবণ অঞ্চল হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
অপরদিকে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের অধ্যাপক ড. নিগার সুলতানার ২০২২ সালের গবেষণায় বলা হয়, বাংলাদেশে প্রতি বছর গড়ে ১১টি পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটে। এতে গড়ে ৩৪ জন নিহত এবং ৫৪ জন আহত হন। এই গবেষণায় জুন থেকে আগস্ট মাসকে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ মৌসুম হিসেবে উল্লেখ করা হয়।

সাম্প্রতিক ঘটনাবলি এই গবেষণার তথ্যকে আরও স্পষ্ট করেছে। কক্সবাজার জেলা প্রশাসন ও জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুলাই মাসে টানা ছয় দিনের ভারী বর্ষণে ১৫ জন রোহিঙ্গাসহ অন্তত ২১ জন পাহাড়ধসে নিহত হয়েছেন। এই সময়ে আশ্রয় শিবিরসহ জেলার বিভিন্ন স্থানে অন্তত ১২০টি ভূমিধসের ঘটনা ঘটে।
কী বলছে চবি’র গবেষণা?
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. আবু তৈয়ব চৌধুরী, অধ্যাপক ড. মো. ইকবাল সরোয়ার এবং একদল শিক্ষার্থী কক্সবাজারের পাহাড়ধস নিয়ে গবেষণাটি পরিচালনা করেন।
অধ্যাপক ইকবাল সরোয়ার বলেন, কক্সবাজারের পাহাড় টারশিয়ারি যুগের পাললিক শিলা ও বেলে মাটি দিয়ে গঠিত। অনেক স্থানে শেল, সিল্ট ও বেলেপাথরের স্তর পাশাপাশি রয়েছে। যখন বৃষ্টির পানি বেলেপাথরের স্তর ভেদ করে নিচে নেমে শেল স্তরে আটকে যায়, তখন স্তরটি পিচ্ছিল হয়ে পড়ে। এ সময় পাহাড়ধসের ঝুঁকি বেড়ে যায়।
তিনি আরও বলেন, টানা দুই থেকে সাত দিন দৈনিক ৪০ মিলিমিটারের বেশি বৃষ্টিপাত হলে ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। ভারী বৃষ্টিতে পাহাড়ের মাটি নরম হয়ে আগে থেকে থাকা ফাটল দিয়ে পানি ভেতরে প্রবেশ করে। এতে মাটির ওজন ও অভ্যন্তরীণ চাপ বাড়ে। একপর্যায়ে পাহাড় স্থিতিশীলতা হারিয়ে ধসে পড়ে।
গবেষণায় বলা হয়েছে, কক্সবাজারে বছরে প্রায় তিন হাজার মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়। এই বৃষ্টিপাতের বড় অংশই হয় জুন ও জুলাই মাসে। তাছাড়া পাশাপাশি দুটি ভূমির উচ্চতার পার্থক্য যত বেশি, পাহাড়ধসের আশঙ্কাও তত বেশি থাকে।
কত মানুষ ঝুঁকির মুখে?
চবি’র গবেষণা অনুযায়ী, কক্সবাজারের ১০টি ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ে প্রায় ১২ হাজার মানুষ বসবাস করছেন। মহেশখালীর ২২টি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় প্রায় আট হাজার মানুষ এবং টেকনাফের ২৩টি ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ে প্রায় ১ হাজার ২০০ পরিবার রয়েছে। এর মধ্যে অন্তত ২৩০টি পরিবার অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে।

অপরদিকে বন বিভাগের তথ্য বলছে, কক্সবাজারে অন্তত ২০ হাজার স্থানীয় পরিবার ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ি ঢালে বসবাস করছে। পাশাপাশি উখিয়া ও টেকনাফের ৩৩টি ক্যাম্পে আশ্রিত প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গার মধ্যে অন্তত এক লাখ মানুষ সরাসরি ভূমিধসের ঝুঁকিতে রয়েছে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. অলক পাল বলেন, একসময় কক্সবাজার পৌর এলাকায় ১৫ থেকে ২০ হাজার মানুষের বসবাস ছিল। বর্তমানে সেই সংখ্যা তিন লাখ ছাড়িয়েছে। লাইট হাউস, উত্তরণসহ পাহাড়ি এলাকায় ঘনবসতি গড়ে উঠেছে।
অধ্যাপক অলক পালের মতে, ভারত, চীন, পাকিস্তান ও ভুটানের মতো দেশেও পাহাড়ের ঢালে বিপুলসংখ্যক মানুষ বাস করে। তবে সেখানে পরিকল্পিত উন্নয়ন ও কার্যকর পাহাড় ব্যবস্থাপনার কারণে পাহাড়ধসের ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে অনেক কম।
তিনি আরও বলেন, একসময় কক্সবাজারের পাহাড় ট্রপিক্যাল বনাঞ্চলের জন্য পরিচিত ছিল। সেসব জায়গায় পাহাড় দখল করে পুনর্বাসনের নামে মানুষ বসবাস করছে। অথচ এসব ঝুঁকিপূর্ণ বসতি অপসারণ কিংবা পাহাড় সংরক্ষণে কার্যকর উদ্যোগ খুব একটা দেখা যায় না।
৯০ ডিগ্রি কোণে পাহাড় কাটা ও ভূমিকম্পে অদৃশ্য ফাটল
চবি’র ওই গবেষণায় উঠে এসেছে, কক্সবাজারে আবাসন, সড়ক নির্মাণ ও অন্যান্য উন্নয়ন কাজে দীর্ঘদিন ধরে নির্বিচারে পাহাড় কাটা হচ্ছে। এতে পাহাড়ের স্বাভাবিক ঢাল নষ্ট, মাটির দৃঢ়তা হ্রাস এবং গাছপালা ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে।
অধ্যাপক ইকবাল সরোয়ার বলেন, সাধারণভাবে ৪০ ডিগ্রির বেশি ঢালবিশিষ্ট পাহাড় ঝুঁকিপূর্ণ। কিন্তু কক্সবাজারের অনেক স্থানে পাহাড় কাটা হয় প্রায় ৯০ ডিগ্রি কোণে। এতে পাহাড়ের স্বাভাবিক স্থিতিশীলতা পুরোপুরি নষ্ট হচ্ছে।
গবেষণায় আরও বলা হয়েছে, কক্সবাজার ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকার কাছাকাছি অবস্থিত। এখানে ছোট মাত্রার ভূমিকম্প পাহাড়ের ভেতরে সূক্ষ্ম ফাটল সৃষ্টি করতে পারে। বর্ষাকালে এসব ফাটল দিয়ে পানি প্রবেশ করলে পাহাড় আরও দুর্বল হয়ে পড়ে।

কানাডার সাসকাচুয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ের জলবায়ু গবেষক মোস্তফা কামাল পলাশ বলেন, ধারণা করছি কক্সবাজার অঞ্চলে সাম্প্রতিক পাহাড়ধসে ভূমিকম্প প্রত্যক্ষ কারণ না হলেও, অতীতের ভূতাত্ত্বিক দুর্বলতা এখানে পরোক্ষ ভূমিকা রাখতে পারে।
গড়ে ওঠেনি পাহাড় ব্যবস্থাপনা
কক্সবাজার দক্ষিণ বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা আবদুল্লাহ আল মামুন জানান, বন বিভাগের পক্ষ থেকে নয় হাজার ৬০ জন অবৈধ দখলকারীর তালিকা তৈরি করে উচ্ছেদ প্রস্তাব জেলা প্রশাসনের কাছে পাঠানো হয়েছে। এছাড়া গত দুই বছরে পাহাড় কাটার অভিযোগে ২৫৩টি মামলা করা হয়েছে।
তিনি বলেন, বারবার সতর্ক করার পরও অনেক মানুষ ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ি এলাকা ছাড়তে চান না। তাদের মধ্যে নিজস্ব মাথাগোঁজার ঠাঁই হারানোর ভয় কাজ করে।
কক্সবাজার পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক (চলতি দায়িত্ব) জমির উদ্দিন বলেন, গত বছর বন বিভাগের পাঠানো পাহাড় কাটার সঙ্গে জড়িতদের একটি তালিকায় তথ্যগত অসংগতি থাকায় হালনাগাদ তালিকা চাওয়া হয়েছিল। তবে এখনো সংশোধিত তালিকা পাওয়া যায়নি।
তিনি বলেন, কত মানুষ ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ে বসবাস করছে, সে বিষয়ে নির্ভরযোগ্য কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই। পাহাড় কাটা বা পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটলে সাময়িক অভিযান পরিচালনা করা হলেও, দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত কোনো পাহাড় ব্যবস্থাপনা গড়ে ওঠেনি।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) কক্সবাজার জেলার সাংগঠনিক সম্পাদক এইচ এম নজরুল ইসলাম বলেন, সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের সমন্বয়হীনতার সুযোগে পাহাড়খেকোরা সক্রিয় থাকে। বর্ষা শুরু হলে কেবল অভিযান জোরদার হয়। অথচ, সারা বছর পাহাড় কাটা ও পাহাড় দখল করে স্থাপনা নির্মাণ চললেও কোনো কার্যকর পদক্ষেপ দেখা যায়নি।
চবির ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগের গবেষকেরা পাহাড়ধসের ঝুঁকি কমাতে পাহাড় কাটা ও বন উজাড় সম্পূর্ণ বন্ধ করার তাগিদ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। একইসঙ্গে ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ের ডিজিটাল মানচিত্র তৈরি, পাহাড়ের পাদদেশে নতুন বসতি স্থাপন নিয়ন্ত্রণ, বর্ষার আগে ঝুঁকিপূর্ণ পরিবার স্থানান্তর এবং পাহাড়ের ঢালে কার্যকর পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি বলে উল্লেখ করেন তারা।
এছাড়া স্থানীয় প্রজাতির গাছ লাগানো, রিটেইনিং ওয়াল নির্মাণ, পরিবেশ আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ এবং ড্রোন বা সিসিটিভির মাধ্যমে পাহাড় কাটা সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করার সুপারিশ করেছেন গবেষকেরা।





