মহাবিশ্বের রহস্য উন্মোচনের পথে বাংলাদেশের ইকরামুল

এশিয়া পোস্ট নিউজ, ফ্রান্স
মহাবিশ্বের রহস্য উন্মোচনের পথে বাংলাদেশের ইকরামুল
ইকরামুল কবির। ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশের এক প্রত্যন্ত মফস্বল থেকে শুরু হওয়া একটি স্বপ্ন আজ পৌঁছে গেছে আন্তর্জাতিক গবেষণার অঙ্গনে। সীমিত সুযোগ, ভাষাগত বাধা, ভিন্ন শিক্ষাব্যবস্থার চ্যালেঞ্জ এবং দীর্ঘ সংগ্রামের পথ অতিক্রম করে বাগেরহাটের মোল্লাহাটের এক তরুণ এখন মহাবিশ্বের অন্যতম গভীর রহস্য ‘ডার্ক এনার্জি’ ও ‘মহাজাগতিক বিবর্তন’ নিয়ে গবেষণার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তার এই যাত্রা শুধু ব্যক্তিগত সাফল্যের গল্প নয়; এটি অধ্যবসায়, সাহস এবং স্বপ্নকে আঁকড়ে ধরে এগিয়ে যাওয়ার এক অনুপ্রেরণামূলক কাহিনি।

ইকরামুল কবির (ফ্রেন্সস্টাইন) ১৯৯৪ সালে বাগেরহাট জেলার মোল্লাহাট উপজেলায় জন্মগ্রহণ করেন। আর দশজনের মতোই মফস্বলেই তার বেড়ে ওঠা। ছোটবেলা থেকে পড়াশোনার প্রতি ছিল গভীর আগ্রহ, ফলে পরিবার ও এলাকাবাসীর কাছে তিনি ছিলেন অত্যন্ত স্নেহভাজন। তবে তার একটি বিশেষ বদভ্যাস ছিল—তিনি প্রচুর প্রশ্ন করতেন। প্রকৃতি, নভোমণ্ডল, নক্ষত্র ও ছায়াপথের প্রতি তার দুর্নিবার আকর্ষণ ছিল শৈশব থেকে।

পরিবারে উচ্চশিক্ষিত কেউ না থাকায় শিক্ষা ও ক্যারিয়ার নিয়ে পরামর্শের জন্য তাকে বিভিন্ন ব্যক্তি ও উৎসের ওপর নির্ভর করতে হয়েছে। স্কুল ও কলেজজীবন থেকে বিজ্ঞানীদের জীবন ও কর্ম তাকে গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করেছে। বিশেষ করে আলবার্ট আইনস্টাইন ছিলেন তার অন্যতম প্রেরণা। পাশাপাশি আইজ্যাক নিউটন, গ্যালিলিও গ্যালিলেই এবং স্টিফেন হকিংও তার চিন্তা ও গবেষণার আগ্রহ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন।

তিনি ২০১০ সালে সরকারি ওয়াজেদ মেমোরিয়াল উচ্চ বিদ্যালয়, মোল্লাহাট থেকে এসএসসি এবং ২০১৩ সালে খুলনার শতদল মহাবিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞান বিভাগে জিপিএ–৫ নিয়ে এইচএসসি সম্পন্ন করেন। সব বিষয়ে সমান গুরুত্ব দিলেও পদার্থবিদ্যা ও গণিত ছিল তার বিশেষ আগ্রহের ক্ষেত্র। শুধু ভালো ফল অর্জন নয়, এই বিষয়গুলোর মৌলিক ধারণা ও গভীর জ্ঞান অর্জনের প্রতিও ছিল তার প্রবল আকর্ষণ।

এইচএসসি শেষ করার পর তিনি বিদেশে পদার্থবিদ্যা নিয়ে উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন। মধ্যবিত্ত পরিবারের একজন শিক্ষার্থীর জন্য এমন স্বপ্ন অনেকের কাছে অবাস্তব মনে হলেও তিনি বিশ্বাস করতেন, সীমিত সামর্থ্যের মানুষের জন্য ভিন্নভাবে চিন্তা করা এগিয়ে যাওয়ার অন্যতম উপায়।

২০১৫ সালে তিনি স্নাতক অধ্যয়নের উদ্দেশ্যে ইতালিতে পাড়ি জমান। সেখানে দুই বছর মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং অধ্যয়নের পর উপলব্ধি করেন, তার প্রকৃত ভালোবাসা পদার্থবিদ্যায়। সেই উপলব্ধি থেকে তিনি নতুন করে নিজের পথ নির্ধারণ করেন।

২০১৮ সালে তিনি ফ্রান্সে এসে ফরাসি ভাষা শেখা শুরু করেন। নতুন ভাষা, ভিন্ন শিক্ষাব্যবস্থা এবং কয়েক বছরের গ্যাপ—সব মিলিয়ে পথটি ছিল অত্যন্ত কঠিন। কিন্তু অদম্য ইচ্ছাশক্তি, কঠোর পরিশ্রম এবং মহান আল্লাহর কৃপায় তিনি ২০২০–২০২৩ শিক্ষাবর্ষে ইউনিভার্সিটি অব লিল থেকে তাত্ত্বিক পদার্থবিদ্যায় স্নাতক ডিগ্রি সফলভাবে সম্পন্ন করেন। সীমিত সময়ে এই ডিগ্রি অর্জন ছিল তার অধ্যবসায় ও দৃঢ় সংকল্পের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

স্নাতক পর্যায়ে অ্যাস্ট্রোনমি ও অ্যাস্ট্রোফিজিক্সের বিভিন্ন কোর্স অধ্যয়নের মাধ্যমে তার আগ্রহ কেন্দ্রীভূত হয় তাত্ত্বিক কসমোলজির দিকে—যে শাখায় মহাবিশ্বের উৎপত্তি, গঠন, বিবর্তন ও ভবিষ্যৎ নিয়ে গবেষণা করা হয়। এই আগ্রহ থেকেই ২০২৩ সালে তিনি ইতালির পাদুয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাস্ট্রোফিজিক্স অ্যান্ড কসমোলজি মাস্টার্স প্রোগ্রামের ‘থিওরি অ্যান্ড মডেলিং’ ট্র্যাকে আঞ্চলিক বৃত্তিসহ ভর্তি হন।

মাস্টার্সের চতুর্থ সেমিস্টারে তিনি বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ গবেষণা প্রতিষ্ঠান প্যারিস অবজারভেটরিতে গবেষণা-ইন্টার্নশিপের সুযোগ লাভ করেন। প্যারিস পিএসএল বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘লুথ’ গবেষণাগারে তিনি অধ্যাপক পিয়ের-স্তেফানো কোরাসানিতির তত্ত্বাবধানে ছয় মাস নন-ডাইনামিক্যাল ডার্ক এনার্জি নিয়ে গবেষণা করেন। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে তিনি ১১০-এর মধ্যে ১০৩ নম্বর অর্জন করে মাস্টার্স ডিগ্রি সম্পন্ন করেন।

সম্প্রতি তিনি চীনের বিশ্বখ্যাত ফুদান বিশ্ববিদ্যালয়ে পূর্ণ অর্থায়নসহ পিএইচডি গবেষণার সুযোগ পেয়েছেন। সেখানে তিনি ইতালীয় কসমোলজিস্ট অধ্যাপক আন্তোনিনো মারচিয়ানোর তত্ত্বাবধানে ‘কোয়ান্টাম মডেল অব ডার্ক এনার্জি’ বিষয়ে গবেষণা করবেন। তার গবেষণার মূল লক্ষ্য হবে ডার্ক এনার্জির উৎপত্তি, মহাজাগতিক ইনফ্লেশন এবং মহাবিশ্বের চূড়ান্ত পরিণতি সম্পর্কে নতুন তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা অনুসন্ধান করা।

ব্যক্তিগত জীবনে ইকরামুল কবির একজন ধর্মপ্রাণ মুসলিম। তিনি বিশ্বাস করেন, বিজ্ঞান ও ধর্ম পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়; বরং সত্য অনুসন্ধানের দুটি ভিন্ন কিন্তু পরিপূরক পথ। গবেষণার পাশাপাশি তিনি ক্যাম-সাস্ট ও জগন্নাথ ফিজিক্স ক্লাবের বিভিন্ন ওয়েবিনারে কসমোলজি বিষয়ে বক্তৃতা দিয়েছেন এবং বিদেশে উচ্চশিক্ষায় আগ্রহী শিক্ষার্থীদের নিয়মিত পরামর্শ ও মেন্টরিং করে থাকেন।

সামাজিক দায়বদ্ধতার ক্ষেত্রেও তিনি সক্রিয়। ফ্রান্সে গ্রিনপিসের সঙ্গে যুক্ত থেকে তিনি নিরাপদ পারমাণবিক শক্তির ব্যবহার, নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসার এবং পরিবেশ সংরক্ষণবিষয়ক বিভিন্ন কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করছেন।

বাংলাদেশের এক প্রত্যন্ত জনপদ থেকে আন্তর্জাতিক গবেষণার অগ্রভাগে পৌঁছানোর এই যাত্রা প্রমাণ করে—স্বপ্ন যদি স্পষ্ট হয়, লক্ষ্য যদি অটুট থাকে এবং পরিশ্রম যদি অব্যাহত থাকে, তবে সীমাবদ্ধতা কখনোই সাফল্যের শেষ কথা নয়। ইকরামুল কবিরের পথচলা তাই নতুন প্রজন্মের জন্য এক শক্তিশালী অনুপ্রেরণার নাম।