অদ্ভুত সেই ছেলেটি মঞ্চে উঠল আবার

অদ্ভুত সেই ছেলেটি মঞ্চে উঠল আবার
১৬ মাস পর মঞ্চে উঠলেন বেজ বাবা সুমন। ছবি: সাঈদ বিন মহিউদ্দিন

শরীরে ৫৪টির মতো সার্জারি। ক্ষতবিক্ষত দেহে হৃদয়টিতেই শুধু কাটাছেঁড়া হয়নি। দিনের পর দিন, রাতের পর রাত কেটেছে অপারেশন থিয়েটারে। বন্ধ হয়ে যায় চলাচল, বাক্যবিনিময়েও আসে নিষেধাজ্ঞা, শুধু হৃৎপিণ্ডটি টিকে ছিল।

হাসপাতালে চিকিৎসাধীন সাইদুস সালেহীন খালেদ সুমন।
হাসপাতালে চিকিৎসাধীন সাইদুস সালেহীন খালেদ সুমন।

হ্যাঁ, জীবন-মৃত্যুর এমন এক নির্মম ও দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে আবারও চেনা মঞ্চে, চেনা আলোয় ফিরে এসেছেন তিনি। তিনি আর কেউ নন—বাংলা রক মিউজিকের জীবন্ত কিংবদন্তি, ‘অর্থহীন’ ব্যান্ডের ভোকাল, দলনেতা ও সবার প্রিয় ‘বেজ বাবা’ সুমন। সব বাধা, সব পঙ্গুত্ব আর চিকিৎসকদের সব আশঙ্কাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে গিটার হাতে তিনি যখন আবারও মঞ্চে দাঁড়ালেন, তখন হাজারো ভক্তের চোখে ছিল আনন্দ অশ্রু। কারণ, শেষ যখন সুমন অপারেশন থিয়েটারে গিয়েছিলেন, ফিরে এসে তাদের কাউকেই আর পেলেন না মঞ্চে। ১০ জুলাই রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে ‘ওভারলোড ফেস্টিভ্যাল’ শিরোনাম কনসার্টে সুমনের সঙ্গে উঠল নতুন লাইনআপ।

অর্থহীন ব্যান্ডের নতুন লাইনআপ।
অর্থহীন ব্যান্ডের নতুন লাইনআপ।

ক্যানসারসহ একাধিক জটিল রোগে আক্রান্ত হয়ে বছরের পর বছর সুমনকে কাটাতে হয়েছে হাসপাতালের বিছানায়। জার্মানি থেকে শুরু করে ব্যাংকক, ছুটতে হয়েছে এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে। মেরুদণ্ডে একের পর এক অস্ত্রোপচার আর ৫৪টি সার্জারির ধকল সামলানো কোনো সাধারণ মানুষের পক্ষে হয়তো সম্ভব হতো না। চিকিৎসকরা একসময় বলেছিলেন, তিনি হয়তো আর কোনোদিন স্বাভাবিকভাবে হাঁটতেও পারবেন না, গান গাওয়া তো দূরের কথা। কিন্তু অদ্ভুত সেই ছেলেটি মঞ্চে উঠল আবার। হাসপাতালের বিছানা থেকে যেখানে ফিরতে সময় লেগেছে ১৬ মাস।

১৬ মাস পর মঞ্চে উঠলেন বেজ বাবা সুমন।
১৬ মাস পর মঞ্চে উঠলেন বেজ বাবা সুমন।

কিন্তু যার হৃদয়ে সুর আর কোটি ভক্তের ভালোবাসা মিশে থাকে, তাকে কি আর চার দেয়ালের মাঝে আটকে রাখা যায়? সুমনের শরীরটা ভেঙেছিল, কিন্তু মনটা ছিল ইস্পাতকঠিন। সেই অদম্য ইচ্ছাশক্তি আর ‘বেজ বাবা’র চিরচেনা সেই ‘অদ্ভুত ছেলেটি’র জেদই তাকে ফিরিয়ে এনেছে তার আসল ঠিকানায়। তিনি আবার মিশে গেলেন কনসার্টের উন্মাতাল মঞ্চে।

ব্যান্ডটির একসময়ের সদস্য শিশির আহমেদ আবার ফিরেছেন।
ব্যান্ডটির একসময়ের সদস্য শিশির আহমেদ আবার ফিরেছেন।

দীর্ঘ বিরতির পর যখন তিনি আবার মঞ্চে উঠলেন, তখন চারদিকের আলো যেন বদলে গেল। তিনি আসলেন, হাসলেন এবং শ্রোতাদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলেন ব্যান্ডটির একসময়ের সদস্য শিশির আহমেদকে আবারও। দীর্ঘ ২০ বছর অর্থহীনের হয়ে কাজ করার পর ২০২৩ সালে ব্যান্ড ছেড়েছিলেন তিনি। অর্থহীনের লাইনআপে গিটার ও কি-বোর্ডসে আবারও পাওয়া যাবে তাকে। নতুন সদস্য হিসেবে যোগ দিয়েছেন আদনান আতিক ও শেখ এম রিয়াজ। কি-বোর্ডস ও গিটারে আতিক এবং মেকানিকস ব্যান্ডের রিয়াজ অর্থহীনে বাজাবেন গেস্ট ড্রামার হিসেবে।

ব্যান্ডের জনপ্রিয় গানগুলোতে শ্রোতারাও কণ্ঠ মিলিয়েছেন সুমন-শিশিরদের সঙ্গে।
ব্যান্ডের জনপ্রিয় গানগুলোতে শ্রোতারাও কণ্ঠ মিলিয়েছেন সুমন-শিশিরদের সঙ্গে।

এরপর অর্থহীন একে এক বাজাতে শুরু করল, এপিটাফ, অসমাপ্ত, যদি কোনদিন এবং অদ্ভুত সেই ছেলেটির মত কালজয়ী সব গান। তবে কোনও গানই সুমন বা তার দলের গাইতে হয়নি, সামনে থেকে শ্রোতারাই পুরোটি গেয়ে নিজেদের মনের প্রপ্তি ঘুছিয়েছেন। ধন্যবাদ জানিয়েছেন নিজেদের প্রিয় এই ব্যান্ডটিকে।

কনসার্টের একপর্যায়ে শ্রোতাদের সঙ্গে ভালোবাসা বিনিময় করেন সুমন।
কনসার্টের একপর্যায়ে শ্রোতাদের সঙ্গে ভালোবাসা বিনিময় করেন সুমন।

এদিন ক্ষতবিক্ষত শরীর নিয়ে মঞ্চে দাঁড়িয়ে সুমন কেবল গানই গাননি, তিনি যেন গেয়ে গেলেন জীবনের জয়গানও। বেজ বাবা সুমনের এই ফেরা পুরো বাংলা ব্যান্ডের ইতিহাসের অন্যতম এক আবেগঘন এবং স্মরণীয় অধ্যায়।

১০ জুলাই লাইভ ওয়েভ এন্টারটেইনমেন্ট আয়োজিত এই কনসার্টে ব্যান্ড অর্থহীন ছাড়াও আরও পারফর্ম করেন আর্টসেল, ব্ল্যাক, ক্রিপটেক ফেইট, নেমেসিস, পাওয়ারসার্জ, লেভেল ফাইভ এবং রকসল্ট।