একুশে পদকপ্রাপ্ত শিল্পী মুস্তাফা মনোয়ার আর নেই

এশিয়া পোস্ট বিনোদন
একুশে পদকপ্রাপ্ত শিল্পী মুস্তাফা মনোয়ার আর নেই
নব্বই বছর বয়সে চলে গেলেন বরেণ্য শিল্পী মুস্তাফা মনোয়ার। ছবি: সংগৃহীত


বাংলাদেশের শিল্প ও সংস্কৃতি জগতের একটি উজ্জ্বল নক্ষত্রের অবসান ঘটল। একুশে পদকপ্রাপ্ত প্রখ্যাত চিত্রশিল্পী, নির্দেশক এবং দেশের পাপেট শিল্পের অদ্বিতীয় পথিকৃৎ মুস্তাফা মনোয়ার আর নেই। আজ সোমবার (২৯ জুন) সকাল সাড়ে ৮টায় রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। (ইন্নলিল্লাহি ওয়াইন্না ইলাহি রাজিউন)

Advertisement

শিল্প ও সংস্কৃতিতে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০০৪ সালে একুশে পদকে ভূষিত হন মুস্তাফা মনোয়ারকে। এ ছাড়া নানা সম্মাননায় ভূষিত ছিলেন তিনি। কবি গোলাম মোস্তফার ছেলে মুস্তাফা মনোয়ারের জন্ম ১৯৩৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর। দেশজুড়ে, স্তব্ধ হয়ে পড়েছে শিল্প-সংস্কৃতির আঙিনা।

গত ১৪ জুন অসুস্থতা নিয়ে তিনি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। স্কয়ার হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, অসুস্থ অবস্থায় মুস্তাফা মনোয়ারকে এখানে ভর্তি করা হয়। আজ সকাল সাড়ে ৮টায় হাসপাতালে তার মৃত্যু হয়।

শৈশব থেকেই পারিবারিক সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক আবহে বেড়ে ওঠা এই শিল্পীর রক্তে ছিল সৃষ্টির প্রেরণা। নবম শ্রেণিতে পড়ার সময় তিনি রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে যোগ দিয়ে কারাবরণ করেছিলেন। কলকাতা আর্ট কলেজ থেকে উচ্চশিক্ষা শেষ করে ঢাকা আর্ট কলেজে শিক্ষকতার মাধ্যমে তার কর্মজীবন শুরু হয়।

গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী পুতুলনাচের প্রতি টান থেকে তিনি বাংলাদেশে আধুনিক পাপেট শিল্পের সূচনা করেন। মুস্তাফা মনোয়ারকে পাপেট শিল্পের পতিকৃৎ ধরা হয়। তিনিই প্রথম পুতুলের মুখে ভাষা ফুটিয়ে শিশুদের মনে এক জাদুকরী কৌতূহল তৈরি করেছিলেন।

১৯৬০-এর দশকে কলিম শরাফীর একটি ডকুমেন্টারির মাধ্যমে তার পাপেটের প্রথম আত্মপ্রকাশ ঘটে। পরবর্তীতে টেলিভিশনে ‘আজব দেশে’ অনুষ্ঠানে ‘বাঘা’ ও ‘মেনি’ চরিত্রের মাধ্যমে তিনি তৎকালীন পাকিস্তানি মনোভাবকে ব্যঙ্গ করে বাঙালি সংস্কৃতির পক্ষে এক নীরব প্রতিরোধ গড়ে তোলেন।

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় শরণার্থী শিবিরের আতঙ্কগ্রস্ত শিশুদের মুখে হাসি ফোটাতে তিনি পাপেট শোর আয়োজন করেছিলেন, যা ছিল তার মানবিক শিল্পসত্তার এক অনন্য নজির। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর তিনি আবহমান বাংলার লোককথা ‘সাত ভাই চম্পা’ থেকে ‘পারুল’ চরিত্রটি সৃষ্টি করেন এবং ‘মনের কথা’ অনুষ্ঠানের বাউল-পারুল যুগলবন্দির মাধ্যমে একটি প্রজন্মকে শৈশবের রঙিন আনন্দ উপহার দেন।

শুধু পাপেটেই নয়, দেশের প্রতিটি বড় মাধ্যমে তার অবদান অনস্বীকার্য। তিনি কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের অন্যতম স্থপতি, জনপ্রিয় ‘মীনা’ কার্টুনের পেছনের অন্যতম কারিগর এবং শিশু-কিশোরদের প্রতিভা বিকাশের কালজয়ী অনুষ্ঠান ‘নতুন কুঁড়ি’-র নির্মাতা। কর্মজীবনে তিনি বাংলাদেশ টেলিভিশন, শিশু একাডেমি, এফডিসি ও শিল্পকলা একাডেমির মতো শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ পদে সফলভাবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

শিল্পীর ব্যক্তিগত সহকারী গণমাধ্যমকে জানান, হাসপাতাল থেকে মুস্তাফা মনোয়ারকে নেওয়া হবে ধানমন্ডির তাকওয়া মসজিদে। এরপর ধানমন্ডি ১ নম্বরে শিল্পীর মরদেহ তার বাসভবনে নেওয়া হবে। তার জানাজা ও দাফন কোথায় হবে, সে বিষয়ে পরে পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হবে।

মুস্তাফা মনোয়ারের প্রয়াণের খবরে সামাজিকমাধ্যমে তাকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছেন নেটিজেনরা। শৈশবের স্মৃতি রোমন্থন করে অনেকেই তার আত্মার শান্তি কামনা করে আবেগঘন বার্তা দিচ্ছেন।

বাংলাদেশের পারুল-বাউলের রূপকার চলে গেছেন চিরতরে; তবে শিল্পাঙ্গনে তার অবদান কোটি বাঙালির হৃদয়ে বেঁচে থাকবে চিরকাল।