ইরান কি বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে দুর্ভাগা দল

বিশ্বকাপে হৃদয়ভাঙার গল্প নতুন নয়। কারও স্বপ্ন শেষ হয় পেনাল্টি মিসে, কারও লাল কার্ডে, কারও শেষ মুহূর্তের গোলে। কিন্তু ২০২৬ বিশ্বকাপে ইরানের বিদায়ের গল্প যেন নিষ্ঠুরতার আলাদা এক অধ্যায়।
একটি ম্যাচও না হেরে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিয়েছে ইরান। গ্রুপ পর্বে তিন ম্যাচের তিনটিই ড্র। তবু শেষ ৩২-এ জায়গা হয়নি তাদের। গোল ব্যবধানের হিসাব, শেষ মুহূর্তের বাতিল গোল, অন্য ম্যাচের যোগ করা সময়ের সমতা, তার সঙ্গে ভিসা ও ভ্রমণ জটিলতা, সব মিলিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে, বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে দুর্ভাগা দলগুলোর একটি কি এবারের ইরান?
ইরানের সামনে সুযোগ ছিল নিজেদের ইতিহাস বদলানোর। এর আগে কখনো বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে উঠতে পারেনি টিম মেল্লি। মিসরের বিপক্ষে জিতলেই সেই অপেক্ষা শেষ হয়ে যেত। কিন্তু ম্যাচটি তাদের জন্য হয়ে ওঠে আক্ষেপের দীর্ঘ গল্প।
মিসর দ্রুত এগিয়ে যায়। এরপর মেহদি তারেমি পেনাল্টি আদায় করলেও সেটি কাজে লাগাতে পারেননি। তার শট ঠেকিয়ে দেন মিসর গোলরক্ষক মোস্তফা শোবেইর। কিছুক্ষণ পর রামিন রেজায়িয়ান দুরূহ কোণ থেকে গোল করে ইরানকে সমতায় ফেরান। তখনও আশা বেঁচে ছিল।
ম্যাচের শেষ দিকে ইরান আবার চাপ বাড়ায়। তারেমির একটি হেড ক্রসবারে লাগে। এরপর যোগ করা সময়ে গোলমুখে জটলার মধ্যে বল জালে পাঠান শোজা খলিলজাদেহ। ইরান বেঞ্চ ছুটে আসে মাঠে, খেলোয়াড়রা উদ্যাপনে মেতে ওঠেন। মনে হচ্ছিল, ইতিহাস লেখা হয়ে গেছে।
কিন্তু ভিএআর সেই আনন্দ থামিয়ে দেয়। অফসাইডের কারণে গোল বাতিল হয়। খুব সূক্ষ্ম ব্যবধানে খলিলজাদেহ এগিয়ে ছিলেন। ১-১ ড্রতেই শেষ হয় ম্যাচ। নিশ্চিত নকআউটের জায়গা থেকে ইরান নেমে যায় অপেক্ষার ঘরে।
সেই অপেক্ষা ছিল আরও নির্মম। ইরানের ভাগ্য তখন নির্ভর করছিল অন্য গ্রুপের ম্যাচের ওপর। আলজেরিয়া-অস্ট্রিয়া ম্যাচে যে কোনো এক দল জিতলেই ইরানের সুযোগ তৈরি হতো। ম্যাচটি ২-২ অবস্থায় শেষের দিকে যাচ্ছিল, যা ইরানের জন্য খারাপ খবর ছিল।
তারপর যোগ করা সময়ে রিয়াদ মাহরেজ গোল করেন। আলজেরিয়া এগিয়ে যায় ৩-২ ব্যবধানে। সেই মুহূর্তে ইরান আবার নকআউটের খুব কাছে। মিসরের বিপক্ষে বাতিল হওয়া গোলের দুঃস্বপ্ন যেন কিছু সময়ের জন্য ভুলে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।
কিন্তু নাটক তখনও শেষ হয়নি। অস্ট্রিয়ার সাসা কালাইদজিচ হেডে গোল করে ম্যাচ ৩-৩ করেন। সেই গোলেই অস্ট্রিয়া ও আলজেরিয়া দুদলই শেষ ৩২ নিশ্চিত করে। ইরান আবারও শেষ মুহূর্তে ছিটকে যায়।
মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যে দুবার নকআউটের দরজায় দাঁড়িয়ে ফিরে আসতে হলো ইরানকে। প্রথমবার নিজেদের ম্যাচে বাতিল হওয়া গোলে। দ্বিতীয়বার অন্য ম্যাচের শেষ মুহূর্তের সমতায়। ফুটবলে ভাগ্য বলে কিছু থাকলে, এই বিশ্বকাপে সেটি ইরানের পাশে ছিল না।
অথচ মাঠের বাইরের পরিস্থিতিও তাদের জন্য সহজ ছিল না। রাজনৈতিক উত্তেজনা, ভিসা জটিলতা ও ভ্রমণ সমস্যায় পুরো প্রস্তুতিই অস্বাভাবিক হয়ে পড়ে। যুক্তরাষ্ট্রে ম্যাচ খেলতে যাওয়া-আসার চাপ, দেরিতে ভ্রমণ, অনুশীলন ও প্রস্তুতির অসুবিধা, সব মিলিয়ে ইরানের বিশ্বকাপ পথ শুরু থেকেই কঠিন ছিল।
কোচ আমির গালেনোয়ি আগেই বলেছিলেন, এই সীমাবদ্ধতা তার দলের প্রস্তুতি ও শারীরিক অবস্থায় প্রভাব ফেলেছে। মিসর ম্যাচের পর তারেমিও পরিস্থিতি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তার কাছে এটি শুধু মাঠের ব্যর্থতা ছিল না, ছিল লজিস্টিক বিপর্যয়ের গল্পও।
সব মিলিয়ে ইরানের বিদায় শুধু মাঠের ফল নয়, একাধিক আক্ষেপের যোগফল। তারেমির পেনাল্টি, ক্রসবারে লাগা হেড, খলিলজাদেহর বাতিল গোল, মাহরেজের গোলের পর ক্ষণিকের আশা, কালাইদজিচের শেষ আঘাত, আর তার বাইরে দীর্ঘ ভ্রমণ-অস্বস্তি, সবকিছু মিলে তাদের বিশ্বকাপ গল্পটাকে করেছে অবিশ্বাস্য রকম নিষ্ঠুর।
ল।






