নকআউটের দরজায় গিয়েও ফিরল ইরান

বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বের শেষ রাত উপহার দিল এমন নাটক, যা কয়েক মিনিটে এক দেশের স্বপ্ন গড়ে আবার ভেঙে দিতে পারে। অস্ট্রিয়া-আলজেরিয়া ম্যাচের যোগ করা সময়ে একবার মনে হয়েছিল, ইরান শেষ ৩২-এ উঠে যাচ্ছে। কিন্তু সাসা কালাইদজিচের শেষ মুহূর্তের হেড বদলে দিল সব হিসাব। অস্ট্রিয়া ও আলজেরিয়ার ৩-৩ ড্রয়ে দুই দলই নকআউটে উঠল, আর বিদায় নিল ইরান।
গ্রুপ ‘জে’-এর ম্যাচে অস্ট্রিয়া ও আলজেরিয়া জানত, ড্র করলেই দুদলের পথ খুলে যাবে। অস্ট্রিয়া রানার্সআপ হবে, আলজেরিয়া সেরা তৃতীয় দলের একটি হিসেবে টিকে যাবে। সেই কারণেই ম্যাচের আগে ১৯৮২ সালের গিজনের স্মৃতি ফিরে এসেছিল আলোচনায়। তবে মাঠে যা হলো, তা কোনোভাবেই নিস্তেজ ড্র ছিল না। বরং শেষ পর্যন্ত ম্যাচটি হয়ে উঠল গ্রুপ পর্বের অন্যতম নাটকীয় লড়াই।
অস্ট্রিয়া এগিয়ে যায় ২৮ মিনিটে। ডেভিড আলাবার দারুণ পাস ধরে মার্কো আরনাউতোভিচ গোল করেন। শুরুতে কিছুটা ধীরগতির ম্যাচ তখনই বদলে যায়। কারণ এই ফল আলজেরিয়ার জন্য বিপজ্জনক ছিল। হারলে তাদের বিদায় নিতে হতো।
আলজেরিয়ার জবাব আসে প্রথমার্ধের শেষ দিকে। ৪৫ মিনিটে রাফিক বেলঘালি দুর্দান্ত ব্যক্তিগত দক্ষতায় সমতা ফেরান। ডান দিক থেকে বল পেয়ে কাট ইন করে কয়েকজনকে ফাঁকি দিয়ে নিখুঁত ফিনিশিং করেন তিনি। বিরতিতে ম্যাচ ১-১।
দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতে অস্ট্রিয়া আবার এগিয়ে যায়। ৫৪ মিনিটে কনরাড লাইমারের দৌড় ও পাস থেকে মার্সেল সাবিৎসার গোল করেন। আলজেরিয়া আবার চাপে পড়ে। কিন্তু এই ম্যাচে পিছিয়ে পড়া যেন তাদের থামাতে পারেনি। ৬০ মিনিটে রিয়াদ মাহরেজ সমতা ফেরান। বাম দিকের আক্রমণ থেকে বল আসে দূরের পোস্টে, সেখান থেকে সহজ ফিনিশিংয়ে স্কোরলাইন ২-২ করেন আলজেরিয়া অধিনায়ক।
এরপর ম্যাচের গতি কিছুটা কমে আসে। দুই দলই জানত, ২-২ ড্র তাদের জন্য যথেষ্ট। আক্রমণে ঝুঁকি কমে যায়, বল পায়ে সতর্কতা বাড়ে। কিন্তু বিশ্বকাপের শেষ রাত এমন সহজ হিসাব মেনে নেয়নি।
যোগ করা সময়ে মাহরেজ আবার গোল করেন। ৯০+৪ মিনিটে তার গোল আলজেরিয়াকে ৩-২ ব্যবধানে এগিয়ে দেয়। সঙ্গে সঙ্গে বদলে যায় নকআউটের হিসাব। ওই মুহূর্তে অস্ট্রিয়া হারের পথে, আলজেরিয়া জয়ের পথে, আর ইরান সেরা তৃতীয় দলের হিসাব থেকে শেষ ৩২-এ ওঠার আশা দেখতে শুরু করে।
ইরানের জন্য সেটি ছিল ক্ষণিকের আনন্দ। আগের ম্যাচে মিসরের সঙ্গে ১-১ ড্র করে তারা অপেক্ষায় ছিল অন্য গ্রুপের ফলের দিকে। মাহরেজের গোলের পর মনে হচ্ছিল, সেই অপেক্ষা সফল হতে যাচ্ছে। কিন্তু আনন্দ টিকল মাত্র কয়েক মিনিট।
৯০+৫ মিনিটে আসে ম্যাচের শেষ বড় মোড়। বদলি হিসেবে নামা সাসা কালাইদজিচ হেডে গোল করে অস্ট্রিয়াকে ৩-৩ সমতায় ফেরান। সেই গোলেই বদলে যায় সব হিসাব। অস্ট্রিয়া হার এড়ায়, রানার্সআপ হিসেবে শেষ ৩২ নিশ্চিত করে। আলজেরিয়াও ৪ পয়েন্ট নিয়ে সেরা তৃতীয় দলের একটি হিসেবে টিকে যায়। আর ইরানের স্বপ্ন শেষ হয়ে যায় সেখানেই।
এই ড্রয়ে গ্রুপ ‘জে’ শেষ হলো আর্জেন্টিনার ৯ পয়েন্ট, অস্ট্রিয়া ৪, আলজেরিয়া ৪ এবং জর্ডান শূন্য পয়েন্টে। গোল ব্যবধান ও টাইব্রেকারের হিসাব শেষে অস্ট্রিয়া দ্বিতীয়, আলজেরিয়া তৃতীয়। শেষ ৩২-এ অস্ট্রিয়ার প্রতিপক্ষ স্পেন, আর আলজেরিয়া খেলবে সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে।
আলজেরিয়ার জন্য রাতটি ছিল স্বস্তির। তারা একাধিকবার পিছিয়ে পড়েও ফিরেছে, মাহরেজ জোড়া গোল করেছেন, শেষ পর্যন্ত নকআউট নিশ্চিত হয়েছে। অস্ট্রিয়ার জন্যও একই কথা। শেষ মুহূর্তে কালাইদজিচের গোল তাদের বড় বিপর্যয় থেকে বাঁচিয়েছে।
কিন্তু ইরানের জন্য গল্পটি নির্মম। কয়েক মিনিটের জন্য তারা নকআউটের খুব কাছে ছিল। মাহরেজের গোল তাদের দরজা খুলে দিয়েছিল, কালাইদজিচের হেড সেটি বন্ধ করে দেয়। বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্ব এমনই, কখনো নিজের ম্যাচ শেষ হয়ে যাওয়ার পরও ভাগ্য লেখা হয় অন্য মাঠে।
অস্ট্রিয়া-আলজেরিয়া ম্যাচ তাই শুধু ৩-৩ ড্র নয়। এটি ছিল নকআউটের দরজা খোলা-বন্ধ হওয়ার নাটক। যোগ করা সময়ে ইরান স্বপ্ন দেখেছিল, শেষ হেডে সেই স্বপ্ন ভেঙে যায়।






