উজবেকিস্তানকে হারিয়ে ইতিহাস কঙ্গোর

বিশ্বকাপে কঙ্গোর স্বপ্ন সত্যি হলো নাটকীয় প্রত্যাবর্তনে। গ্রুপ ‘কে’-এর শেষ ম্যাচে উজবেকিস্তানের বিপক্ষে প্রথমার্ধে পিছিয়ে পড়েও ৩-১ গোলে জিতেছে আফ্রিকার দলটি। এই জয়ে ইতিহাস গড়ে শেষ ৩২-এ উঠেছে তারা। বিশ্বকাপে এটি কঙ্গোর প্রথম জয়, আর নকআউট পর্বে প্রথমবারের মতো জায়গা পাওয়া।
আটলান্টায় ম্যাচের শুরুটা কঙ্গোর জন্য ছিল ধাক্কার। ১০ মিনিটে উজবেকিস্তানকে এগিয়ে দেন এলদোর শোমুরোদভ। আব্বোসবেক ফায়জুল্লায়েভের বুদ্ধিদীপ্ত ফ্লিক ধরে গতিতে কঙ্গোর রক্ষণ ভেঙে ঢুকে পড়েন উজবেক অধিনায়ক। কঠিন কোণ থেকেও তিনি গোলরক্ষক লায়নেল এমপাসিকে পরাস্ত করেন।
এর আগেই উজবেকিস্তান ৩০ সেকেন্ডের মধ্যে গোলের আনন্দ পেয়েছিল, কিন্তু শোমুরোদভের সেই প্রচেষ্টা অফসাইডে বাতিল হয়। এরপর বৈধ গোল পেয়ে তারা দীর্ঘ সময় ম্যাচে এগিয়ে ছিল। প্রথমার্ধ শেষে মনে হচ্ছিল, অভিষেক বিশ্বকাপে প্রথম পয়েন্ট বা জয় পাওয়ার পথে আছে উজবেকরা।
কিন্তু বিরতির পর ম্যাচের গল্প বদলে দেয় ডিআর কঙ্গো। বলের দখল, আক্রমণের চাপ এবং ধারাবাহিক সুযোগ তৈরি করে তারা উজবেকিস্তানকে পেছনে ঠেলে দেয়। তবে ফিনিশিংয়ের ব্যর্থতায় সময় যত এগোচ্ছিল, ততই চাপ বাড়ছিল সেবাস্তিয়েন দেসাবরের দলের ওপর।
ডিআর কঙ্গো একবার সমতাও ফিরিয়েছিল, কিন্তু নাথানায়েল এমবুকুর জোরালো শট ভিএআরে বাতিল হয়। আক্রমণ তৈরির পথে তার হাত প্রতিপক্ষ ডিফেন্ডার শেরজোদ নাসরুল্লায়েভের মুখে লাগে বলে রেফারি মনিটরে দেখে গোলটি বাতিল করেন। এতে কঙ্গোর অপেক্ষা আরও দীর্ঘ হয়।
শেষ পর্যন্ত ম্যাচের মোড় ঘোরে পেনাল্টিতে। আব্দুকোদির খুসানভ বক্সে ইয়োয়ান উইসাকে ফাউল করলে পেনাল্টি পায় ডিআর কঙ্গো। উইসা নিজেই স্পটকিক নিতে এগিয়ে আসেন। শান্ত মাথায় গোলরক্ষক আবদুভোহিদ নেমাতভকে ভুল দিকে পাঠিয়ে ৬৮ মিনিটে সমতা ফেরান তিনি।
সমতার পর কঙ্গোর খেলায় নতুন প্রাণ আসে। ৭৮ মিনিটে তারা এগিয়ে যায়। মেশাক এলিয়ার শট ব্লক হয়ে উজবেক গোলমুখে ঘুরে গেলে ফিস্তন মায়েলে দ্রুত প্রতিক্রিয়া দেখান। বদলি স্ট্রাইকার ঠান্ডা মাথায় বল তুলে দেন গোলরক্ষকের মাথার ওপর দিয়ে। স্কোরলাইন হয়ে যায় ২-১।
উজবেকিস্তানের তখন আর আগের সেই নিয়ন্ত্রণ ছিল না। প্রথমার্ধে এগিয়ে থাকার পর দ্বিতীয়ার্ধে তারা অনেকটাই রক্ষণে গুটিয়ে যায়। সেই সুযোগে ডিআর কঙ্গো ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নেয় এবং শেষ পর্যন্ত আরও একটি গোল যোগ করে জয় নিশ্চিত করে।
যোগ করা সময়ে নিজের দ্বিতীয় গোল করেন উইসা। বক্সের প্রান্তে সময় ও জায়গা পেয়ে তিনি নিচু শটে বল জালে পাঠান। গোলের পর পুরো মাঠজুড়ে দৌড়ে উদ্যাপন করেন কঙ্গোর নায়ক। পেছনে ছুটছিলেন উচ্ছ্বসিত সতীর্থরা। দৃশ্যটি যেন ডিআর কঙ্গোর দীর্ঘ অপেক্ষার প্রতীক হয়ে থাকে।
এই জয়ে গ্রুপ ‘কে’-তে তৃতীয় হয়ে শেষ ৩২ নিশ্চিত করেছে ডিআর কঙ্গো। কলম্বিয়া গ্রুপসেরা, পর্তুগাল রানার্সআপ। ৪ পয়েন্ট নিয়ে সেরা তৃতীয় দলের একটি হিসেবে নকআউটে উঠেছে কঙ্গো।
শেষ ৩২-এ ডিআর কঙ্গোর সামনে ইংল্যান্ড। ম্যাচটি হবে আটলান্টাতেই। অর্থাৎ ঐতিহাসিক জয় যেখানে এসেছে, সেখানেই আরও বড় পরীক্ষায় নামবে তারা।
উজবেকিস্তানের জন্য আসরটি শেষ হলো হতাশায়। প্রথমবার বিশ্বকাপে এসে তিন ম্যাচের সবকটিই হারল তারা। কলম্বিয়া ও পর্তুগালের বিপক্ষে হারের পর ডিআর কঙ্গোর বিপক্ষে এগিয়ে গিয়েও জয় বা পয়েন্ট ধরে রাখতে পারল না ফাবিও কানাভারোর দল।
ডিআর কঙ্গোর জন্য গল্পটি একেবারেই আলাদা। ১৯৭৪ সালে জাইর নামে বিশ্বকাপে খেলেছিল দেশটি। সেই স্মৃতি ছিল কষ্টের। ৫২ বছর পর ফিরে এসে তারা শুধু অংশ নেয়নি, প্রথম জয় পেয়েছে, নকআউটে উঠেছে এবং নিজেদের ফুটবল ইতিহাসের নতুন অধ্যায় লিখেছে।
কঙ্গোর এই জয় তাই শুধু স্কোরলাইনের গল্প নয়। এটি অপেক্ষা, বিশ্বাস এবং প্রত্যাবর্তনের গল্প। পিছিয়ে পড়ে, গোল বাতিলের ধাক্কা খেয়ে, চাপের মধ্যে থেকেও তারা ফিরেছে। আর সেই প্রত্যাবর্তনেই সত্যি হয়েছে ডিআর কঙ্গোর বিশ্বকাপ স্বপ্ন।





