আলহাম্ব্রা: লাল দুর্গে বন্দি মুসলিম আন্দালুসিয়ার গৌরবগাথা

আফছার হোসাইন
আলহাম্ব্রা: লাল দুর্গে বন্দি মুসলিম আন্দালুসিয়ার গৌরবগাথা
সাবিকা পাহাড়ের চূড়ায় শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে দাঁড়িয়ে থাকা অনন্য স্থাপত্য আলহাম্ব্রা। ছবি: এশিয়া পোস্ট

স্পেনের দক্ষিণাঞ্চলের আন্দালুসিয়ার ঐতিহাসিক শহর গ্রানাডা। দূরে তুষারঢাকা সিয়েরা নেভাদা পর্বতমালা। আর তারই পাদদেশে সাবিকা পাহাড়ের চূড়ায় শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে দাঁড়িয়ে আছে এক অনন্য স্থাপত্য, আলহাম্ব্রা। আরবি ‘আল-হামরা’ শব্দের অর্থ ‘লাল দুর্গ’। লালচে পাথর ও মাটির দেয়ালের কারণেই এই নাম। সূর্যাস্তের শেষ আলো যখন প্রাসাদের গায়ে এসে পড়ে, তখন মনে হয়, ইতিহাস যেন রক্তিম আভায় নিজের স্মৃতিগুলোকে আবারও জীবন্ত করে তুলেছে।

আলহাম্ব্রা কেবল একটি প্রাসাদ নয়। এটি মুসলিম আন্দালুসিয়ার জ্ঞান-বিজ্ঞান, স্থাপত্য, শিল্প, সাহিত্য, প্রকৌশল ও আধ্যাত্মিকতার এক অনন্য দলিল। এমন এক সভ্যতার প্রতীক, যে সভ্যতা একসময় ইউরোপের অন্ধকার যুগে জ্ঞানের আলো ছড়িয়েছিল। যার প্রভাব আধুনিক শিক্ষা, বিজ্ঞান, নগর পরিকল্পনা ও সংস্কৃতিতেও আজ স্পষ্ট।

প্রাসাদের ভেতরে প্রবেশ করলেই মনে হয়, সময় যেন কয়েক শতাব্দী পেছনে ফিরে গেছে। ঝরনার স্বচ্ছ জল, কমলা ও খেজুরগাছে ঘেরা বাগান, মার্বেলের স্তম্ভ, সূক্ষ্ম কারুকাজে অলংকৃত দেয়াল, আরবি ক্যালিগ্রাফি এবং আলো-ছায়ার অপূর্ব মেলবন্ধন দর্শনার্থীকে নিয়ে যায় নাসরিদ সুলতানদের রাজদরবারে। মনে হয়, এইমাত্র হয়তো কোনো সুলতান সভা শেষ করে বাগানের পথে হেঁটে গেলেন।

ইতিহাস ঘেঁটে জানা যায়, ১২৩৮ সালে নাসরিদ রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা সুলতান মুহাম্মদ প্রথম আলহাম্ব্রার নির্মাণ শুরু করেন। পরবর্তী দেড় শতাব্দীতে তার উত্তরসূরিরা এটিকে বিশ্বের অন্যতম নান্দনিক রাজপ্রাসাদে রূপ দেন। এটি শুধু রাজপরিবারের আবাস ছিল না। প্রশাসন, সামরিক প্রতিরক্ষা, শিক্ষা, ধর্মীয় কর্মকাণ্ড ও সংস্কৃতিচর্চার এক পূর্ণাঙ্গ নগরী হিসেবেও ব্যবহৃত হতো।

আলহাম্ব্রার দেয়ালে অসংখ্য আরবি অলংকরণ ও ক্যালিগ্রাফির মধ্যে সবচেয়ে বেশি দেখা যায় একটি বাক্য, ‘লা গালিবা ইল্লাল্লাহ’। অর্থ, ‘আল্লাহ ছাড়া কোনো বিজয়ী নেই’। নাসরিদ শাসকদের এই মূলমন্ত্র শত শতবার খোদাই করা হয়েছে প্রাসাদের দেয়াল, খিলান ও স্তম্ভে। এটি শুধু ধর্মীয় বিশ্বাসের প্রকাশ নয়, বরং তাদের রাজনৈতিক দর্শন ও রাষ্ট্রীয় পরিচয়েরও প্রতীক।

আলহাম্ব্রার প্রতিটি অংশে ইসলামি শিল্পকলার উৎকর্ষ ফুটে উঠেছে। জ্যামিতিক নকশা, আরাবেস্ক অলংকরণ, কোরআনের আয়াত, প্লাস্টারের সূক্ষ্ম কারুকাজ এবং প্রকৃতির সঙ্গে স্থাপত্যের নিখুঁত সমন্বয় একে বিশ্বস্থাপত্যের অনন্য নিদর্শনে পরিণত করেছে।

প্রাসাদের সবচেয়ে বিখ্যাত অংশ কোর্ট অব দ্য লায়ন্স। ১২টি মার্বেলের সিংহের ওপর দাঁড়ানো ফোয়ারাটি শুধু নান্দনিক সৌন্দর্যের প্রতীক নয়, মধ্যযুগীয় জলপ্রকৌশলেরও এক অসাধারণ উদাহরণ। পরিকল্পিত পানিপ্রবাহ পুরো প্রাসাদে শীতলতা ও ভারসাম্য বজায় রাখত। আধুনিক প্রযুক্তি ছাড়াই এমন প্রকৌশল আজও বিশেষজ্ঞদের বিস্মিত করে।

এ ছাড়া কোমারেস প্রাসাদ, হল অব দ্য অ্যাম্বাসেডরস, হল অব দ্য টু সিস্টার্স এবং জেনারালাইফের বাগান আলহাম্ব্রাকে বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ রাজপ্রাসাদ কমপ্লেক্সে পরিণত করেছে। বিশেষ করে জেনারালাইফে হাঁটলে মনে হয়, প্রকৃতি ও মানুষের সৃষ্টিশীলতা যেন একাকার হয়ে গেছে।

সিয়েরা নেভাদা পর্বতমালা থেকে কয়েক কিলোমিটার দীর্ঘ বিশেষ খালের মাধ্যমে পানি এনে প্রাসাদের ঝরনা, ফোয়ারা, বাগান ও আবাসিক এলাকায় সরবরাহ করা হতো। সেই সময়ের প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতার কথা বিবেচনা করলে এই জলব্যবস্থা সত্যিই বিস্ময়কর।

১৪৯২ সালে ইতিহাসের মোড় ঘুরে যায়। গ্রানাডার শেষ মুসলিম শাসক সুলতান মুহাম্মদ দ্বাদশ, যিনি বোয়াবদিল নামে পরিচিত, ক্যাথলিক সম্রাট দ্বিতীয় ফের্দিনান্দ ও রানি ইসাবেলার কাছে আত্মসমর্পণ করেন। এর মধ্য দিয়ে আইবেরীয় উপদ্বীপে প্রায় আট শতকের মুসলিম শাসনের অবসান ঘটে।

জনশ্রুতি আছে, গ্রানাডা ছেড়ে যাওয়ার সময় বোয়াবদিল শেষবারের মতো আলহাম্ব্রার দিকে তাকিয়ে অশ্রুসিক্ত হয়েছিলেন। তার সেই দীর্ঘশ্বাসের স্মৃতিতে পাহাড়টির নাম হয় ‘এল সুস্পিরো দেল মোরো’, অর্থাৎ ‘মুরের দীর্ঘশ্বাস’। ইতিহাসবিদদের মধ্যে এ ঘটনা নিয়ে মতভেদ থাকলেও, আন্দালুসিয়ার পতনের প্রতীক হিসেবে এই কাহিনি আজও মানুষের আবেগকে স্পর্শ করে।

খ্রিস্টান শাসন প্রতিষ্ঠার পরও সৌভাগ্যক্রমে আলহাম্ব্রার মূল ইসলামি স্থাপত্যের বড় অংশ অক্ষত থাকে। ১৯৮৪ সালে ইউনেস্কো আলহাম্ব্রা, জেনারালাইফ ও আলবাইসিন এলাকাকে বিশ্ব ঐতিহ্যের মর্যাদা দেয়। বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে প্রতিবছর লাখো পর্যটক এই স্থাপত্য দেখতে গ্রানাডায় ভিড় করেন। সংরক্ষণের স্বার্থে প্রতিদিন নির্দিষ্টসংখ্যক দর্শনার্থীকেই প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়।

আলহাম্ব্রা শুধু অতীতের একটি রাজপ্রাসাদ নয়। এটি একটি সভ্যতার দর্শন। এটি মনে করিয়ে দেয়, কোনো জাতির প্রকৃত শক্তি শুধু সামরিক ক্ষমতায় নয়। জ্ঞান, বিজ্ঞান, শিল্প, সাহিত্য, প্রকৌশল, নান্দনিকতা ও সহনশীলতার সমন্বয়ই একটি সভ্যতাকে ইতিহাসে অমর করে রাখে।

আজও আলহাম্ব্রার লাল দেয়াল, নীরব করিডর, আরবি ক্যালিগ্রাফি, ঝরনার সুর আর ফুলে ভরা বাগান যেন নিঃশব্দে বলে যায়, ক্ষমতা ক্ষণস্থায়ী; কিন্তু জ্ঞান, সৌন্দর্য ও সংস্কৃতির উত্তরাধিকার চিরন্তন।