অভিন্ন ভবিষ্যৎ সম্পর্ক গড়ে তোলার বিষয়ে একমত বাংলাদেশ-চীন

বাণিজ্য, অবকাঠামো, প্রতিরক্ষা, যোগাযোগ এবং আঞ্চলিক সহযোগিতার পাশাপাশি দ্বিপাক্ষিক অংশীদারত্বকে আরও উচ্চ স্তরে উন্নীত করার ঘোষণা দিয়েছে বাংলাদেশ ও চীন। এদিকে ব্রিকস ও সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশনের (এসসিও) অংশীদার সদস্য হওয়ার আবেদনে বাংলাদেশকে সমর্থন দেওয়ার ঘোষণা দেয় চীন। একই সঙ্গে দুই দেশ তাদের বিদ্যমান সমন্বিত কৌশলগত সহযোগিতা অংশীদারত্বকে আরও উন্নীত করে নতুন যুগে অভিন্ন ভবিষ্যতের সম্পর্ক গড়ে তোলার বিষয়ে একমত হয়েছে। এটি দুই দেশ ও জনগণের জন্য আরও বেশি সুফল বয়ে আনবে।
এ ছাড়া বৃহত্তর আঞ্চলিক যোগাযোগ বৃদ্ধির লক্ষ্যে ‘চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক করিডোর’ গড়ে তোলার প্রস্তাব দিয়েছে বেইজিং।
শুক্রবার (২৬ জুন) প্রকাশিত চীন ও বাংলাদেশের যৌথ বিবৃতিতে এই তথ্য জানানো হয়।
বিবৃতিতে বলা হয়, চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াংয়ের আমন্ত্রণে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান গত ২২ থেকে ২৬ জুন পর্যন্ত চীন সফর করেন। সফরকালে তিনি দালিয়ানে অনুষ্ঠিত সামার দাভোস সম্মেলন ২০২৬-এ অংশ নেন।
সফরের সময় চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠক করেন। এ ছাড়া প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াংয়ের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক বৈঠক এবং ন্যাশনাল পিপলস কংগ্রেসের স্থায়ী কমিটির চেয়ারম্যান ঝাও লেজির সঙ্গে সাক্ষাৎ অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকগুলোতে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা করে বিস্তৃত ঐকমত্যে পৌঁছায় দুই দেশ।
এই সফরের অন্যতম প্রধান অর্জনগুলোর মধ্যে রয়েছে তিস্তা নদী সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্পে চীনের সমর্থন, ব্রিকসে যোগদানে বাংলাদেশের আকাঙ্ক্ষা এবং সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার (এসসিও) অংশীদার হওয়ার প্রচেষ্টায় বেইজিংয়ের জোরালো সমর্থন। এ ছাড়া নতুন কৌশলগত সংলাপ ব্যবস্থা চালু এবং বিনিয়োগ, বন্দর, শিক্ষা ও জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় সহযোগিতা আরও গভীর করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।
যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়, ১৯৭৫ সালে কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার পর থেকে দুই দেশের রাজনৈতিক পারস্পরিক আস্থা, ঐতিহ্যগত বন্ধুত্ব এবং বাস্তবভিত্তিক সহযোগিতা ধারাবাহিকভাবে জোরদার হয়েছে।
চীন চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচন ও নতুন সরকারের দায়িত্ব গ্রহণকে অভিনন্দন জানিয়ে সরকারের শাসনব্যবস্থার প্রতি সমর্থন জানায়। একই সঙ্গে ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ নীতি বাস্তবায়নের প্রশংসা করে। অন্যদিকে বাংলাদেশ মনে করে, চীনের ১৫তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা বাংলাদেশের জন্য নতুন উন্নয়ন সুযোগ সৃষ্টি করবে।
বাংলাদেশ-চীন উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগ আরও বাড়ানো, রাষ্ট্র পরিচালনার অভিজ্ঞতা বিনিময় এবং সরকার, আইনসভা ও রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সহযোগিতা জোরদারের বিষয়েও একমত হয়েছে। পাশাপাশি পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ে কৌশলগত সংলাপ এবং কূটনীতি ও প্রতিরক্ষা বিষয়ে ‘২+২’ সংলাপ ব্যবস্থা চালুর সম্ভাবনা অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
উভয় দেশ একে অপরের সার্বভৌমত্ব, স্বাধীনতা, ভৌগোলিক অখণ্ডতা এবং জাতীয় স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে দৃঢ় সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছে।
বিবৃতিতে বলা হয়, তারেক রহমান চীনকে একটি মহান দেশ হিসেবে উল্লেখ করে বলেছেন, বাংলাদেশের পররাষ্ট্র নীতিতে চীন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে রয়েছে এবং চীন বাংলাদেশের জন্য মূল্যবান ও বিশ্বস্ত অংশীদার। দুই দেশের ভবিষ্যৎ অংশীদারত্বের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ও চীনের জনগণের মধ্যকার সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় উন্নীত করায় তিনি সন্তোষ প্রকাশ করেন।
অন্যদিকে চীন বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, ভৌগোলিক অখণ্ডতা এবং জাতীয় বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ উন্নয়নের পথ অনুসরণের অধিকারের প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছে।
প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং উল্লেখ করেন, চীন সবসময়ই বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে এসেছে এবং বাংলাদেশের জনগণের প্রতি সুপ্রতিবেশীসুলভ ও বন্ধুত্বের নীতিতে অবিচল রয়েছে।
চীনা প্রেসিডেন্ট বলেন, 'বিশ্বের পরিস্থিতি যতই পরিবর্তন হোক না কেন, চীন-বাংলাদেশ বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের সামগ্রিক দিকনির্দেশের প্রতি চীনের প্রতিশ্রুতি কখনো নড়বড়ে হবে না এবং চীন সবসময় বাংলাদেশের নির্ভরযোগ্য ভালো বন্ধু, ভালো প্রতিবেশী ও ভালো অংশীদার হয়ে থাকবে।'
তিনি আরও বলেন, 'চীন বাংলাদেশের সঙ্গে রাষ্ট্রীয়কাজের অভিজ্ঞতা বিনিময় বৃদ্ধি, সব স্তরে সম্পর্ক উন্নত করা, কৌশলগত যোগাযোগ গভীর করা, রাজনৈতিক পারস্পরিক বিশ্বাস জোরদার করা এবং দুই দেশের নিজ নিজ মূল স্বার্থ ও প্রধান উদ্বেগের বিষয়গুলোতে একে অপরকে সমর্থন অব্যাহত রাখতে প্রস্তুত। নিজ দেশের উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে চীন প্রতিবেশী দেশগুলোতে নতুন নতুন সুযোগ ও গতিশীলতা এনে দিতে কাজ অব্যাহত রাখবে।’
দুই দেশ বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই) কাঠামোর আওতায় উচ্চমানের সহযোগিতা জোরদার এবং উন্নয়ন পরিকল্পনার মধ্যে সমন্বয় বৃদ্ধির বিষয়ে একমত হয়েছে।
চীন বাংলাদেশের শিল্পায়ন, কৃষির আধুনিকায়ন, সহনশীলতা বৃদ্ধি এবং বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্পের পাশাপাশি জনকল্যাণমূলক ক্ষুদ্র প্রকল্প বাস্তবায়নে সহায়তা অব্যাহত রাখার আশ্বাস দিয়েছে।
বাণিজ্য, ই-কমার্স, শিল্প ও সরবরাহ শৃঙ্খল এবং বিনিয়োগ সহযোগিতা জোরদার করারও সিদ্ধান্ত হয়েছে। বাংলাদেশকে শতভাগ শুল্কমুক্ত বাজার সুবিধা দেওয়ার জন্য চীনের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছে ঢাকা। একই সঙ্গে বাংলাদেশে বিনিয়োগে চীনা প্রতিষ্ঠানের জন্য অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
দুই দেশ মোংলা বন্দর আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণ প্রকল্প এবং চট্টগ্রামে চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চল এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ে একমত হয়েছে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, তথ্য ও যোগাযোগ, সবুজ জ্বালানি, সৌর প্রযুক্তি, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা এবং আঞ্চলিক সংযোগ বৃদ্ধিতেও সহযোগিতা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপনের নতুন সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখা হবে। সমন্বিত পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা, পানি পরিকল্পনা, বন্যা পূর্বাভাস, নদী খনন, বন্যা নিয়ন্ত্রণ এবং প্রযুক্তি বিনিময়ে সহযোগিতা আরও জোরদারের বিষয়ে একমত হয়েছে দুই দেশ।
চীন জানিয়েছে, তিস্তা নদীর সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্পে নিজেদের সক্ষমতার সর্বোচ্চ পর্যায়ে সহায়তা দেবে। প্রকল্পের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা দ্রুত শেষ করতে দুই দেশের বিশেষজ্ঞদের যৌথভাবে কাজ করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। পাশাপাশি সামুদ্রিক বিষয়েও সহযোগিতা জোরদার করা হবে।
প্রতিরক্ষা খাতে সফর, প্রশিক্ষণ ও অভিজ্ঞতা বিনিময়সহ সহযোগিতা বাড়ানো এবং জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে পারস্পরিক সমন্বয় বজায় রাখার বিষয়েও একমত হয়েছে দুই দেশ।
২০২৫ সালে কূটনৈতিক সম্পর্কের ৫০ বছর পূর্তি এবং ‘চীন-বাংলাদেশ জনসম্পর্ক বর্ষ’ সফলভাবে উদ্যাপনের প্রশংসা করে দুই দেশ। গণমাধ্যম, থিংকট্যাংক, শিক্ষা, চলচ্চিত্র, প্রকাশনা, যুব, ক্রীড়া ও সংস্কৃতিতে সহযোগিতা আরও জোরদার করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
চীন বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য উচ্চশিক্ষার সুযোগ অব্যাহত রাখবে। পাশাপাশি জনস্বাস্থ্য, ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসা, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং বিশ্ববিদ্যালয় ও কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানো হবে। ইউনান প্রদেশসহ চীনের বিভিন্ন স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে স্বাস্থ্য খাতে সহযোগিতাকেও স্বাগত জানিয়েছে বাংলাদেশ।
বাংলাদেশ মানবজাতির অভিন্ন ভবিষ্যৎ গঠনের লক্ষ্যে প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের প্রস্তাবিত ভিশন এবং বিভিন্ন বৈশ্বিক উদ্যোগের প্রতি সমর্থন জানিয়ে সেগুলোর বাস্তবায়নে চীনের সঙ্গে কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করেছে।
অন্যদিকে চীন জাতিসংঘসহ বিভিন্ন বহুপক্ষীয় প্রতিষ্ঠানে বাংলাদেশের আরও বড় ভূমিকা পালনের প্রতি সমর্থন জানায়। পাশাপাশি ব্রিকসে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ এবং সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশনের অংশীদার হওয়ার আবেদনের প্রতিও সমর্থন ঘোষণা করে।
দুই দেশ জাতিসংঘভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা, আন্তর্জাতিক আইন এবং জাতিসংঘ সনদের নীতিমালা সমুন্নত রাখার পাশাপাশি সমতা ও বহুমেরুকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থা এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক বৈশ্বিক অর্থনীতি গড়ে তোলার পক্ষে মত দেয়।
এ ছাড়া দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা, কায়রো ঘোষণা, পটসড্যাম ঘোষণা এবং জাতিসংঘ সনদের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত আন্তর্জাতিক শৃঙ্খলা সমুন্নত রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়। ফ্যাসিবাদ ও সামরিকবাদের পুনরুত্থানের যেকোনো প্রচেষ্টারও বিরোধিতা করে দুই দেশ।
রাখাইন থেকে বাস্তুচ্যুত হয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া জনগোষ্ঠীর সংকট সমাধানে চীনের গঠনমূলক ভূমিকার প্রশংসা করেছে বাংলাদেশ। চীন মানবিক সহায়তা প্রদানের জন্য বাংলাদেশের প্রশংসা করে এবং বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ আলোচনার মাধ্যমে পারস্পরিক গ্রহণযোগ্য সমাধান খুঁজে বের করার পক্ষে সমর্থন জানায়। এই প্রক্রিয়ায় চীন ভবিষ্যতেও সহযোগিতা অব্যাহত রাখবে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
সফরকালে উন্নয়ন সহযোগিতা, মানবসম্পদ উন্নয়ন, কৃষি, শিক্ষা, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ এবং গণমাধ্যমসহ বিভিন্ন খাতে একাধিক সহযোগিতা চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে।
সফরের শেষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চীন সরকার ও জনগণের প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানান এবং সুবিধাজনক সময়ে বাংলাদেশের সফরের জন্য চীনের শীর্ষ নেতৃত্বকে আমন্ত্রণ জানান।







