আনন্দ স্কুল প্রকল্প/অনিয়ম-অদক্ষতায় ফেরত গেল ২২ কোটি টাকার বৈদেশিক সাহায্য

অনিয়ম-অদক্ষতায় ফেরত গেল ২২ কোটি টাকার বৈদেশিক সাহায্য
ছবি : গ্রাফিকস

দরিদ্র ও ঝরে পড়া শিশুদের মূলধারায় ফেরাতে আনন্দ স্কুল প্রকল্প চালু করে সরকার। তবে মাঠপর্যায়ে লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে না পারায় এই প্রকল্পের প্রায় ১ দশমিক ৭৭ মিলিয়ন ডলারের বৈদেশিক সাহায্য ফেরত গেছে। বাংলাদেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ দাঁড়ায় ২১ কোটি ৮৯ লাখ এক হাজার ৫৬৪ টাকা।

পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) প্রভাব মূল্যায়ন সমীক্ষায় উঠে এসেছে এমন চিত্র। তথ্য সংগ্রহ ও খসড়া পর্যালোচনার পর গত জুনে চূড়ান্ত সমীক্ষা প্রতিবেদন তৈরি করে সংস্থাটি।

প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর ২০১৩ সালে রস্ক-২ বা ‘আনন্দ স্কুল’ প্রকল্প শুরু করে। ২০২১ সাল পর্যন্ত চলা এই প্রকল্পের লক্ষ্য ছিল গ্রামীণ অনগ্রসর এলাকা, শহুরে বস্তি ও রোহিঙ্গা শিবিরের সাড়ে ৭ লাখ শিশুকে প্রাথমিক শিক্ষার আওতায় নিয়ে আসা। তবে তদারকির অভাব, ভুয়া শিক্ষার্থী ও কর্মকর্তাদের আর্থিক অনিয়মে শেষ পর্যন্ত সরকারের উদ্দেশ্য ব্যাহত হয়।

প্রকল্পের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় সবচেয়ে গুরুতর অনিয়ম ধরা পড়েছে ভ্রমণ ভাতা উত্তোলনে। আইএমইডির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা কোনো প্রকৃত ভ্রমণ ছাড়াই ৩ লাখ ১০ হাজার টাকা কাল্পনিক ভ্রমণ ভাতা তুলে নিয়েছেন।

জ্বালানি তেল ও যাতায়াত ব্যয়ের ক্ষেত্রেও নির্ধারিত বাজেটের বাইরে বাড়তি ব্যয় দেখানো হয়েছে।

নিয়মবহির্ভূত ঋণ

প্রকল্পের তহবিল নিয়ে অনিয়ম হয়েছে উচ্চপর্যায়েও। নিয়ম অনুযায়ী, এক প্রকল্পের অর্থ অন্য প্রকল্পে ঋণ হিসেবে দেওয়ার সুযোগ নেই। তবে রস্ক-২ প্রকল্পের তহবিল থেকে বিধি লঙ্ঘন করে ১ কোটি টাকা ঋণ হিসেবে পিইডিপি-৩ প্রকল্পে স্থানান্তর করা হয়েছে।

এ ছাড়া প্রকল্পের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা হওয়া সুদের ৫০ লাখ ২৪ হাজার টাকা সরকারি কোষাগারে জমা না দিয়ে আত্মসাতের চেষ্টা হয়েছে। পাশাপাশি সোনালী ব্যাংকের সার্ভিস চার্জ থেকে ভ্যাট ও আয়কর যথাযথভাবে না কাটায় সরকার বড় অঙ্কের রাজস্ব হারিয়েছে।

কেনাকাটায় পিপিআর লঙ্ঘন

পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুলস (পিপিআর-২০০৮) না মেনে প্রকল্পের অনেক কেনাকাটা সম্পন্ন হয়েছে। আইডি কার্ড মুদ্রণ ও প্রশিক্ষণসামগ্রী কেনার ক্ষেত্রে উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতি অনুসরণ না করে প্রায় ১৮ লাখ ১৪ হাজার টাকা ব্যয় করা হয়েছে।

প্রকল্পের মেয়াদের শেষ মুহূর্তে অপ্রয়োজনীয়ভাবে ক্রয় পরামর্শক নিয়োগ করে আরও ১৯ লাখ ৬৪ হাজার টাকা অপচয় করা হয়। অডিট আপত্তিতে বলা হয়েছে, এই নিয়োগ প্রকল্পের লক্ষ্য অর্জনে কোনো ভূমিকা রাখেনি। বরং এটি ছিল অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার একটি কৌশল।

আনন্দ স্কুল

ভুয়া শিক্ষার্থী, ভূতুড়ে স্কুল

প্রকল্পে সবচেয়ে বড় দুর্নীতির ক্ষেত্র ছিল মাঠপর্যায়ের লার্নিং সেন্টার বা আনন্দ স্কুলগুলো। অনেক এলাকায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নিয়মিত শিক্ষার্থীদেরই আনন্দ স্কুলের শিক্ষার্থী হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

এই ভুয়া বা ভূতুড়ে শিক্ষার্থীদের নামে বছরের পর বছর ধরে সরকারের উপবৃত্তি ও বিনামূল্যে শিক্ষা উপকরণের অর্থ লোপাট করা হয়েছে। অনিয়ম চরম পর্যায়ে পৌঁছালে প্রকল্পের মেয়াদ থাকা অবস্থাতেই দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ৫৮১টি আনন্দ স্কুল বা লার্নিং সেন্টার বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয় কর্তৃপক্ষ।

বাস্তবে অস্তিত্ব নেই এমন স্কুলের নামেও বরাদ্দ উত্তোলনের বিষয়টি আইএমইডির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

কর্মকর্তাদের অদক্ষতার খেসারত

কর্মকর্তাদের অদক্ষতা ও ভুল পরিকল্পনায় হাতছাড়া হয়েছে বিপুল বৈদেশিক সাহায্য। লক্ষ্য পূরণ ও বরাদ্দকৃত তহবিল খরচ করতে না পারায় আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীকে ফেরত দিতে হয় ১ দশমিক ৭৭ মিলিয়ন ডলার।

সংস্কার ও নিয়োগে গরমিল

প্রকল্পের আওতায় ২০০টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় সংস্কারের লক্ষ্যমাত্রা ছিল। প্রকল্পের সমাপ্তি প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, ২০০টি স্কুলই সংস্কার করা হয়েছে। কিন্তু এ খাতে বরাদ্দকৃত ২২ কোটি ৫০ লাখ টাকার মধ্যে ব্যয় হয়েছে মাত্র ১৩ কোটি ৩১ লাখ ১৩ হাজার টাকা, যা মোট বরাদ্দের ৫৯ শতাংশ।

লক্ষ্যমাত্রা শতভাগ পূরণ হলে বরাদ্দের প্রায় ৪০ শতাংশ অর্থ কেন অব্যয়িত থাকল, তা নিয়ে প্রতিবেদনে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। এটি কাজের গুণগত মান বা লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের তথ্যের সত্যতা নিয়ে সংশয় তৈরি করেছে।

তদারকি শক্তিশালী করতে ১ হাজার ২০০ জন পুল শিক্ষক নিয়োগের লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও নিয়োগ দেওয়া হয় মাত্র ৯২২ জনকে। প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ও লজিস্টিকস সংগ্রহের হার ছিল ৬২ দশমিক ৭১ শতাংশ।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, প্রকল্প শেষ হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট যানবাহন ও সরঞ্জাম কোথায় ও কীভাবে হস্তান্তর করা হয়েছে, তার সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য সমাপ্তি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি।

কোটি টাকার রাজস্ব ক্ষতি

সোনালী ব্যাংকের সার্ভিস চার্জ থেকে ভ্যাট ও আয়কর যথাযথভাবে না কাটায় সরকারের ১ কোটি ৬৫ লাখ ৩৮ হাজার ২৫০ টাকার রাজস্ব ক্ষতি হয়েছে।

প্রকল্প প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষায় কোনো বড় অনিয়ম ধরা পড়েনি। তবে বহিঃনিরীক্ষায় ভ্যাট-ট্যাক্স ফাঁকি, পিপিআর লঙ্ঘন এবং অতিরিক্ত অর্থ প্রদানের প্রমাণ মিলেছে।

প্রকল্পের উচ্চপর্যায়ের তদারকি কমিটি পিআইসি ও পিএসসি কয়টি সভা করেছে বা কী সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তার সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য প্রকল্প দপ্তর নিরীক্ষকদের সরবরাহ করতে পারেনি।


২৫ হাজার শিক্ষার্থীর প্রশিক্ষণ ছিল ‘দায়সারা’

প্রকল্পের আওতায় ২৫ হাজার শিক্ষার্থীকে কারিগরি প্রশিক্ষণ দেওয়া হলেও তা ছিল অনেকটাই দায়সারা। স্থানীয় বাজারের চাহিদার সঙ্গে প্রশিক্ষণের ট্রেডগুলোর কোনো মিল ছিল না।

অনেক প্রশিক্ষণ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনীয় আধুনিক সরঞ্জাম বা দক্ষ প্রশিক্ষক ছিল না। ফলে শিক্ষার্থীরা হাতে-কলমে কাজ শিখতে ব্যর্থ হয়েছে।

এনজিও নির্বাচনের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতার অভাব ছিল এবং অনেক ক্ষেত্রে প্রভাবশালীদের হস্তক্ষেপে অযোগ্য এনজিওকে দায়িত্ব দেওয়া হয়।

তদারকির দুর্বলতা

আইএমইডির প্রতিবেদনে এসব অনিয়মের মূলে তদারকির দুর্বলতাকে দায়ী করা হয়। প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার ১৫ মাস পরও এর সমাপ্তি প্রতিবেদন জমা দিতে না পারাকে বাস্তবায়নকারী সংস্থার প্রশাসনিক অযোগ্যতা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর শিক্ষার্থীদের ট্র্যাক করার বা তাদের পরবর্তী শিক্ষার খবর রাখার কোনো ডিজিটাল ব্যবস্থা রাখা হয়নি। ফলে হাজার হাজার শিশুর ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তায় পড়েছে।

এই আর্থিক অনিয়ম রোধে আইএমইডি ভবিষ্যতে এ ধরনের প্রকল্পে কঠোর ডিজিটাল ফিন্যান্সিয়াল ট্র্যাকিং ব্যবস্থা চালুর সুপারিশ করেছে। পাশাপাশি প্রতিটি শিক্ষার্থীর জন্য ইউনিক আইডি ব্যবহার করে সরাসরি উপবৃত্তি পৌঁছে দেওয়া এবং অডিট আপত্তিগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির তাগিদ দেওয়া হয়েছে।

সংশ্লিষ্টদের প্রতিক্রিয়া

প্রকল্পের সাবেক পরিচালক (পিডি) মো. দেলোয়ার হোসেন বর্তমানে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। অভিযোগের বিষয়ে কল করা হলে সাংবাদিক পরিচয় শুনে তিনি ব্যস্ত থাকার কথা জানান।

পরে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক শাহীনা ফেরদৌসির সঙ্গে যোগাযোগ করে এশিয়া পোস্ট। তবে তার দাবি, এখন পর্যন্ত তিনি এমন কোনো প্রতিবেদন বা নথিপত্র পাননি। হাতে পেলে সেটি বিশ্লেষণ করে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।