Advertisement

নদীকে ‘খাল’ বানিয়ে ফের খনন, ৫ বছরেই ৩৯ লাখ টাকার নতুন প্রকল্প

এশিয়া পোস্ট নিউজ, নীলফামারী
নদীকে ‘খাল’ বানিয়ে ফের খনন, ৫ বছরেই ৩৯ লাখ টাকার নতুন প্রকল্প
ছবি: এশিয়া পোস্ট

নীলফামারীর কিশোরগঞ্জ উপজেলার প্রবহমান ধাইজান নদী। মাত্র পাঁচ বছর আগে প্রায় আট কোটি টাকা ব্যয়ে পুনঃখনন করা হয়েছিল নদীটি। অথচ এবার সরকারি কাগজপত্রে নদীটিকে খাল হিসেবে দেখিয়ে নতুন করে খনন প্রকল্প বাস্তবায়নের অভিযোগ উঠেছে।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের ‘ইজিপিপি’ কর্মসূচির আওতায় ৩৯ লাখ টাকা ব্যয়ে চলছে এই কাজ। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, পুরো নদী বাদ দিয়ে মাত্র দেড় কিলোমিটার অংশে নামমাত্র খনন করা হচ্ছে। কাজ শেষ হওয়ার আগেই বিভিন্ন স্থানে পাড় ধসে পড়ছে। ফলে সরকারি অর্থ ব্যয় হলেও এর কোনো সুফল মিলবে না বলে আশঙ্কা করছেন নদীপাড়ের মানুষ।

পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্রে জানা যায়, জলঢাকা উপজেলার দড়িভিজা বিলাঞ্চল থেকে উৎপন্ন ধাইজান নদীটি কিশোরগঞ্জ হয়ে যমুনেশ্বর নদীতে গিয়ে মিলেছে। প্রায় ২৮ থেকে ২৯ কিলোমিটার দীর্ঘ এবং গড়ে ৫০ মিটার চওড়া নদীটি পাউবোর নথিভুক্ত একটি প্রবহমান নদী। জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন ও পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী, কোনো নদীকে ‘খাল’ হিসেবে রূপান্তর করার সুযোগ নেই। কিন্তু বর্তমান প্রকল্পের নথিতে ধাইজানকে খাল উল্লেখ করেই বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

পাউবো আরও জানায়, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে প্রায় আট কোটি টাকা ব্যয়ে তিনটি প্যাকেজে ধাইজান নদীর পুনঃখনন সম্পন্ন করা হয়। সে সময় বরাদ্দের পুরো অর্থ ব্যয় না হওয়ায় অবশিষ্ট টাকা সরকারি কোষাগারে ফেরত দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে একই নদীতে নতুন প্রকল্প নেওয়ায় প্রকল্পের যৌক্তিকতা ও পরিকল্পনা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

বর্তমানে কিশোরগঞ্জ উপজেলার পুটিমারী ইউনিয়নের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত নদীর মাত্র দেড় কিলোমিটার অংশে খননকাজ চলছে; বাকি অংশ রয়েছে আগের মতোই ভরাট। স্থানীয়দের দাবি, এভাবে বিচ্ছিন্নভাবে খনন করলে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ তৈরি হবে না। বরং মাঝখানে গভীর গর্ত তৈরি হওয়ায় নদীভাঙন ও জলাবদ্ধতার ঝুঁকি বাড়বে।

প্রকল্পের সীমাবদ্ধতার কথা স্বীকার করেছেন স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য ও প্রকল্প কমিটির সভাপতি জাহিদুল ইসলাম। তিনি বলেন, আমাদের অংশে প্রায় ১ হাজার ৫০০ মিটার খনন করা হচ্ছে। কিন্তু এর পেছনের চার থেকে পাঁচ কিলোমিটার অংশ খনন করা না হলে এই প্রকল্পের কোনো সুফল এলাকাবাসী পাবে না। সরকারের পক্ষ থেকে বাকি অংশ খননের উদ্যোগ না নিলে বর্তমান কাজ কার্যত অর্থহীন হয়ে পড়বে।

একই আশঙ্কার কথা জানান স্থানীয় বাসিন্দা ফরহাদ হোসেন। তিনি বলেন, একটি নদীর সামনের অংশ খনন করে পেছনের অংশ ভরাট রাখলে পানির প্রবাহ তৈরি হবে না। এতে খননের কোনো বাস্তব উপকার পাওয়া যাবে না।

করিমুল ইসলাম নামে অপর এক বাসিন্দা বলেন, দেড় কিলোমিটার খনন করে পেছনের অংশে পানি চলাচলের ব্যবস্থা না রাখলে, জমা পানির চাপেই নদীর পাড় ভেঙে যাবে। এতে লাভের চেয়ে ক্ষতিই বেশি হবে।

এদিকে শ্রমিক দিয়ে কাজ করানোর নিয়ম থাকলেও অধিকাংশ জায়গায় যন্ত্র (এক্সেভেটর) ব্যবহার করে নদীর তলদেশ কাটা হয়েছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। ফলে কাজ শেষ হওয়ার আগেই বিভিন্ন স্থানে পাড় ধসে পড়তে শুরু করেছে, যা প্রকল্পের স্থায়িত্বকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।

বিষয়টি নিয়ে সৈয়দপুর পানি উন্নয়ন বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী আখিনুজ্জামান বলেন, ধাইজান একটি প্রবহমান নদী এবং এর দৈর্ঘ্য প্রায় ২৮-২৯ কিলোমিটার। ২০১৯ সালে তিনটি প্যাকেজের মাধ্যমে নদীটির পুনঃখনন করা হয়েছিল। তখন বরাদ্দকৃত অর্থের চেয়ে কম ব্যয় হওয়ায় অবশিষ্ট টাকা সরকারি কোষাগারে ফেরত দেওয়া হয়।

পানি উন্নয়ন বোর্ড নদী হিসেবে স্বীকৃতি দিলেও জেলা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের বক্তব্য ভিন্ন। জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মনোয়ারুল ইসলাম বলেন, “ছোট ছোট নদীও কখনো কখনো খালের আওতায় বিবেচিত হতে পারে। সংশ্লিষ্টরা যে অংশে খনন প্রয়োজন মনে করেছেন, সেখানেই কাজ করা হচ্ছে। ধাইজানের নাম নদী হলেও এটিকে নদী বলে মনে করেন না বলেও জানান এই কর্মকর্তা।

প্রকল্পের অনুমোদন প্রসঙ্গে জানতে চাইলে কিশোরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আরিফুর রহমান বলেন, আমি যোগদানের আগেই প্রকল্পের কাগজপত্র ও মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন সম্পন্ন হয়েছিল। দায়িত্ব নেওয়ার পর কেবল কাজ শুরু হয়েছে।

একই নদীতে কয়েক বছরের ব্যবধানে ফের খনন প্রকল্প গ্রহণ এবং সরকারি নথিতে নদীকে ‘খাল’ হিসেবে উপস্থাপন—দুটি বিষয়ই গভীরভাবে তদন্তের দাবি রাখে বলে মনে করছেন বিজ্ঞ মহল।

নদী রক্ষা কমিশনের নীতিমালা, পানি উন্নয়ন বোর্ডের নথি এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগের প্রকল্পের মধ্যকার এই অসামঞ্জস্যতা দুটি সরকারি দপ্তরকে মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। স্থানীয়দের প্রত্যাশা, বিষয়টি নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে সরকারি অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে দ্রুত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।