এশিয়া পোস্টে সংবাদ প্রকাশের পর রাজশাহীর আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা বরখাস্ত

রাজশাহীর আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তার কার্যালয়ে ১৪৩ জন আউটসোর্সিং কর্মী নিয়োগে অনিয়ম, অসচ্ছতা এবং কোটি টাকার নিয়োগ বাণিজ্যের অভিযোগ নিয়ে ‘এশিয়া পোস্ট’-এ অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশের পর বরখাস্ত করা হয়েছে আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা মো. আনিছুর রহমানকে।
মঙ্গলবার (২১ জুলাই) সকালে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন রাজশাহীর আঞ্চলিক অতিরিক্ত নির্বাচন কর্মকর্তা জিয়াউর রহমান। তিনি জানান, আউটসোর্সিং পদ্ধতিতে কর্মচারী নিয়োগে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হওয়া এবং দায়িত্বহীনতার প্রমাণ পাওয়ায় নির্বাচন কমিশন সচিবালয় তাকে সাময়িক বরখাস্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
এর আগে সোমবার নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের সিনিয়র সচিব আখতার স্বাক্ষরিত এক প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, রাজশাহীর আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা মো. আনিছুর রহমানের (পরিচিতি নম্বর-১০৯০৫০০৪) বিরুদ্ধে আউটসোর্সিং পদ্ধতিতে কর্মচারী নিয়োগে প্রয়োজনীয় সততা অবলম্বন না করায় দায়িত্বহীনতা প্রতীয়মান হয়েছে। অপরাধের মাত্রা ও প্রকৃতি বিবেচনায় জনস্বার্থে তাকে সরকারি কর্ম থেকে বিরত রাখা প্রয়োজন বলে মনে করছে কমিশন। তাই সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮-এর বিধি ১২(১) অনুযায়ী তাকে চাকরি থেকে সাময়িক বরখাস্ত করা হলো।
প্রজ্ঞাপনে আরও উল্লেখ করা হয়, বরখাস্তকালীন তিনি প্রচলিত বিধি অনুযায়ী খোরপোষ ভাতা ও আনুষঙ্গিক সুবিধা পাবেন। এই আদেশ অবিলম্বে কার্যকর হবে।
প্রসঙ্গত, ‘এশিয়া পোস্ট’-এর অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে আসে, কোনো ধরনের লিখিত পরীক্ষা কিংবা উন্মুক্ত নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি ছাড়াই রাজশাহীর আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তার কার্যালয়ে ১৪৩ জনকে আউটসোর্সিং কর্মী হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। জনবল সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ‘কেএসএফ ট্রেডার্স লিমিটেড’-এর মাধ্যমে সম্পন্ন হওয়া এ নিয়োগে চাকরি পেতে জনপ্রতি ৭০ থেকে ৮০ হাজার টাকা নেওয়ার অভিযোগ করেন একাধিক ভুক্তভোগী। গড়ে ৭৫ হাজার টাকা হিসেবে ১৪৩ জনের কাছ থেকে প্রায় ১ কোটি ৭ লাখ ২৫ হাজার টাকা হাতিয়ে নেওয়ার কথা উঠে আসে প্রতিবেদনে।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, নিয়োগপ্রাপ্তদের অধিকাংশই আগে একই কার্যালয়ে দৈনিক মজুরি বা অস্থায়ী ভিত্তিতে কর্মরত ছিলেন। কোনো উন্মুক্ত বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ না করে সরকারি ক্রয়ব্যবস্থার ডিরেক্ট প্রকিউরমেন্ট মেথড (ডিপিএম) ব্যবহার করে তাদের নতুন চুক্তিতে আউটসোর্সিং কর্মী হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। নিয়ম অনুযায়ী ডিপিএম কেবল বিশেষ বা জরুরি পরিস্থিতিতে প্রয়োগের বিধান থাকলেও ১৪৩ জন কর্মী নিয়োগের ক্ষেত্রে এমন জরুরি পরিস্থিতির কোনো যৌক্তিক ব্যাখ্যা দিতে পারেননি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। এর ফলে সাধারণ চাকরিপ্রত্যাশীরা আবেদনের সুযোগই পাননি।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, চাকরি বহাল রাখা এবং ভবিষ্যতে বাদ না দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে তাদের কাছ থেকে এই টাকা আদায় করা হয়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক কর্মচারী দাবি করেন, টাকা না দিলে চাকরি পাওয়া সম্ভব ছিল না।
এদিকে, গত ৬ জুলাই নিয়োগপত্র নিতে রাজধানীর শ্যামলীতে কেএসএফ ট্রেডার্স লিমিটেডের কার্যালয়ে গেলে কয়েকজন চাকরিপ্রত্যাশীর কাছে ৮০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা দাবি করা হয় বলে অভিযোগ ওঠে। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে তারা প্রতিষ্ঠানের কার্যালয়ের সামনের সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন। পরে পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
অভিযোগের বিষয়ে এশিয়া পোস্টকে দেওয়া বক্তব্যে মো. আনিছুর রহমান দাবি করেছিলেন, নিয়োগে কোনো আর্থিক লেনদেনের বিষয়ে তিনি অবগত নন। অন্যদিকে কেএসএফ ট্রেডার্স লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শামীম হোসেনও অর্থ লেনদেনের অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, নির্বাচন কমিশনের দেওয়া তালিকা অনুযায়ী আগের কর্মীদেরই বহাল রাখা হয়েছে।
তবে ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর নির্বাচন কমিশন সচিবালয় বিষয়টি পর্যালোচনা করে আনিছুর রহমানকে সাময়িক বরখাস্তের সিদ্ধান্ত নেয়।
এ বিষয়ে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, নির্বাচন কমিশনের মতো সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে নিয়োগে দুর্নীতির অভিযোগ অত্যন্ত গুরুতর। নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত দায়ীদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এতে করে কমিশনের ওপর জনগণের আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হবে।
.png)






