গাজী নজরুলের আসনে উপনির্বাচনের হিসাব কষছে জামায়াত-বিএনপি

নারী কেলেঙ্কারির ঘটনায় সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী থেকে বহিষ্কারের পর পুরো আসনজুড়ে শুরু হয়েছে নতুন রাজনৈতিক মেরুকরণ। সাংবিধানিক জটিলতা থাকায় তার সংসদ সদস্য (এমপি) পদ বাতিল হওয়া নিয়ে এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না আসলেও জামায়াতের এই শক্ত ঘাঁটিতে উপনির্বাচনের জল্পনা-কল্পনা এখন তুঙ্গে। বহিষ্কারের এ ঘটনা নির্বাচনি সমীকরণে কী প্রভাব ফেলবে এবং উপনির্বাচন হলে দীর্ঘদিন পর বিএনপির কপাল খুলবে কি না—তা নিয়ে সাতক্ষীরাতে চলছে জোর আলোচনা ও রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ।
আইনি জটিলতায় এমপি পদ, নজর সাংবিধানিক প্রক্রিয়ায়
আইন অনুযায়ী শুধু দলীয় বহিষ্কারের কারণেই এমপি পদ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যায় না। জামায়াতের পক্ষ থেকেও গাজী নজরুল ইসলামের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের (সিইসি) কাছে চিঠি দেওয়া হয়েছে। দল থেকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্তের কথা জানিয়ে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ করা হয়েছে ওই চিঠিতে। একই চিঠি জাতীয় সংসদের স্পিকারের কাছেও পাঠানো হয়েছে।
জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও কেন্দ্রীয় প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের সেক্রেটারি অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, আমরা ইতোমধ্যে বেশকিছু আইনগত পদক্ষেপ নিয়েছি। সংগঠনের পক্ষ থেকে মামলা বা আরও কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হবে কি না তা সময় হলেই জানতে পারবেন।
সাতক্ষীরা জজ কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট এস এম বিপ্লব হোসেন বলেন, নির্বাচন কমিশনের (ইসি) কাছে দলীয় সিদ্ধান্তের কথা জানানো যেতে পারে, কিন্তু শুধুমাত্র সেই চিঠির ভিত্তিতে আসন শূন্য ঘোষণা করার আইনি ক্ষমতা ইসির নেই।
তার মতে, সংবিধানের আলোকে শুধু দলীয় বহিষ্কারের কারণে সংসদ সদস্যের আসন শূন্য হওয়ার সুযোগ নেই। যদি তিনি নিজে পদত্যাগ করেন, কিংবা সাংবিধানিকভাবে নির্ধারিত অন্য কোনো কারণ সৃষ্টি হয়, কেবল তখনই বিষয়টি বিবেচনায় আসতে পারে। ফলে আপাতত উপনির্বাচনের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হলেও পুরো বিষয়টি পুরোপুরি নির্ভর করছে সাংবিধানিক ও আইনি প্রক্রিয়ার ওপর।
উপনির্বাচন হলে প্রভাব পড়তে পারে ভোটে
চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামায়াতের প্রার্থী গাজী নজরুল ইসলাম ১ লাখ ৬ হাজার ৯১৩ ভোট পেয়ে বিজয়ী হন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির প্রার্থী ড. মো. মনিরুজ্জামান পেয়েছিলেন ৮৫ হাজার ৪২৬ ভোট। ২১ হাজার ৪৮৭ ভোটের ব্যবধানে জিতে দীর্ঘদিন পর আসনটি পুনরুদ্ধার করেছিল জামায়াত। কিন্তু মাত্র পাঁচ মাসের মাথায় ভিডিও বিতর্কে জড়িয়ে পড়েন জামায়াতের এই গাজী নজরুল। প্রথমে এটিকে এআই প্রযুক্তিতে তৈরি দাবি করা হলেও পরে তিনি ওই নারীকে দ্বিতীয় স্ত্রী বলে পরিচয় দেন। এতেও বিতর্ক না থামায় জামায়াত তাকে বহিষ্কার করে। এই ঘটনার পর শ্যামনগরে টানা মিছিল-সমাবেশ, পদত্যাগের দাবি ও মিষ্টি বিতরণের ঘটনাও ঘটেছে।
সাতক্ষীরার বিশিষ্ট সমাজসেবক ডা. আবুল কালাম বাবলা মনে করেন, এই ঘটনা সাধারণ ভোটারদের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলবে। মানুষ একটি রাজনৈতিক দলকে শুধু রাজনীতি দিয়ে নয়, তাদের নৈতিকতার মানদণ্ডেও মূল্যায়ন করে। জামায়াত তাদের সাংগঠনিক ব্যবস্থা নিয়েছে ঠিকই, তবে মানুষের মনে যে প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে, তা সহজে দূর হবে না। ফলে উপনির্বাচন হলে বিএনপি তুলনামূলক সুবিধাজনক অবস্থানে থাকতে পারে।
জামায়াত ও বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থী ও প্রস্তুতি
সাংবিধানিক জটিলতা থাকায় গাজী নজরুলের সংসদ সদস্য (এমপি) পদ বাতিল হওয়া নিয়ে এখনও চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত আসেনি। তবে তার আগেই সম্ভাব্য উপনির্বাচনকে ঘিরে রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাকর্মী ও ভোটারদের মধ্যেও শুরু হয়েছে নানা হিসাব-নিকাশ।
গত নির্বাচনে পরাজিত বিএনপি প্রার্থী ড. মো. মনিরুজ্জামান অভিযোগ করেন, গত নির্বাচনে প্রকৃত জনমতের প্রতিফলন হয়নি। তার দাবি, ফলাফল ঘোষণার শুরুতে তিনি এগিয়ে থাকলেও পরবর্তী সময়ে প্রক্রিয়ার ভেতরে নাটকীয় পরিবর্তন আনা হয়।
তিনি আরও বলেন, গাজী নজরুল ইসলামের সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ডে এলাকার মানুষ বিব্রত। যদি উপনির্বাচন হয় এবং দল আমাকে পুনরায় মনোনয়ন দেয়, তবে আমি অবশ্যই নির্বাচন করব। তবে শেষ সিদ্ধান্ত জনগণই নেবে। গত পাঁচ মাসে মানুষের চিন্তাভাবনায় অনেক পরিবর্তন এসেছে এবং তারা এখন অনেক বেশি সচেতন।
উপনির্বাচন হলে বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থীর তালিকায় সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছেন জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক ড. মো. মনিরুজ্জামান এবং জেলা বিএনপির সদস্য ও শ্যামনগর উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি মাস্টার আব্দুল ওয়াহিদ। দলীয় সূত্র জানায়, গত নির্বাচনে ভালো ভোট পাওয়ায় মনিরুজ্জামানই মনোনয়নের দৌড়ে সুবিধাজনক স্থানে আছেন।
অন্যদিকে, জামায়াতের জন্য পরিস্থিতি তুলনামূলক জটিল। একদিকে নিজেদের নির্বাচিত সংসদ সদস্যকে বহিষ্কার করতে হয়েছে, অন্যদিকে ভোটারদের আস্থা পুনরুদ্ধারের বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে।
জামায়াতের সম্ভাব্য প্রার্থীর তালিকায় আলোচনায় রয়েছেন দলটির সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার, অ্যাডভোকেট শিশির মনির, জেলা সেক্রেটারি মাওলানা আজিজুর রহমান এবং শ্যামনগর উপজেলা আমির মাওলানা আব্দুর রহমান। তবে দলীয় সূত্রে জানা গেছে, প্রার্থী মনোনয়নের ক্ষেত্রে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে কেন্দ্রের হাইকমান্ড।
জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি মাওলানা আজিজুর রহমান বলেন, আমরা কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। নির্বাচন নিয়ে দল যে সিদ্ধান্ত দেবে, সে অনুযায়ী কাজ করব। সাম্প্রতিক ঘটনা নির্বাচনে কিছুটা প্রভাব ফেলতে পারে স্বীকার করে তিনি আরও দাবি করেন, অনৈতিকতার অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে দল কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ায় সাধারণ ভোটারদের কাছে একটি ইতিবাচক বার্তা গেছে।
সম্ভাব্য উপনির্বাচন ঘিরে আলোচনায় যোগ হয়েছে আরেক পরিচিত নাম—হিরো আলম। এক অডিও বার্তায় তিনি জানিয়েছেন, সুযোগ পেলে সাতক্ষীরা-৪ আসনের উপনির্বাচনে অংশ নিতে তিনি আগ্রহী। তার ভাষায়, যেখানেই উপনির্বাচন হবে, আমি সেখানে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে চাই। জনগণ কী সিদ্ধান্ত নেয়, তা দেখতে চাই।
স্বাধীনতার পর থেকে এই আসনে আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টি ও জামায়াত—সব বড় রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিরাই নির্বাচিত হয়েছেন। এই অতীত পরিসংখ্যান বলে, সাতক্ষীরা-৪ আসনের ভোটাররা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলকে সমর্থন দিয়েছেন। ফলে উপনির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে এর ফলাফল আগেভাগে অনুমান করা বেশ কঠিন।
কী বলছে নির্বাচন কমিশন
নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ বলেছেন, শুধু বহিষ্কারের ভিত্তিতে তার এমপি পদ নিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেবে না নির্বাচন কমিশন। কোনো সংসদ সদস্যকে কেবল তার নিজ দল বহিষ্কার করলেই আইন অনুযায়ী সরাসরি তার সংসদ সদস্য পদ শূন্য হয় না। বিষয়টিতে আইনগত জটিলতা রয়েছে।
তিনি বলেন, এ বিষয়ে যদি জাতীয় সংসদের স্পিকার বা সংসদ কোনো সিদ্ধান্ত বা নির্দেশনা চেয়ে ইসির কাছে আবেদন জানান, তবে নির্বাচন কমিশন উভয় পক্ষের শুনানি গ্রহণ করবে এবং আইনানুযায়ী পদক্ষেপ গ্রহণ করে বিষয়টি নিষ্পত্তি করবে।
.png)






