Advertisement

যশোর/স্কুলে কমছে, মাদ্রাসায় বাড়ছে শিক্ষার্থী

এশিয়া পোস্ট নিউজ, যশোর
স্কুলে কমছে, মাদ্রাসায় বাড়ছে শিক্ষার্থী
ছবি : সংগৃহীত

যশোরে শিক্ষাব্যবস্থায় নীরবে বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটছে। সরকারি প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে দিন দিন কমছে শিক্ষার্থীর সংখ্যা; বিপরীতে ইবতেদায়ি ও দাখিল মাদ্রাসাগুলোতে বাড়ছে ভর্তি। জেলার প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসের ২০২৫ ও ২০২৬ সালের তথ্য বিশ্লেষণে এমন তথ্য উঠে এসেছে।

শিক্ষাবিদরা বলছেন—দারিদ্র্য, ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গি, আবাসিক সুবিধা এবং সাধারণ শিক্ষার তুলনায় মাদ্রাসায় তুলনামূলক সহজে ভালো ফল করার সুযোগ—এসব কারণে অভিভাবকদের একটি বড় অংশ সন্তানদের মাদ্রাসামুখী করছেন।

জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালে যশোরের ১ হাজার ২৮৯টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মোট শিক্ষার্থী রয়েছে ২ লাখ ৭৪ হাজার ১৮১ জন। ২০২৫ সালে এই সংখ্যা ছিল ২ লাখ ৮২ হাজার ১২ জন। অর্থাৎ মাত্র এক বছরে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী কমেছে ৭ হাজার ৮৩১ জন।

নতুন ভর্তির হারেও একই প্রবণতা দেখা গেছে। ২০২৫ সালে প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি হয়েছিল ৫৭ হাজার ৬৩৮ জন। চলতি বছর তা কমে দাঁড়িয়েছে ৫৭ হাজার ১০০ জনে। অর্থাৎ এক বছরে নতুন ভর্তি কমেছে ৫৩৮ জন।

অন্যদিকে ইবতেদায়ি মাদ্রাসাগুলোতে শিক্ষার্থী বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। ২০২৫ সালে মোট শিক্ষার্থী ছিল ৬৮ হাজার ৭৭ জন। ২০২৬ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭২ হাজার ৪৪২ জনে। অর্থাৎ এক বছরে শিক্ষার্থী বেড়েছে ৪ হাজার ৩৬৫ জন। একই সময়ে প্রথম শ্রেণিতে নতুন ভর্তি হয়েছে ১৫ হাজার ৮০৫ জন, যা আগের বছরের তুলনায় ১ হাজার ২৩৩ জন বেশি।

মাধ্যমিক পর্যায়েও একই চিত্র। জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে জেলার ৫৫৩টি সাধারণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বাংলা ভার্সনে শিক্ষার্থী ছিল ২ লাখ ২৩ হাজার ৬৫৭ জন। ২০২৬ সালে (দশম শ্রেণি বাদে) এ সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৭৭ হাজার ৫৮৩ জনে। যদিও দশম শ্রেণির তথ্য শিক্ষা অফিস সংরক্ষণ করতে পারেনি। ইংরেজি ভার্সনেও শিক্ষার্থী কমেছে; ২০২৫ সালে যেখানে শিক্ষার্থী ছিল ১ হাজার ৫ জন, সেখানে ২০২৬ সালে নবম শ্রেণি পর্যন্ত তা নেমে এসেছে ৭৫৫ জনে।

কারিগরি ও ভোকেশনাল শিক্ষাতেও নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা গেছে। ২০২৫ সালে ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত ভোকেশনাল ট্রেডে শিক্ষার্থী ছিল ১৬ হাজার ৬৬০ জন। ২০২৬ সালে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত সেই সংখ্যা নেমে এসেছে ১ হাজার ৩৫০ জনে। এসএসসি ভোকেশনালেও শিক্ষার্থী কমেছে।

অন্যদিকে দাখিল মাদ্রাসায় ২০২৫ সালে ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার্থী ছিল ৭৫ হাজার ৫৭৯ জন। ২০২৬ সালে দশম শ্রেণির তথ্য বাদে মোট শিক্ষার্থী রয়েছে ৫৮ হাজার ৯৩৮ জন এবং নতুন ভর্তি হয়েছে ১৬ হাজার ৩৫৩ জন। তবে দুই বছরের তথ্য উপস্থাপনের ধরন ভিন্ন হওয়ায় সরাসরি তুলনা করা কঠিন বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

আনিসুর রহমান নামে এক মাদ্রাসা শিক্ষক বলেন, সাধারণ শিক্ষার তুলনায় মাদ্রাসায় ভালো ফল করা সহজ হওয়ায় অনেক অভিভাবক সেদিকেই ঝুঁকছেন। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির ক্ষেত্রে ভালো ফলাফল গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় এ প্রবণতা আরও বাড়ছে। পাশাপাশি আবাসিক মাদ্রাসার সংখ্যাও দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। ছোট বয়সেই অনেক পরিবার সন্তানদের সেখানে রেখে আসছে।

যশোর জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা জি. এম. আলমগীর কবির বলেন, স্কুল ফিডিং কর্মসূচি চালুর পর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ধরে রাখার চেষ্টা চলছে। তবে নতুন ভর্তি হওয়া অনেক শিক্ষার্থী পরে বিদ্যালয় পরিবর্তন করে বা ঝরে পড়ে। মাদ্রাসামুখী হওয়ার প্রবণতা সম্পর্কে তিনি বলেন, এটি এলাকার পরিবেশ, প্রতিষ্ঠানের মান এবং অভিভাবকদের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করে।

শিক্ষাবিদ ও উপশহর ডিগ্রি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ শাহিন ইকবালের মতে, এই পরিবর্তনের পেছনে শুধু ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গি নয়, অর্থনৈতিক বাস্তবতাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তিনি বলেন, সাধারণ শিক্ষার তুলনায় মাদ্রাসায় ভালো ফল করা তুলনামূলক সহজ। সেই সুবিধা বিবেচনায় অনেক অভিভাবক সন্তানদের মাদ্রাসায় ভর্তি করাচ্ছেন। দারিদ্র্যও একটি বড় কারণ।

এদিকে জেলায় দ্রুত বিস্তার লাভ করা কিন্ডারগার্টেন, প্রি-ক্যাডেট স্কুল, আবাসিক মাদ্রাসা ও এতিমখানার সংখ্যা এবং সেখানে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদের বিষয়ে কোনো সমন্বিত সরকারি তথ্যভাণ্ডার নেই। ফলে জেলার প্রকৃত শিক্ষা পরিস্থিতি সঠিক মূল্যায়ন করা কঠিন হয়ে পড়েছে।

এ বিষয়ে শাহিন ইকবাল বলেন, বেসরকারি কিন্ডারগার্টেন ও আবাসিক মাদ্রাসার মতো বিশাল একটি শিক্ষা খাত সরকারের তথ্যভাণ্ডার ও কার্যকর তদারকির বাইরে রয়েছে। এটি ভবিষ্যতে শিক্ষা পরিকল্পনা ও নীতি নির্ধারণে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

শিক্ষা সংশ্লিষ্টদের মতে, সাধারণ শিক্ষাকে আরও আধুনিক, আকর্ষণীয় ও কর্মমুখী করার পাশাপাশি সব ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে একটি সমন্বিত তথ্যব্যবস্থার আওতায় এনে কার্যকর নজরদারি নিশ্চিত করা না গেলে আগামী দিনে শিক্ষার মূলধারায় এই ভারসাম্যহীনতা আরও প্রকট হয়ে উঠবে।

বিষয় :যশোর