Advertisement

গাজী নজরুল এমপি পদ হারালে সাতক্ষীরায় কপাল খুলবে কার?

এশিয়া পোস্ট নিউজ, সাতক্ষীরা
গাজী নজরুল এমপি পদ হারালে সাতক্ষীরায় কপাল খুলবে কার?
গাজী নজরুল ইসলাম। ছবি: সংগৃহীত

ভিডিও বিতর্ককে কেন্দ্র করে সাতক্ষীরা-৪ আসনের জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামকে দল থেকে বহিষ্কারের পর তার সংসদ সদস্য পদ থাকবে কি না, তা নিয়ে আলোচনা চলছে। এরই মধ্যে গাজী নজরুল ইসলামের সংসদ সদস্য পদ বাতিল চেয়ে নির্বাচন কমিশনে চিঠিও দিয়েছে জামায়াত। তবে বিষয়টি নিয়ে সাংবিধানিক জটিলতা থাকায় এখনই কোনো সিদ্ধান্ত দিতে চায় না ইসি।

এদিকে গাজী নজরুল ইসলামকে জামায়াত থেকে বহিষ্কারের পর সাতক্ষীরা-৪ আসনে উপনির্বাচন এবং ভোটের হিসাব-নিকাশ শুরু হয়ে গেছে। বিএনপি নেতাকর্মীদের প্রত্যাশা, আবার নির্বাচন হলে তাদের প্রার্থী জয়ী হবে। স্থানীয় জামায়াত বলছে, নির্বাচন হলে তারা জনগণের কাছে আবার যাবেন।

তথ্যমতে, চলতি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামায়াতের প্রার্থী হিসেবে ৯৭টি কেন্দ্রের ফলাফলে ১ লাখ ৬ হাজার ৯১৩ ভোট পেয়ে বিজয়ী হন গাজী নজরুল ইসলাম। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির ড. মো. মনিরুজ্জামান পান ৮৫ হাজার ৪২৬ ভোট। মাত্র ২১ হাজার ৪৮৭ ভোটের ব্যবধানে বিজয়ী এমপিকে ঘিরে নির্বাচনের কয়েক মাসের মাথায় তৈরি হওয়া এই বিতর্ক পুরো এলাকার রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে নতুন মোড়ে দাঁড় করিয়েছে।

বহিষ্কার হলেই কি পদ শূন্য হবে?

জামায়াতের দলীয় সিদ্ধান্তের চিঠি নির্বাচন কমিশনে পাঠানো হলেও সাংবিধানিকভাবে সংসদ সদস্য পদ শূন্য হওয়া নিয়ে আইনি প্রশ্ন উঠেছে। সাতক্ষীরা জজকোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট এস এম বিপ্লব হোসেন বলেন, দল থেকে বহিষ্কার করা মানেই সংসদ সদস্যের আসন শূন্য হওয়া নয়।

তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশন দলীয় সিদ্ধান্তের চিঠি গ্রহণ ও নথিভুক্ত করতে পারে, কিন্তু শুধু সেই চিঠির ভিত্তিতে কোনো সংসদ সদস্যের আসন শূন্য ঘোষণা করার এখতিয়ার নির্বাচন কমিশনের নেই। বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী সংসদ সদস্যের পদ শূন্য হওয়ার নির্দিষ্ট কিছু কারণ রয়েছে। যদি কোনো সাংবিধানিক প্রশ্ন তৈরি হয়, তাহলে সেটি স্পিকার, আদালত অথবা সংশ্লিষ্ট সাংবিধানিক কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে নিষ্পত্তি হতে পারে।

অ্যাডভোকেট এস এম বিপ্লব হোসেন আরও বলেন, সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী দলত্যাগ বা দলের বিরুদ্ধে ভোট দেওয়ার মতো নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে পদ শূন্য হয়। দলীয় বহিষ্কার স্বয়ংক্রিয়ভাবে আসন শূন্য করে না। তাই উপনির্বাচন হবে কি না, সেটি পুরোপুরি নির্ভর করবে পরবর্তী সাংবিধানিক ও আইনি প্রক্রিয়ার ওপর।

সাতক্ষীরার বিশিষ্ট সমাজসেবক ডা. আবুল কালাম বাবলা মনে করেন, এই ঘটনা ভোটারদের মনস্তত্ত্বে প্রভাব ফেলবেই। সাতক্ষীরায় জামায়াতের শক্তিশালী একটি ভোটব্যাংক রয়েছে। কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনাটি অনেক সাধারণ মানুষকে বিব্রত করেছে। দল যেহেতু নৈতিকতার প্রশ্নে নিজেদের এমপিকেই বহিষ্কার করেছে, সেটা ইতিবাচক দিক হলেও মানুষের মনে যে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে, সেটা সহজে দূর হবে না।

তিনি আরও বলেন, মানুষ ব্যক্তি ও দল, দুই বিষয়ই বিবেচনা করে। একজন সংসদ সদস্যের ব্যক্তিগত আচরণও জনআস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত। বিশেষ করে ধর্মীয় মূল্যবোধের রাজনীতি করা একটি দলের ক্ষেত্রে এমন বিতর্ক ভোটারদের মানসিকতায় প্রভাব ফেলতে বাধ্য।

ডা. আবুল কালামের মতে, যদি উপনির্বাচন হয়, তাহলে বিএনপি তুলনামূলকভাবে সুবিধাজনক অবস্থানে থাকতে পারে। তবে শেষ পর্যন্ত জনগণই সিদ্ধান্ত নেবে।

বিএনপির প্রতিক্রিয়া

গত নির্বাচনে পরাজিত বিএনপি প্রার্থী ড. মো. মনিরুজ্জামান বলেন, নির্বাচনের সময় থেকেই আমরা বলেছিলাম, প্রকৃত ফলাফলের প্রতিফলন ঘটেনি। এই বিতর্কের কারণে পুরো এলাকার মানুষ বিব্রত। সাংবিধানিক প্রক্রিয়ায় আসন শূন্য হলে এবং দল মনোনয়ন দিলে আমি অবশ্যই আবারও নির্বাচন করব।

সাতক্ষীরা জেলা বিএনপির সদস্যসচিব আবু জাহিদ ডাবলু বলেন, এই ঘটনা জামায়াতের জন্য বড় রাজনৈতিক সংকট তৈরি করেছে। এখন মানুষ ব্যক্তি ও দলের নৈতিক অবস্থান দুটোই বিচার করবে। নিরপেক্ষ ভোট হলে এখানে বিএনপির প্রার্থীর বিজয়ী হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।

জামায়াতের অবস্থান ও জনবিক্ষোভ

সাতক্ষীরা জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি মাওলানা আজিজুর রহমান বলেন, কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তকে আমরা স্বাগত জানিয়েছি। জামায়াত নীতি ও শৃঙ্খলার প্রশ্নে আপস করে না। ব্যক্তির দায় পুরো দলের নয়। তবে সাময়িক রাজনৈতিক প্রভাব পড়লেও মানুষ সময়ের সঙ্গে আমাদের নৈতিক অবস্থানকে ইতিবাচকভাবেই মূল্যায়ন করবে।

তিনি আরও বলেন, নির্বাচন হলে দল যে সিদ্ধান্ত দেবে আমরা সেটিই বাস্তবায়ন করব। জনগণের কাছে আমরা আবারও যাব। আমরা বিশ্বাস করি, নৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার কারণে জনগণ বিষয়টিকে ইতিবাচকভাবেই মূল্যায়ন করবেন।

এদিকে ভিডিও বিতর্ক ও বক্তব্যের অসঙ্গতি নিয়ে বুধবার শ্যামনগরে বিক্ষোভ মিছিল ও প্রতিবাদ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে। এতে অংশগ্রহণকারীরা এ ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত চান এবং প্রতীকী কুশপুত্তলিকা দাহ করেন। জামায়াত থেকে বহিষ্কারের পর শ্যামনগরের বিভিন্ন এলাকায় সাধারণ মানুষকে মিষ্টি বিতরণ করতেও দেখা গেছে।

কী বলছে নির্বাচন কমিশন

নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ বলেছেন, শুধু বহিষ্কারের ভিত্তিতে তার এমপি পদ নিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেবে না নির্বাচন কমিশন। কোনো সংসদ সদস্যকে কেবল তার নিজ দল বহিষ্কার করলেই আইন অনুযায়ী সরাসরি তার সংসদ সদস্য পদ শূন্য হয় না। বিষয়টিতে আইনগত জটিলতা রয়েছে।

তিনি বলেন, এ বিষয়ে যদি জাতীয় সংসদের স্পিকার বা সংসদ কোনো সিদ্ধান্ত বা নির্দেশনা চেয়ে ইসির কাছে আবেদন জানান, তবে নির্বাচন কমিশন উভয় পক্ষের শুনানি গ্রহণ করবে এবং আইনানুযায়ী পদক্ষেপ গ্রহণ করে বিষয়টি নিষ্পত্তি করবে।