Advertisement

ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণার এক দশক পেরিয়েও হয়নি নতুন সেতু

এশিয়া পোস্ট নিউজ, ঝালকাঠি
ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণার এক দশক পেরিয়েও হয়নি নতুন সেতু
বাসন্ডা বেইলি সেতু। ছবি: এশিয়া পোস্ট

বরিশাল-খুলনা আঞ্চলিক মহাসড়কের ঝালকাঠি সদর উপজেলার বাসন্ডা নদীর ওপর দাঁড়িয়ে আছে প্রায় ৩৭ বছরের পুরোনো একটি বেইলি সেতু। প্রতিদিন শত শত বাস, ট্রাক, কাভার্ডভ্যান ও পণ্যবাহী যানবাহনের ভার বহন করছে সেতুটি। তবে বয়সের ভারে ন্যুব্জ জরাজীর্ণ এই কাঠামোটি এখন নিজেই যেন এক মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়েছে।

যে কোনো যানবাহন উঠলেই পুরো সেতু কেঁপে ওঠে। স্টিলের পাটাতন থেকে ভেসে আসে বিকট শব্দ; কোথাও ফাটল, আবার কোথাও দেখা যায় ঢিলে হয়ে যাওয়া নাট-বল্টু। কিছুদিন পরপর ঝালাই করে, স্টিলের প্লেট বদলে কিংবা নাট-বল্টু টাইট দিয়ে সাময়িকভাবে চালু রাখা হলেও কয়েক দিনের ব্যবধানে ফিরে আসে আগের জরাজীর্ণ রূপ। এক দশক আগে সেতুটিকে ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করা হলেও এখনও স্থায়ী কোনো সেতু নির্মিত হয়নি। ফলে প্রতিদিন চরম প্রাণঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছেন চালক, যাত্রী ও সাধারণ মানুষ।

সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৮৯ সালে বাসন্ডা নদীর ওপর প্রায় ৩৯৪ ফুট দৈর্ঘ্য ও ২৫ ফুট প্রস্থের এই বেইলি সেতুটি নির্মাণ করা হয়। বরিশাল-খুলনা আঞ্চলিক মহাসড়কের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সংযোগস্থল এটি। বর্তমানে প্রতিদিন প্রায় ৫০০ থেকে ৭০০টি ভারী যানবাহনসহ অসংখ্য ছোট-বড় গাড়ি এই সেতু ব্যবহার করে।

ঝালকাঠি, পিরোজপুর, বাগেরহাট, খুলনা ও যশোরসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিস্তৃত এলাকার মানুষ এর ওপর নির্ভরশীল। কৃষিপণ্য, মাছ, শিল্পপণ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় মালামাল পরিবহনের অন্যতম প্রধান রুটও এটি। অতিরিক্ত যানবাহনের চাপে স্টিলের পাটাতন ফেটে যায় এবং নাট-বল্টু ঢিলে হয়ে ক্ষয়ক্ষতি বাড়ে। বারবার সাময়িক মেরামত করা হলেও তা স্থায়ী হচ্ছে না।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, ২০১৬ সালে সড়ক ও জনপথ বিভাগ সেতুটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করে। কিন্তু ১০ বছর পার হলেও বাস্তবায়িত হয়নি নতুন সেতু প্রকল্প।

স্থানীয়দের আশঙ্কা, যে কোনো মুহূর্তে সেতুটি ভেঙে পড়লে দক্ষিণাঞ্চলের এই গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়কের যোগাযোগ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে। সওজের প্রকৌশলীরা নিয়মিত মেরামতের চেষ্টা করলেও অতিরিক্ত চাহিদার কারণে নতুন বসানো স্টিলের প্লেটও দ্রুত বেঁকে বা ফেটে যাচ্ছে। বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটলে পুরো অঞ্চলের সড়ক যোগাযোগে ধস নামার চরম ঝুঁকি রয়েছে।

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, গত ১০ বছর ধরে আশ্বাস মিললেও বাস্তবে কাজের কোনো অগ্রগতি দেখা যায়নি। খুলনা-বরিশাল রুটের ট্রাক চালক মো. রুস্তম আলী বলেন, প্রতিবারই লাখ লাখ টাকা ব্যয় করে সাময়িক সংস্কার করা হচ্ছে। কিন্তু স্থায়ী সমাধানের জন্য নতুন সেতু নির্মাণের উদ্যোগ বছরের পর বছর কাগজেই সীমাবদ্ধ রয়ে গেছে।

যাত্রীবাহী বাসচালক আব্দুর রহমান জানান, প্রতিদিন যাত্রী নিয়ে এই সেতুর ওপর দিয়ে যেতে হয়। গাড়ি উঠলেই সেতু দুলতে থাকে। মারাত্মক দুর্ঘটনার ভয় নিয়ে চলতে হয় আমাদের। জোড়াতালির পেছনে কোটি কোটি টাকা না ঢেলে দ্রুত একটি নতুন সেতু নির্মাণ করা উচিত।

স্থানীয় বাসিন্দা নাছির উদ্দীন বলেন, ব্রিজের ওপর দিয়ে ভারী গাড়ি গেলেই বিকট শব্দ হয়, পুরো ব্রিজ কাঁপতে থাকে। সেতুটি হঠাৎ ভেঙে পড়লে দক্ষিণাঞ্চল বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে। আমরা দ্রুত নতুন সেতুর কাজ দেখতে চাই।

স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, গত এক দশকে জনপ্রতিনিধি ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা আশ্বাস দিলেও দৃশ্যমান কোনো সাফল্য আসেনি। তবে ২০২৬ সালে এসে বিষয়টি নতুন করে গুরুত্ব পায়। সড়ক ও জনপথ বিভাগ জানায়, বাসন্ডা নদীর ওপর নতুন সেতু নির্মাণের জন্য ফিজিবিলিটি স্টাডি (সম্ভাব্যতা যাচাই) সম্পন্ন হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট নথিপত্র প্রধান প্রকৌশলীর কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে। বর্তমানে উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে প্রকল্পটি।

ঝালকাঠি সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী শাহরিয়ার শরীফ খান বলেন, বাসন্ডা বেইলি সেতুর স্থানে নতুন স্থায়ী সেতু নির্মাণের লক্ষ্যে ফিজিবিলিটি স্টাডি সম্পন্ন হয়েছে। প্রয়োজনীয় তথ্য প্রধান প্রকৌশলীর দপ্তরে পাঠানো হয়েছে। ডিপিপি অনুমোদন পেলেই নতুন সেতুর নির্মাণকাজ শুরু করা সম্ভব হবে।

ঝুঁকিপূর্ণ এই সেতুর কারণে জনমনে আতঙ্ক ও উদ্বেগ বাড়তে থাকায় সম্প্রতি স্থানীয় সামাজিক সংগঠন, ব্যবসায়ী ও সচেতন নাগরিকরা মানববন্ধন করে দ্রুত টেকসই সেতু নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন। তাদের স্পষ্ট বক্তব্য, বড় ধরনের কোনো মানবিক বা অর্থনৈতিক বিপর্যয় ঘটার আগেই সরকারকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।

বিষয় :ঝালকাঠি