ঘন ঘন লোডশেডিংয়ে খুলনায় জনজীবন বিপর্যস্ত

তীব্র গরমের মধ্যে ঘন ঘন লোডশেডিংয়ে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে খুলনার জনজীবন। শহরের তুলনায় গ্রামে বিদ্যুৎ সংকট আরও তীব্র হওয়ায় চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারণ মানুষ ও এইচএসসি পরীক্ষার্থীরা। একই সঙ্গে ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাটে জেলার সহস্রাধিক শিল্পকারখানায় উৎপাদন গড়ে ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে। উৎপাদন সচল রাখতে জেনারেটর চালানোয় জ্বালানি ব্যয় বেড়েছে কয়েক গুণ। এতে উৎপাদন হ্রাস ও অতিরিক্ত খরচের দ্বৈত চাপে পড়েছেন শিল্পউদ্যোক্তারা।
খুলনা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির আওতাধীন নয়টি উপজেলায় নিয়মিত লোডশেডিং হচ্ছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। এর মধ্যে পাইকগাছা, বটিয়াঘাটা, দাকোপ, ডুমুরিয়া ও কয়রার পরিস্থিতি সবচেয়ে নাজুক বলে জানান তারা।
তেরোখাদা উপজেলার সদর ইউনিয়ন মধুপুর গ্রামের এইচএসসি পরীক্ষার্থী জামিলা আক্তার বলেন, ‘পরীক্ষার রুটিন প্রকাশের পর থেকে প্রতিদিন গড়ে ১০-১২ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকে না। গত এক সপ্তাহ প্রায় প্রতিদিন সন্ধ্যার পর থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ ছিল না। এতে পড়াশোনায় ব্যাঘাত ঘটছে।’
রূপসা উপজেলার বাসিন্দা সুমাইয়া বলেন, ‘সন্ধ্যার পর প্রায়ই বিদ্যুৎ থাকে না। দিনের বেলাতেও চার-পাঁচবার বিদ্যুৎ চলে যায়, যা দেড়-দুই ঘণ্টার আগে আসে না।’
ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি (ওজোপাডিকো) সূত্র জানায়, রোববার রাত ৮টায় খুলনাসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১ জেলায় বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ৭৭৩ মেগাওয়াট। এর বিপরীতে বরাদ্দ পাওয়া যায় ৬৭৩ মেগাওয়াট। ফলে ১০০ মেগাওয়াট ঘাটতি তৈরি হয়। এর মধ্যে খুলনা অঞ্চলে ঘাটতি ছিল ৭১ মেগাওয়াট এবং বরিশাল অঞ্চলে ২৯ মেগাওয়াট। খুলনা মহানগরী ও জেলায় সর্বোচ্চ ৩৬ মেগাওয়াট লোডশেডিং করা হয়।
এর আগে একই দিন দুপুর ১টায় বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ৮১২ মেগাওয়াট। সরবরাহ পাওয়া যায় ৭৪৪ মেগাওয়াট। ফলে ৬৮ মেগাওয়াট ঘাটতি দেখা দেয়, যার পুরোটা ছিল খুলনা অঞ্চলে। ওই সময়ে বরিশালে লোডশেডিং ছিল না। শুধু খুলনায় সর্বোচ্চ ২১ মেগাওয়াট লোডশেডিং করা হয়।
ওজোপাডিকোর ব্যবস্থাপনা পরিচালক জাকিরুজ্জামান বলেন, ‘সীমিত বিদ্যুৎ সরবরাহের কারণে বাধ্য হয়ে লোডশেডিং করতে হচ্ছে। বিদ্যুতের অপচয় কমাতে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে নিয়মিত বৈঠক করা হচ্ছে।’
খুলনা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির জেনারেল ম্যানেজার তুষার কান্তি মণ্ডল বলেন, ‘সাড়ে চার লাখ গ্রাহকের জন্য ৮০ থেকে ৮৫ মেগাওয়াট বিদ্যুতের চাহিদা থাকলেও আমরা এর ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ সরবরাহ পাচ্ছি। প্রায় ১০ থেকে ২০ শতাংশ ঘাটতি থেকেই যাচ্ছে।’
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, লোডশেডিংয়ের বড় প্রভাব পড়েছে শিল্প খাতে। রূপসার ইলাইপুরে রপ্তানিমুখী চিংড়ি প্রক্রিয়াজাতকারী ফ্রেশ ফুডস লিমিটেডে গিয়ে দেখা যায়, বিদ্যুৎ নেই। অধিকাংশ শ্রমিক অলস সময় পার করছেন। প্রতিষ্ঠানটির উৎপাদন বিভাগের এক কর্মকর্তা জানান, একদিনে পাঁচ দফায় মোট ৭ ঘণ্টা ৪০ মিনিট বিদ্যুৎ ছিল না। জেনারেটর চালাতে ৫৫ হাজার ৩১৫ টাকার ডিজেল কিনতে হয়েছে। এতে অতিরিক্ত ৩০ হাজার টাকার বেশি ব্যয় হয়েছে এবং উৎপাদন ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ কমে গেছে।
পাশের সাউদার্ন ফুডস লিমিটেডের সহকারী মহাব্যবস্থাপক মিজানুর রহমান জানান, একই সময়ে কারখানা সচল রাখতে ৬৩ হাজার ৮৫০ টাকার ডিজেল কিনতে হয়েছে। প্রতি ঘণ্টায় জেনারেটরে প্রায় ৭৫ লিটার ডিজেল লাগে। স্বাভাবিক সময়ে যেখানে দৈনিক বিদ্যুৎ বিল আসে প্রায় ৩৫ হাজার টাকা, সেখানে শুধু ডিজেলেই ব্যয় হয়েছে প্রায় দ্বিগুণ।
কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, খুলনা জেলায় প্রায় এক হাজার নিবন্ধিত শিল্পকারখানা রয়েছে। এর মধ্যে ৪৮টি হিমায়িত মৎস্য প্রক্রিয়াজাত কারখানাসহ শত শত চালকল, ওয়ার্কশপ ও লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং কারখানা রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, লোডশেডিংয়ের কারণে অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন গড়ে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে।
বিসিক শিল্পনগরীর কর্মকর্তা খায়রুল ইসলাম বলেন, ‘শিল্পনগরীর ৮৪টি কারখানার মধ্যে ৭০ থেকে ৭৫টি নিয়মিত উৎপাদনে রয়েছে। বড় কারখানাগুলো আলাদা বিদ্যুৎ লাইনের সুবিধা পেলেও ছোট ও মাঝারি শিল্পগুলো দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়ছে।’






