তিন বছর ধরে অচল উপকূলের ‘চোখ’

লোকমান হাকিম, কক্সবাজার
তিন বছর ধরে অচল উপকূলের ‘চোখ’
ছবি: নোটবুকএলএম

কক্সবাজার উপকূলের মানুষ ও গভীর সমুদ্রে মাছ ধরতে যাওয়া হাজারো জেলের কাছে দুর্যোগের আগাম সতর্কতার অন্যতম নির্ভরযোগ্য প্রযুক্তিগত মাধ্যম ছিল কক্সবাজার রাডার স্টেশন। কিন্তু যন্ত্রাংশের কার্যক্ষমতার মেয়াদ শেষ হওয়ায় ২০২৩ সালের ৪ আগস্ট থেকে অচল হয়ে পড়ে আছে রাডারটি। আবহাওয়া নির্ভর মানুষের কাছে এটি ছিল প্রযুক্তিগত ‘চোখ’।

Advertisement

রাডার স্টেশনটি পরিচালনার দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তারা জানান, ঘূর্ণিঝড়, বজ্রঝড়, ভারী বৃষ্টি কিংবা দমকা হাওয়ার মতো আবহাওয়ার পরিবর্তনের তথ্য কয়েক মিনিটের ব্যবধানে এই রাডারের মাধ্যমে সংগ্রহ করে তাৎক্ষণিকভাবে ঢাকাসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোতে পাঠানো হতো।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, আবহাওয়া অধিদপ্তরের অন্যান্য রাডার, স্যাটেলাইট ও বিভিন্ন প্রযুক্তির তথ্য ব্যবহার করে নিয়মিত পূর্বাভাস দিয়ে যাচ্ছে। তবে কক্সবাজারের স্থানীয় পর্যায়ের আবহাওয়া পর্যবেক্ষণের সক্ষমতা কমেছে। অপরদিকে জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে রাডারটির গুরুত্ব আগের যে কোনো সময়ের তুলনায় বেশি।

সুইডিশ সহায়তা থেকে জাপানি আধুনিকায়ন

কক্সবাজার শহরের সার্কিট হাউস-সংলগ্ন পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত রাডার স্টেশনটি সমতল ভূমি থেকে প্রায় ১৬০ ফুট উঁচু স্থানে নির্মিত। জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা হিসেবে এটি কেপিআই-১ (খ) শ্রেণিভুক্ত প্রতিষ্ঠান।

কক্সবাজার আবহাওয়া অফিসের কর্মকর্তারা জানান, ১৯৬৯ সালে সুইডিশ শিশু কল্যাণ সংস্থা ও বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির সহযোগিতায় কক্সবাজার রাডার স্টেশন প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। পরে ২০০৭ সালের ২২ এপ্রিল জাপান সরকারের আর্থিক সহায়তায় এটি আধুনিক ডপলার প্রযুক্তিতে উন্নীত করা হয়।

কক্সবাজার আবহাওয়া অফিসের সহকারী আবহাওয়াবিদ মো. আবদুল হান্নান বলেন, প্রায় ৯৯ ফুট উচ্চতার ভবনের ওপর স্থাপিত রাডারটি ডপলার প্রযুক্তির। এটি ৪৪০ কিলোমিটার পর্যন্ত আবহাওয়ার গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করতে পারে।

তিনি বলেন, রাডার থেকে সংগৃহীত তথ্য ভি-স্যাট (VSAT) প্রযুক্তির মাধ্যমে তাৎক্ষণিকভাবে ঢাকার আবহাওয়া অধিদপ্তরের প্রধান কার্যালয়ে পাঠানো হয়। এর মাধ্যমে ঘূর্ণিঝড়, বজ্রঝড়, ভারী বৃষ্টিপাত, দমকা হাওয়াসহ বিভিন্ন আবহাওয়াজনিত পরিস্থিতির দ্রুত পূর্বাভাস দেওয়া সম্ভব হতো।

কক্সবাজার শহরের সার্কিট হাউস-সংলগ্ন পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত রাডার স্টেশন। এটি সমতল ভূমি থেকে প্রায় ১৬০ ফুট উঁচু স্থানে অবস্থিত। ছবি: এশিয়া পোস্ট
কক্সবাজার শহরের সার্কিট হাউস-সংলগ্ন পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত রাডার স্টেশন। এটি সমতল ভূমি থেকে প্রায় ১৬০ ফুট উঁচু স্থানে অবস্থিত। ছবি: এশিয়া পোস্ট

রাডারটি কেন গুরুত্বপূর্ণ?

আবহাওয়াবিদ মোহাম্মদ আবদুল হান্নান বলেন, কক্সবাজারে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর রয়েছে। প্রতিদিন শত শত মাছ ধরার ট্রলার গভীর সমুদ্রে যায়। স্থানীয়ভাবে মেঘের গঠন, বৃষ্টির তীব্রতা, বজ্রঝড় কিংবা দমকা হাওয়ার মতো পরিবর্তন দ্রুত শনাক্ত করতে ডপলার রাডারের তথ্য অত্যন্ত কার্যকর।

কক্সবাজার বিমানবন্দরের পরিচালক গোলাম মুর্তজা হোসেন এশিয়া পোস্টকে বলেন, আবহাওয়া অফিস প্রতি ঘণ্টায় আমাদের রিপোর্ট দেয়। সেই তথ্যের ভিত্তিতে বিভিন্ন এয়ারক্রাফটের পাইলটরা বিমান ওঠা-নামার সিদ্ধান্ত নেন। আবহাওয়া বেশি খারাপ হলে ১০ মিনিট পরপরও তথ্য দিতে হয়। কক্সবাজারের রাডার সচল থাকলে আরও দ্রুত ও নির্ভুল তথ্য পাওয়া সহজ হতো। কক্সবাজার ছাড়া যেসব এলাকায় বিমানবন্দর রয়েছে, সেখানে রাডার চালু থাকা অত্যন্ত জরুরি।

কেন বন্ধ হলো

কক্সবাজার আবহাওয়া অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, রাডারটির যন্ত্রাংশের কার্যক্ষমতার মেয়াদ শেষ হওয়ায় ২০২৩ সালের ৪ আগস্ট থেকে এটি অচল হয়ে পড়ে। এরপর বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ ও জেলা প্রশাসনকে জানানো হয়। পরে ওই বছরের শেষ দিকে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে কারিগরি সহায়তাদাতা জাপানের উন্নয়ন সংস্থা জাইকার কাছে কয়েক দফা চিঠি পাঠানো হয়। কিন্তু জাইকা কোনো সাড়া দেয়নি।

পরে ২০২৪ সালের জেলা প্রশাসক সম্মেলনে বিষয়টি উত্থাপিত হলে সরকার ভবন অক্ষুণ্ন রেখে নিজস্ব অর্থায়নে নতুন যন্ত্রপাতি ক্রয় করে রাডারটি পুনরায় চালুর নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয়।

রাডার স্টেশনের দায়িত্বরত কর্মকর্তারা জানান, ২০২৪ সালে শেষ দিকে জাপানের তিন সদস্যের একটি বিশেষজ্ঞ দল স্টেশনটি পরিদর্শন করে। সেসময় তারা ভবনটি ব্যবহারযোগ্য বলে মত দেয়। একই সঙ্গে নতুন যন্ত্রপাতি স্থাপনের পরামর্শ দেয়। যদিও সেই থেকে এখন পর্যন্ত কোনো অগ্রগতি হয়নি।

রাডারটি অচল থাকলেও স্টেশনটি পুরোপুরি পরিত্যক্ত নয়। স্টেশনের রক্ষণাবেক্ষণে ইঞ্জিনিয়ারসহ মোট ১৮টি পদ থাকলেও বর্তমানে কর্মরত আছেন মাত্র তিনজন। নিরাপত্তার দায়িত্বে রয়েছেন চারজন পুলিশ সদস্য।

স্টেশনের নিরাপত্তা ইনচার্জ কমল কান্তি পাল বলেন, আমরা দৈনন্দিন অফিসিয়াল কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছি। তবে রাডার সচল না থাকায় প্রযুক্তিগত কোনো কার্যক্রম পরিচালনা করা যাচ্ছে না।

জেলে ও মৎস্য ব্যবসায়ীদের উদ্বেগ

সম্প্রতি কক্সবাজার মৎস্য অবতরণকেন্দ্রে কথা হয় ২৩ বছর ধরে গভীর সমুদ্রে মাছ ধরা জেলে মোহাম্মদ কামরুল হাসানের সঙ্গে। তিনি বলেন, আমরা ২০০ থেকে ২৫০ কিলোমিটার দূরে মাছ ধরতে যাই। সেখানে মোবাইল নেটওয়ার্ক থাকে না। রেডিও থাকলে আবহাওয়ার খবর পাই। সাগরে হঠাৎ আবহাওয়া বদলে গেলে জীবন নিয়ে ফিরতে হবে কি না, সেটাই সবচেয়ে বড় চিন্তা হয়ে ওঠে।

আরেক জেলে নুর মোহাম্মদ বলেন, সমুদ্রে ঢেউ দেখেই অনেক কিছু বুঝতে হয়। কিন্তু সঠিক আবহাওয়ার বার্তা পাওয়া খুবই জরুরি। পরিবারের সবাই আমাদের জন্য অপেক্ষা করে।

কক্সবাজার মৎস্য অবতরণকেন্দ্রের ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি জয়নাল আবেদিন এশিয়া পোস্টকে বলেন, একটি মাছ ধরার ট্রলারে কোটি টাকার বিনিয়োগ থাকে। খারাপ আবহাওয়ার কারণে দুর্ঘটনা হলে মানুষের প্রাণহানির পাশাপাশি বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতি হয়। তাই নির্ভুল ও দ্রুত আবহাওয়ার তথ্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

চালুর উদ্যোগ নিলেও মেলেনি বরাদ্দ

এদিকে চলতি বছরের ৩১ মার্চ আবহাওয়া অধিদপ্তরের পরিচালক (চলতি দায়িত্ব) মো. মমিনুল ইসলাম স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে কক্সবাজার, খেপুপাড়া ও মৌলভীবাজারের তিনটি বিদ্যমান রাডার আধুনিকায়নের উদ্যোগের কথা জানানো হয়। যেখানে গণপূর্ত বিভাগের মাধ্যমে অবকাঠামোগত কাজ শেষ করে কনসালট্যান্ট নিয়োগের মাধ্যমে প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিকল্পনার কথাও বলা হয়।

চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, সরকারি (জিওবি) অর্থায়নে তিনটি রাডার আপগ্রেডের সম্ভাব্যতা যাচাই সম্পন্ন হয়েছে। সে অনুযায়ী প্রকল্প গ্রহণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং প্রাক্কলিত ব্যয় নির্ধারণের জন্য গণপূর্ত বিভাগের কাছে চিঠি পাঠানো হয়েছে। তবে এখনো প্রয়োজনীয় ব্যয়ের হিসাব পাওয়া যায়নি।

অগ্রগতির বিষয়ে বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ মোহাম্মদ আরিফ হোসেন এশিয়া পোস্টকে বলেন, ঝুঁকি বিবেচনায় কক্সবাজার, খেপুপাড়া ও মৌলভীবাজারের তিনটি রাডার পুনরায় চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে একাধিক বৈঠক হয়েছে। একটি প্রস্তাবনা মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর প্রস্তুতি চলছে। তবে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।

উদ্বেগ প্রকাশ করে কক্সবাজার সিভিল সোসাইটির সভাপতি আবু মোরশেদ চৌধুরী খোকা বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের এই সময়ে আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থায় বিনিয়োগ বাড়ানোর কথা, সেখানে কক্সবাজারের মতো উপকূলের একটি গুরুত্বপূর্ণ রাডার বছরের পর বছর অচল থাকা উদ্বেগজনক। এটি দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার সক্ষমতাকে দুর্বল করে দিতে পারে।