কক্সবাজারে বৃষ্টিতে প্লাবিত ৫০ গ্রাম, পাহাড়ধসের ঝুঁকিতে লাখো রোহিঙ্গা

এশিয়া পোস্ট নিউজ, কক্সবাজার
কক্সবাজারে বৃষ্টিতে প্লাবিত ৫০ গ্রাম, পাহাড়ধসের ঝুঁকিতে লাখো রোহিঙ্গা
কক্সবাজারে ভারী বৃষ্টিতে তলিয়ে গেছে রাস্তা। ছবি : এশিয়া পোস্ট

টানা ভারী বর্ষণে কক্সবাজারে ৮ রোহিঙ্গা নাগরিকসহ ৯ জনের প্রাণহানির পর জেলার অন্তত ৫০টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। অব্যাহত বৃষ্টিপাতে জেলার বিভিন্ন উপজেলার প্রায় ২০ হাজার পরিবার এবং উখিয়া-টেকনাফের রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরের অন্তত ১ লাখ মানুষ পাহাড়ধসের ঝুঁকিতে রয়েছে বলে ক্যাম্প ও স্থানীয় প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে।

এদিকে দ্বীপ উপজেলা কুতুবদিয়ায় পানির প্রবল স্রোতে একটি সংযোগ সেতু ভেঙে পড়েছে। এ ছাড়া চকরিয়ার মাতামুহুরী ও কক্সবাজার সদরের বাঁকখালী নদীর পানি দ্রুত বাড়তে শুরু করেছে।

কক্সবাজার আবহাওয়া অফিসের সহকারী আবহাওয়াবিদ মো. আব্দুল হান্নান জানান, রোববার দুপুর ১২টা থেকে পরবর্তী ২৪ ঘণ্টায় জেলায় ২৬৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। আগামী কয়েক দিনও এই ভারী বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে।

স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও বাসিন্দারা জানান, কক্সবাজার শহরের সমিতিপাড়া, কুতুবদিয়াপাড়া, ঈদগাঁও উপজেলা সদর, হাসপাতাল ও ভূমি অফিসসংলগ্ন এলাকা, টেকনাফের সাবরাং, শাহপরীর দ্বীপ, সদর, হ্নীলা, হোয়াইক্যং ও বাহারছড়ার বিভিন্ন নিম্নাঞ্চল পানিতে তলিয়ে গেছে। একই সঙ্গে কক্সবাজার-টেকনাফ মহাসড়কের কয়েকটি অংশ, কুতুবদিয়ার পাঁচটি গ্রাম এবং মহেশখালীর ধলঘাটা ইউনিয়নের অধিকাংশ এলাকা প্লাবিত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।

কুতুবদিয়ায় পানির প্রবল স্রোতে ভেঙে পড়েছে সংযোগ সেতু। ছবি : এশিয়া পোস্ট
কুতুবদিয়ায় পানির প্রবল স্রোতে ভেঙে পড়েছে সংযোগ সেতু। ছবি : এশিয়া পোস্ট

এদিকে উখিয়ার ২ নম্বর রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরের অন্তত ৪০টি ঘরে পানি ঢুকেছে। বিভিন্ন সড়কে পানি জমে থাকায় যান চলাচলে বিঘ্ন ঘটছে এবং শিক্ষার্থীসহ সাধারণ মানুষ চরম দুর্ভোগে পড়েছেন।

জানতে চাইলে টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এস এম অনীক চৌধুরী বলেন, পাহাড়ি ও নিম্নাঞ্চলের বাসিন্দাদের সর্বোচ্চ সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। পরিস্থিতির অবনতি হলে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা ছেড়ে দ্রুত নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে চলে যাওয়ার আহ্বান জানানো হচ্ছে। যে কোনো জরুরি পরিস্থিতিতে প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে।

ঝুঁকিতে ২০ হাজার পরিবার

কক্সবাজার বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বাইরে জেলার প্রায় ২০ হাজার পরিবার পাহাড়ের ঢাল ও পাদদেশে ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাস করছে। এর মধ্যে কক্সবাজার দক্ষিণ বন বিভাগের আওতাধীন এলাকায় প্রায় ১৩ হাজার এবং উত্তর বন বিভাগের আওতায় প্রায় সাত হাজার পরিবার রয়েছে বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

ঝুঁকিপূর্ণ এসব বসতির মধ্যে কক্সবাজার শহরের লাইটহাউস, সৈকতপাড়া, সার্কিট হাউসসংলগ্ন এলাকা, মোহাজেরপাড়া, দক্ষিণ ঘোনারপাড়া, বাদশাঘোনা, বৈদ্যঘোনা, মধ্যম ঘোনারপাড়া, পাহাড়তলী, কলাতলী আদর্শগ্রাম, ঝিরিঝিরিকুয়া ও লিংকরোড উল্লেখযোগ্য। পাশাপাশি সদর উপজেলার পিএমখালী, খুরুশকুল, মহেশখালী, রামু, উখিয়া ও টেকনাফেও গত তিন বছরে ঝুঁকিপূর্ণ বসতির সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে।

রোহিঙ্গা ক্যাম্পে বাড়ছে শঙ্কা

২০১৭ সালে উখিয়া-টেকনাফের প্রায় আট হাজার একর বনভূমি উজাড় করে ৩৩টি রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবির গড়ে তোলা হয়। বর্তমানে এসব ক্যাম্পে প্রায় ১২ লাখ নিবন্ধিত রোহিঙ্গা রয়েছে। তাদের মধ্যে অন্তত ১ লাখ মানুষ ভূমিধসের উচ্চ ঝুঁকিতে বসবাস করছে।

উখিয়ার ৮ আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের (এপিবিএন) অধিনায়ক মো. রিয়াজ উদ্দিন আহমেদ জানান, ভারী বৃষ্টির মধ্যেও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাসকারী রোহিঙ্গাদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে মাইকিংসহ বিভিন্ন কার্যক্রম চালানো হচ্ছে।

অপরদিকে উখিয়া ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের ইনচার্জ ডলার ত্রিপুরা বলেন, বর্ষা মৌসুম শুরুর আগেই ডিএমসি কমিটি, ক্যাম্পের মাঝি ও কমিউনিটি প্রতিনিধিদের নিয়ে একাধিক সমন্বয় সভা করা হয়েছে। নিয়মিত মাইকিং করে অতিভারী বৃষ্টির সময় ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা ছেড়ে আশ্রয়কেন্দ্রে চলে যাওয়ার আহ্বান জানানো হচ্ছে।

শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মো. মিজানুর রহমান বলেন, টানা বৃষ্টির কারণে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে পাহাড়ধসের ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ায় ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ি ঢালে বসবাসকারীদের নিরাপদ স্থানে সরে যেতে বলা হচ্ছে। এ জন্য বিভিন্ন ক্যাম্পে সতর্কবার্তাও প্রচার করা হচ্ছে।

চকরিয়াতেও সতর্কতা

এদিকে চকরিয়া উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে দিনভর মাইকিং করে পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারীদের নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যাওয়ার জন্য বলা হয়েছে। প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, উপজেলার খুটাখালী, ডুলাহাজারা, ফাঁসিয়াখালী, কৈয়ারবিলসহ ১০টি ইউনিয়নের পাহাড়ি এলাকায় অন্তত ১৫ হাজার মানুষ ঝুঁকিতে রয়েছে।

চকরিয়া দিনভর মাইকিং করে পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারীদের নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে বলা হয়েছে। ছবি : এশিয়া পোস্ট
চকরিয়া দিনভর মাইকিং করে পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারীদের নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে বলা হয়েছে। ছবি : এশিয়া পোস্ট

কৈয়ারবিল ইউনিয়নের ইসলামনগর গ্রামের বাসিন্দা সৈয়দ আলম বলেন, প্রতি বর্ষায় পাহাড়ধসের আতঙ্কে থাকতে হয়। প্রশাসন থেকে সরতে বলা হলেও অধিকাংশ মানুষ এখনও ঝুঁকিপূর্ণ স্থান ছেড়ে যায়নি।

চকরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শাহীন দেলোয়ার বলেন, সব ইউনিয়ন থেকে সার্বক্ষণিক তথ্য নেওয়া হচ্ছে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাসকারীদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার জন্য প্রশাসন প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিচ্ছে।

কুতুবদিয়ায় সেতু ধস

টানা বৃষ্টিতে কুতুবদিয়া উপজেলার লেমশীখালী ইউনিয়নের শাহাজিরপাড়া ও কৈয়ারবিল ইউনিয়নের মলমচর এলাকার সংযোগ সেতুটি ভেঙে পড়েছে। স্থানীয় বাসিন্দা এম শহিদুল ইসলাম বলেন, সোমবার সকাল ৯টার দিকে অতিরিক্ত জলাবদ্ধতার কারণে পানির প্রবল স্রোতে সেতুর নিচের মাটি সরে যায়। এতে সেতুটি ধসে পড়ে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে।