ভ্যাপসা গরমে দম বন্ধ হওয়ার মতো লাগে কেন, জানুন আসল কারণ

এশিয়া পোস্ট ডেস্ক
ভ্যাপসা গরমে দম বন্ধ হওয়ার মতো লাগে কেন, জানুন আসল কারণ
অতিরিক্ত গরম ও আর্দ্রতার কারণে শ্বাসকষ্টও হতে পারে। ছবি : সংগৃহীত

গরমের দিনে বাইরে বেরিয়ে অনেকেরই মনে হয় যেন ঠিকমতো শ্বাস নেওয়া যাচ্ছে না। বাতাস যেন ভারী হয়ে গেছে, বুক ভরে নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। কারও কারও আবার মনে হয় দম বন্ধ হয়ে আসছে। এই অস্বস্তি অনেক সময় এতটাই তীব্র হয় যে আতঙ্কে হাসপাতালে ছুটতে হয়।

তীব্র গরমের সময় সাধারণত পানিশূন্যতা, হিট স্ট্রোক বা পেশিতে টান ধরার মতো সমস্যার কথা বেশি শোনা যায়। কিন্তু অতিরিক্ত গরম ও আর্দ্রতার কারণে শ্বাসকষ্টও হতে পারে, যা অনেকেই গুরুত্ব দেন না।

নয়াদিল্লির স্যার গঙ্গা রাম হাসপাতালের সহপরিচালক ও শিশু শ্বাসতন্ত্র বিশেষজ্ঞ ডা. ধীরেন গুপ্ত এবং অ্যাপোলো হাসপাতালের রেসপিরেটরি মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. নিখিল মোদি জানিয়েছেন, অতিরিক্ত গরম ও আর্দ্রতা একসঙ্গে থাকলে শরীরের স্বাভাবিক শ্বাসপ্রশ্বাসের প্রক্রিয়ায় চাপ পড়ে। ফলে অনেকের শ্বাস নিতে কষ্ট হতে পারে।


কেন ভ্যাপসা গরমে শ্বাস নিতে কষ্ট হয়?

ডা. নিখিল মোদির মতে, বাতাসে আর্দ্রতা বেড়ে গেলে বাতাসে জলীয় বাষ্পের পরিমাণও অনেক বেড়ে যায়। এতে বাতাস ভারী মনে হয় এবং ফুসফুসে একই পরিমাণ বাতাস টেনে নিতে শরীরকে বেশি পরিশ্রম করতে হয়।

তিনি জানান, বাতাসে অক্সিজেনের মোট শতাংশ খুব বেশি বদলায় না। তবে অতিরিক্ত জলীয় বাষ্পের কারণে শ্বাসনালির ওপর চাপ বাড়ে। ফলে শ্বাসপ্রশ্বাসের পেশিগুলোকে স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক বেশি কাজ করতে হয়।

এ ছাড়া গরম ও ভারী বাতাস ফুসফুসে থাকা বিশেষ ধরনের সংবেদনশীল স্নায়ু, যাকে গ্রুপ সি নার্ভ ফাইবার বলা হয়, সেগুলোকে উত্তেজিত করে।

এই স্নায়ুগুলো সক্রিয় হয়ে গেলে মস্তিষ্কে দ্রুত সংকেত পাঠায় যে শরীর চাপে রয়েছে। এর ফলে শ্বাসনালি সাময়িকভাবে সংকুচিত হতে পারে। তখন অনেকের মনে হয় যেন দম বন্ধ হয়ে আসছে।

গরমে কীভাবে হৃদ্‌যন্ত্র ও ফুসফুসের ওপর চাপ পড়ে?

মানবদেহের একটি প্রধান কাজ হলো শরীরের তাপমাত্রা স্বাভাবিক রাখা। গরমে শরীর নিজেকে ঠান্ডা করার চেষ্টা করে।

এ সময় যা ঘটে

  • শরীরের রক্তনালিগুলো প্রসারিত হয়, যাতে ত্বকের দিকে বেশি রক্ত যেতে পারে এবং ঘাম বাষ্প হয়ে শরীর ঠান্ডা করতে পারে।
  • কিন্তু বাতাসে আর্দ্রতা বেশি থাকলে ঘাম সহজে শুকাতে পারে না।
  • ফলে শরীরের স্বাভাবিক শীতল হওয়ার প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়।
  • তখন হৃদ্‌যন্ত্রকে আরও দ্রুত রক্ত পাম্প করতে হয়, যার ফলে হৃদস্পন্দন বেড়ে যায়।
  • এতে শরীরের অক্সিজেনের চাহিদাও বাড়ে।
  • এই চাহিদা পূরণ করতে ফুসফুসকে আরও দ্রুত কাজ করতে হয় এবং শ্বাস নেওয়ার হার স্বাভাবিকের চেয়ে বেড়ে যায়।

সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রে এতে সাময়িক শ্বাসকষ্ট হতে পারে। তবে যাদের আগে থেকেই শ্বাসতন্ত্র বা হৃদ্‌যন্ত্রের সমস্যা রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি গুরুতর হয়ে শ্বাসপ্রশ্বাসের জটিলতা দেখা দিতে পারে।

ঝুঁকিতে কারা

স্বাস্থ্যবান মানুষেরও ভ্যাপসা গরমে সাময়িক শ্বাসকষ্ট হতে পারে। তবে কিছু মানুষের ঝুঁকি অনেক বেশি।

হাঁপানি ও অ্যালার্জির রোগী

গরমে বাতাসে ভূমিস্তরের ওজোন, অতিক্ষুদ্র বায়ুদূষণ কণা এবং পরাগরেণুর পরিমাণ বাড়তে পারে। এগুলো শ্বাসনালিতে প্রদাহ সৃষ্টি করে হাঁপানির সমস্যা বাড়িয়ে দিতে পারে।

সিওপিডি বা দীর্ঘমেয়াদি শ্বাসতন্ত্রের রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি

যাদের ফুসফুসের কার্যক্ষমতা আগে থেকেই কম, তাদের ক্ষেত্রে দ্রুত শ্বাস নেওয়ার কারণে পর্যাপ্ত অক্সিজেন গ্রহণ আরও কঠিন হয়ে পড়ে। এতে শ্বাসকষ্ট বেড়ে যেতে পারে।

হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি

হৃদ্‌যন্ত্র ও ফুসফুস একে অপরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করে। গরমের কারণে হৃদ্‌যন্ত্রের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়লে তার প্রভাব ফুসফুসেও পড়ে। এতে হঠাৎ শ্বাসকষ্ট দেখা দিতে পারে।

বয়স্ক ও অতিরিক্ত ওজনের ব্যক্তি

বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ফুসফুসের সক্ষমতা কমে যায়। আবার অতিরিক্ত ওজন থাকলেও শ্বাস নিতে বেশি পরিশ্রম করতে হয়। তাই এ দুটি গোষ্ঠী গরম ও আর্দ্র আবহাওয়ায় বেশি ঝুঁকিতে থাকেন।

কখন দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে?

ডা. ধীরেন গুপ্ত বলেন, গরমের কারণে হওয়া সাময়িক অস্বস্তি আর জরুরি চিকিৎসার প্রয়োজন আছে এমন শ্বাসকষ্টের মধ্যে পার্থক্য বোঝা খুব গুরুত্বপূর্ণ।

তিনি জানান, শীতাতপনিয়ন্ত্রিত বা ঠান্ডা পরিবেশে ১৫ থেকে ৩০ মিনিট বিশ্রাম নেওয়ার পরও যদি শ্বাসকষ্ট না কমে, তাহলে সেটিকে অবহেলা করা উচিত নয়।

নিচের যেকোনো লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে যেতে হবে -

  • ঠোঁট, জিহ্বা বা আঙুলের ডগা নীলচে হয়ে যাওয়া
  • মাঝপথে দম না নিয়ে পুরো বাক্য বলতে না পারা
  • তীব্র শ্বাসের শব্দ বা বুকে প্রচণ্ড চাপ অনুভব করা
  • হঠাৎ বিভ্রান্তি, জড়ানো কথা বা তীব্র মাথা ঘোরা
  • পালস অক্সিমিটারে অক্সিজেনের মাত্রা ৯৩ শতাংশের নিচে নেমে যাওয়া

গরমে শ্বাসকষ্ট এড়াতে কী করবেন?

ডা. নিখিল মোদি ও ডা. ধীরেন গুপ্ত কয়েকটি পরামর্শ দিয়েছেন।

আবহাওয়ার অবস্থা দেখে বাইরে বের হন

বাইরে যাওয়ার আগে আবহাওয়ার পূর্বাভাস দেখুন। বাতাসে আর্দ্রতা ৭০ শতাংশের বেশি হলে বা বায়ুদূষণের মাত্রা বেশি থাকলে অপ্রয়োজনে বাইরে না যাওয়াই ভালো। বিশেষ করে সকাল ১১টা থেকে বিকেল ৪টার মধ্যে বাইরে থাকা এড়িয়ে চলুন।

চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ইনহেলার ব্যবহার করুন

যাদের হাঁপানি বা শ্বাসতন্ত্রের দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা রয়েছে, তারা শীতাতপনিয়ন্ত্রিত ঘর থেকে হঠাৎ গরম ও ভ্যাপসা পরিবেশে বের হওয়ার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ইনহেলার ব্যবহার করতে পারেন।

পর্যাপ্ত পানি পান করুন

শরীরে পানির ঘাটতি হলে শ্বাসনালির শ্লেষ্মা ঘন হয়ে যায়। এতে শ্বাস নিতে আরও কষ্ট হতে পারে। তাই পর্যাপ্ত পানি ও ইলেকট্রোলাইটসমৃদ্ধ পানীয় পান করা জরুরি।

ঘরের পরিবেশ আরামদায়ক রাখুন

সম্ভব হলে শীতাতপনিয়ন্ত্রিত কক্ষ বা আর্দ্রতা কমানোর যন্ত্র ব্যবহার করুন। এগুলো না থাকলে পাখার সামনে বসে শরীরে ভেজা তোয়ালে বা কাপড় ব্যবহার করলে কিছুটা স্বস্তি মিলতে পারে।

শুধু গরম নয়, শ্বাসপ্রশ্বাসেরও বড় চ্যালেঞ্জ

অতীতের তুলনায় এখন তাপপ্রবাহ আরও তীব্র ও দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে। তাই গরমের সময় শুধু পানিশূন্যতা নয়, শ্বাসপ্রশ্বাসের সমস্যার দিকেও সমান গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

চিকিৎসকদের মতে, অতিরিক্ত আর্দ্রতা কীভাবে শ্বাসনালির ওপর প্রভাব ফেলে, সে বিষয়ে সচেতন থাকলে এবং প্রয়োজনীয় সতর্কতা মেনে চললে গরমের সময় শ্বাসকষ্টের ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব। তবে শ্বাস নিতে কষ্ট হলে বা লক্ষণগুলো দীর্ঘস্থায়ী হলে দেরি না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ।

সূত্র: এনডিটিভি