বিরল হলেও হতে পারে হার্টের ক্যানসার, যে লক্ষণ অবহেলা নয়

ক্যানসারের কথা শুনলেই সাধারণত ফুসফুস, স্তন, লিভার, কোলন বা প্রোস্টেটের কথা মনে আসে। কিন্তু হার্টের ক্যানসারের কথা খুব কমই শোনা যায়। তাই অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগে, হার্টেও কি ক্যানসার হতে পারে?
উত্তর হলো, হতে পারে। তবে এটি অত্যন্ত বিরল। কারণ, প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের হার্টের পেশির কোষ খুব কম বিভাজিত হয়। আর ক্যানসার তৈরি হয় মূলত কোষের অনিয়ন্ত্রিত বৃদ্ধি থেকে। এ কারণেই শরীরের অন্যান্য অঙ্গের তুলনায় হার্টে ক্যানসার হওয়ার সম্ভাবনা অনেক কম।
তবে বিরল হলেও হার্টে টিউমার হতে পারে। সব টিউমার ক্যানসার নয়। অনেক টিউমারই নিরীহ বা বিনাইন। কিন্তু সময়মতো চিকিৎসা না হলে সেগুলোও গুরুতর জটিলতার কারণ হতে পারে।
ভারতের অমৃতা হাসপাতাল, ফরিদাবাদের অ্যাডাল্ট কার্ডিওলজি ও কার্ডিয়াক সার্জারি বিভাগের প্রধান ও জ্যেষ্ঠ পরামর্শক ডা. সমীর ভাটের মতে, হার্টের ক্যানসার খুবই বিরল হলেও দীর্ঘদিন ধরে থাকা হার্ট-সংক্রান্ত কোনো লক্ষণ কখনোই অবহেলা করা উচিত নয়।
কেন হার্টে ক্যানসার এত বিরল?
ডা. সমীর ভাটে জানান, প্রাপ্তবয়স্ক বয়সে হার্টের পেশির কোষের বিভাজনক্ষমতা খুবই সীমিত। ফলে হার্ট থেকেই যে ক্যানসারের উৎপত্তি হবে, এমন ঘটনা খুব কম দেখা যায়। সব ধরনের ক্যানসারের মধ্যে প্রাইমারি কার্ডিয়াক ক্যানসারের সংখ্যা অত্যন্ত কম।
তিনি আরও বলেন, হার্টে যে টিউমার ধরা পড়ে, তার বেশির ভাগই হার্ট থেকে শুরু হয় না। এগুলো হয় নিরীহ টিউমার, নয়তো শরীরের অন্য কোনো অঙ্গের ক্যানসার ছড়িয়ে হার্টে পৌঁছায়।
হার্টের নিরীহ টিউমারই বেশি দেখা যায়
টিউমার শব্দটি শুনলেই অনেকেই ভয় পান। কিন্তু হার্টের সব টিউমার ক্যানসার নয়।
ডা. ভাটের মতে, হার্টে সবচেয়ে বেশি দেখা যায় মাইক্সোমা নামের একটি নিরীহ টিউমার। এটি সাধারণত হার্টের বাম অলিন্দে তৈরি হয় এবং অনেক সময় দীর্ঘদিন কোনো লক্ষণ ছাড়াই থাকতে পারে।
তবে এটি ক্যানসার না হলেও আকার ও অবস্থানের কারণে বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। এটি রক্তপ্রবাহে বাধা সৃষ্টি করতে পারে বা টিউমারের ছোট অংশ ভেঙে রক্তের সঙ্গে শরীরের অন্য স্থানে চলে যেতে পারে।
এর ফলে স্ট্রোক, হাত বা পায়ে হঠাৎ রক্তপ্রবাহ কমে যাওয়া, মাইট্রাল ভালভ দিয়ে রক্ত চলাচলে বাধা, শ্বাসকষ্ট, বারবার অজ্ঞান হয়ে যাওয়া, হার্ট ফেইলিউরের লক্ষণ এবং জ্বর, অতিরিক্ত ক্লান্তি বা কারণ ছাড়াই ওজন কমে যাওয়ার মতো সমস্যা হতে পারে।
ডা. ভাটে বলেন, সুখবর হলো, অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে মাইক্সোমা অপসারণ করা গেলে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই রোগ পুরোপুরি সেরে যায়। সময়মতো চিকিৎসা হলে ফলও খুব ভালো হয়।
প্রাইমারি হার্ট ক্যানসার কী?
যে ক্যানসারের উৎপত্তি সরাসরি হার্টে হয়, তাকে প্রাইমারি কার্ডিয়াক ক্যানসার বলা হয়। এটি অত্যন্ত বিরল হলেও সাধারণত বেশ আক্রমণাত্মক ধরনের হয়।
ডা. ভাটের মতে, এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হলো অ্যাঞ্জিওসারকোমা (যা সবচেয়ে বেশি দেখা যায় এবং সাধারণত হার্টের ডান অলিন্দে হয়) , র্যাবডোমায়োসারকোমা, ফাইব্রোসারকোমা ও প্রাইমারি কার্ডিয়াক লিম্ফোমা।
তিনি জানান, বিশেষ করে প্রাইমারি কার্ডিয়াক লিম্ফোমার ক্ষেত্রে অস্ত্রোপচারের চেয়ে কেমোথেরাপিই সাধারণত প্রধান চিকিৎসা।
এই ক্যানসারগুলো হার্টের পেশিতে ছড়িয়ে পড়তে পারে, রক্তপ্রবাহে বাধা দিতে পারে, হার্টের ভালভ ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে বা হার্টবিট নিয়ন্ত্রণকারী বৈদ্যুতিক ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করতে পারে। এর ফলে অনিয়মিত হৃদস্পন্দন, হার্ট ফেইলিউর বা রক্ত চলাচলে বাধা তৈরি হতে পারে।
শরীরের অন্য অঙ্গের ক্যানসারও হার্টে ছড়িয়ে পড়তে পারে
হার্ট থেকেই ক্যানসারের শুরু হওয়া বিরল হলেও শরীরের অন্য অঙ্গের ক্যানসার হার্টে ছড়িয়ে পড়া তুলনামূলক বেশি দেখা যায়।
ডা. ভাটে বলেন, ফুসফুস, স্তন, কিডনি কিংবা রক্তের ক্যানসার রক্তনালি বা লসিকাতন্ত্রের মাধ্যমে হার্টে পৌঁছাতে পারে। এ ধরনের ক্ষেত্রে চিকিৎসার মূল লক্ষ্য থাকে যে অঙ্গ থেকে ক্যানসারের শুরু হয়েছে, সেই ক্যানসারের চিকিৎসা করা।
কোন লক্ষণগুলো অবহেলা করা উচিত নয়?
হার্টের টিউমার শনাক্ত করা কঠিন হতে পারে। কারণ এর লক্ষণগুলো অনেক সময় অন্য হৃদরোগের সঙ্গে মিলে যায়।
ডা. ভাটের মতে, নিচের যেকোনো লক্ষণ দীর্ঘদিন থাকলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত -
- কারণ ছাড়াই দীর্ঘদিন শ্বাসকষ্ট
- বিশ্রামেও না কমা বুকব্যথা
- হৃদস্পন্দন অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়া বা ধড়ফড় করা
- বারবার অজ্ঞান হয়ে যাওয়া
- হার্ট ফেইলিউরের লক্ষণ, যেমন পা ফুলে যাওয়া বা অতিরিক্ত ক্লান্তি
তিনি বলেন, হার্টের টিউমারের নির্দিষ্ট কোনো লক্ষণ থাকে না। তাই দীর্ঘদিন ধরে থাকা বা ব্যাখ্যা করা যায় না এমন হার্ট-সংক্রান্ত সমস্যাকে কখনোই হালকাভাবে নেওয়া উচিত নয়।
কীভাবে শনাক্ত করা হয়?
বর্তমানে আধুনিক ইমেজিং প্রযুক্তির কারণে হার্টের টিউমার শনাক্ত করা অনেক সহজ হয়েছে।
ডা. ভাটে জানান, সাধারণত যেসব পরীক্ষা করা হয়, সেগুলো হলো ইকোকার্ডিওগ্রাফি বা হার্টের আলট্রাসাউন্ড, কার্ডিয়াক এমআরআই ও কার্ডিয়াক সিটি স্ক্যান।
এসব পরীক্ষার মাধ্যমে টিউমারের আকার, অবস্থান এবং ধরন সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। কিছু ক্ষেত্রে নিশ্চিত হওয়ার জন্য টিস্যুর নমুনাও পরীক্ষা করা হতে পারে।
চিকিৎসা কীভাবে হয়?
চিকিৎসা নির্ভর করে টিউমারটি নিরীহ, ক্যানসারজনিত নাকি শরীরের অন্য অঙ্গ থেকে ছড়িয়ে এসেছে, তার ওপর।
ডা. ভাটের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী - মাইক্সোমার মতো নিরীহ টিউমারের ক্ষেত্রে অস্ত্রোপচার করা হয়। প্রাইমারি হার্ট ক্যানসারের ক্ষেত্রে অস্ত্রোপচার, কেমোথেরাপি ও রেডিওথেরাপির সমন্বিত চিকিৎসা প্রয়োজন হতে পারে। প্রাইমারি কার্ডিয়াক লিম্ফোমায় সাধারণত কেমোথেরাপিই প্রথম চিকিৎসা। এবং অন্য অঙ্গ থেকে ছড়িয়ে আসা ক্যানসারের ক্ষেত্রে মূল ক্যানসারের চিকিৎসাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি বলেন, এ ধরনের রোগের চিকিৎসায় হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ, কার্ডিয়াক সার্জন, ক্যানসার বিশেষজ্ঞ, রেডিওলজিস্ট ও প্যাথোলজিস্টের সমন্বিত দল প্রয়োজন হয়।
হার্টের ক্যানসার কি প্রতিরোধ করা সম্ভব?
প্রাইমারি হার্ট ক্যানসার এতটাই বিরল যে এটি প্রতিরোধের জন্য আলাদা কোনো স্ক্রিনিং কর্মসূচি বা নির্দিষ্ট প্রতিরোধব্যবস্থা নেই।
তবে হৃদ্স্বাস্থ্য ভালো রাখতে ধূমপান থেকে বিরত থাকা, রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখা, স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন করা এবং দীর্ঘদিন ধরে থাকা হার্ট-সংক্রান্ত লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
এ ছাড়া যাদের এমন ক্যানসার রয়েছে, যা হার্টে ছড়িয়ে পড়তে পারে, তাদের নিয়মিত চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে থাকা প্রয়োজন।
সব মিলিয়ে হার্টের ক্যানসার বাস্তব হলেও এটি বিশ্বের সবচেয়ে বিরল ক্যানসারের একটি। হার্টে পাওয়া বেশির ভাগ টিউমারই নিরীহ অথবা শরীরের অন্য অঙ্গ থেকে ছড়িয়ে আসে। তবে চিকিৎসা না হলে এসব টিউমার স্ট্রোক, হার্ট ফেইলিউর কিংবা প্রাণঘাতী হৃদস্পন্দনের জটিলতার মতো সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে।
ডা. সমীর ভাটের মতে, দ্রুত রোগ শনাক্ত করা, সঠিক পরীক্ষা করা এবং সময়মতো চিকিৎসা শুরু করাই রোগীর সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি বাড়িয়ে দেয়। তাই দীর্ঘদিন বুকব্যথা, শ্বাসকষ্ট, বারবার অজ্ঞান হয়ে যাওয়া বা অস্বাভাবিক হৃদস্পন্দনের মতো লক্ষণ দেখা দিলে তা কখনোই অবহেলা করা উচিত নয়।
সূত্র: এনডিটিভি




