ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য কোন চাল ভালো, জেনে নিন

ডায়াবেটিস ধরা পড়ার পর অনেকেই মনে করেন, ভাত খাওয়া পুরোপুরি বন্ধ করতে হবে। কিন্তু বিশেষজ্ঞদের মতে, ডায়াবেটিসে ভাত খাওয়া নিষিদ্ধ নয়। বরং সঠিক ধরনের চাল বেছে নেওয়া, পরিমিত পরিমাণে খাওয়া এবং সুষম খাদ্যাভ্যাস অনুসরণ করাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সব ধরনের চাল রক্তে শর্করার মাত্রার ওপর একই রকম প্রভাব ফেলে না। তাই কোন চাল তুলনামূলক ভালো এবং কীভাবে ভাত খেলে রক্তে গ্লুকোজ নিয়ন্ত্রণে রাখা সহজ হতে পারে, সে সম্পর্কে জানা প্রয়োজন।
ভাত ছাড়া বাঙালির খাবারের কথা ভাবাই কঠিন। কিন্তু ডায়াবেটিস ধরা পড়ার পর অনেকেই সবচেয়ে আগে ভাত খাওয়া নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়ে যান। অনেকে আবার মনে করেন, ডায়াবেটিস থাকলে ভাত একেবারেই খাওয়া যাবে না। বাস্তবে বিষয়টি এমন নয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, ডায়াবেটিসে ভাত খাওয়া যাবে, তবে কোন ধরনের চাল খাচ্ছেন, কতটা খাচ্ছেন এবং কীভাবে খাচ্ছেন, সেটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
সব চাল শরীরে একইভাবে প্রভাব ফেলে না। কিছু চাল দ্রুত রক্তে শর্করার মাত্রা বাড়িয়ে দিতে পারে, আবার কিছু চাল তুলনামূলক ধীরে হজম হয় এবং রক্তে গ্লুকোজ ধীরে বাড়তে সাহায্য করে। তাই সঠিক চাল নির্বাচন করলে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখা কিছুটা সহজ হতে পারে।
ডায়াবেটিসে চাল বাছাইয়ের সময় কী দেখবেন
চাল বেছে নেওয়ার সময় কয়েকটি বিষয় মাথায় রাখা জরুরি-
- গ্লাইসেমিক ইনডেক্স বা জিআই কম হলে ভালো
- ফাইবারের পরিমাণ বেশি হলে উপকারী
- কম প্রক্রিয়াজাত বা কম পালিশ করা চাল বেছে নেওয়া ভালো
- পরিমিত পরিমাণে খাওয়া সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ
গ্লাইসেমিক ইনডেক্স কী
গ্লাইসেমিক ইনডেক্স বা জিআই হলো এমন একটি সূচক, যা জানায় কোনো খাবার খাওয়ার পর কত দ্রুত রক্তে শর্করার মাত্রা বাড়ে।
কম জিআই: ৫৫ বা তার কম
মাঝারি জিআই: ৫৬ থেকে ৬৯
বেশি জিআই: ৭০ বা তার বেশি
সাধারণভাবে কম জিআইযুক্ত খাবার ডায়াবেটিসে বেশি উপকারী বলে বিবেচিত হয়।
ডায়াবেটিসের জন্য যেসব চাল ভালো হতে পারে
ব্রাউন রাইস: ব্রাউন রাইস বা বাদামি চালকে ডায়াবেটিসের জন্য অন্যতম ভালো বিকল্প বলা হয়। এতে বাইরের ব্র্যান স্তর অক্ষত থাকে, ফলে ফাইবার, ভিটামিন এবং খনিজের পরিমাণ বেশি থাকে।
এ ধরনের ভাত খাওয়ার পর ধীরে হজম হয় তাই দীর্ঘ সময় পেট ভরা রাখে। পাশাপাশি এটি রক্তে শর্করার ওঠানামা কমাতে সাহায্য করতে পারে।
বাসমতি চাল: সব বাসমতি চাল এক রকম নয়। তবে অনেক ধরনের বাসমতি চালের গ্লাইসেমিক ইনডেক্স সাধারণ সাদা চালের তুলনায় কম হতে পারে। বিশেষ করে পুরোনো বা এজড বাসমতি চাল তুলনামূলক ভালো বিকল্প হিসেবে ধরা হয়।
তবে বাসমতি চাল খেলেও পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি।
লাল চাল: লাল চালে প্রাকৃতিকভাবে ফাইবার, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট এবং কিছু গুরুত্বপূর্ণ খনিজ থাকে। এটি ধীরে হজম হয় এবং অনেকের ক্ষেত্রে রক্তে শর্করার মাত্রা তুলনামূলক ধীরে বাড়াতে সাহায্য করতে পারে।
কালো চাল: কালো চালে অ্যান্থোসায়ানিন নামের শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট থাকে। এছাড়া এতে ফাইবারও বেশি থাকে। যদিও এটি অনেক জায়গায় সহজলভ্য নয়, তবু ডায়াবেটিসের জন্য এটি একটি ভালো বিকল্প হিসেবে বিবেচিত হয়।
বন্য চাল বা ওয়াইল্ড রাইস: ওয়াইল্ড রাইস আসলে প্রচলিত চাল নয়, এটি এক ধরনের জলজ ঘাসের বীজ। এতে ফাইবার ও প্রোটিনের পরিমাণ তুলনামূলক বেশি থাকে। ফলে এটি ধীরে হজম হয় এবং রক্তে শর্করার ওপর ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
সাদা চাল কি একেবারেই খাওয়া যাবে না?
সাদা চাল পুরোপুরি বাদ দেওয়ার প্রয়োজন হয় না। তবে এটি বেশি পালিশ করা হয় বলে ফাইবারের পরিমাণ কম থাকে এবং অনেক ধরনের সাদা চালের গ্লাইসেমিক ইনডেক্সও বেশি হতে পারে।
যদি সাদা চাল খেতে চান, তাহলে পরিমাণ কম রাখুন এবং সঙ্গে পর্যাপ্ত শাকসবজি খান। এছাড়া ডাল, মাছ, ডিম বা মুরগির মতো প্রোটিনযুক্ত খাবার রাখুন ও একসঙ্গে অনেক বেশি ভাত খাওয়া এড়িয়ে চলুন।
এভাবে খেলে খাবারের সামগ্রিক গ্লাইসেমিক প্রভাব কিছুটা কমানো সম্ভব।
শুধু চাল বদলালেই হবে না
ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে শুধু চাল পরিবর্তন করলেই হবে না। পুরো খাদ্যাভ্যাস এবং জীবনযাত্রার দিকেও নজর দিতে হবে। নিয়মিত হাঁটা বা ব্যায়াম করা, ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা, পর্যাপ্ত ঘুম এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ গ্রহণও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
ভাত খাওয়ার কয়েকটি ভালো অভ্যাস
- ছোট প্লেটে ভাত নিন
- প্লেটের অর্ধেক অংশ শাকসবজি দিয়ে পূরণ করুন
- ভাতের সঙ্গে প্রোটিনযুক্ত খাবার রাখুন
- অতিরিক্ত তেল ও মিষ্টিজাতীয় খাবার কম খান
- নিয়মিত রক্তে শর্করার মাত্রা পরীক্ষা করুন
ডায়াবেটিস থাকলেই ভাত খাওয়া বন্ধ করতে হবে, এমন ধারণা সঠিক নয়। বরং সঠিক ধরনের চাল নির্বাচন, পরিমিত পরিমাণে খাওয়া এবং সুষম খাদ্যাভ্যাস মেনে চলাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ব্রাউন রাইস, লাল চাল, কিছু ধরনের বাসমতি চাল, কালো চাল এবং ওয়াইল্ড রাইস তুলনামূলক ভালো বিকল্প হতে পারে। তবে কোন চাল আপনার জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত হবে, তা বয়স, শারীরিক অবস্থা, রক্তে শর্করার নিয়ন্ত্রণ এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যগত বিষয়ের ওপর নির্ভর করে। তাই প্রয়োজন হলে অবশ্যই চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ নিন।
সূত্র: সাহেদরি হসপিটাল, এ্যাপোলো সুগার ক্লিনিক, ফ্রিডম ফ্রম ডায়বেটিস
.png)





