কোরবানি কী, কেন এ বিধান দেওয়া হলো

কোরবানি আরবি ‘কুরবুন’ শব্দ থেকে এসেছে। অর্থ নৈকট্য ও সান্নিধ্য। জিলহজের ১০ তারিখ বা ঈদুল আজহার দিন আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে শরিয়ত পদ্ধতিতে যে পশু কোরবানি করা হয়, তাই কোরবানি। সকালে সূর্য ওপরে ওঠার সময় কোরবানি করা হয় বলে এ দিনকে ‘ইয়াওমুল আজহা’ বা কোরবানির দিন বলা হয়। ঈদের পুরো দিন ও পরের দুই দিন কোরবানি করা যায়।
কোরবানি করতে হয় একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য। শুধু পশু জবাই করা বা গোশত খাওয়ার জন্য কোরবানি করা যাবে না। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তুমি তোমার প্রতিপালকের জন্য নামাজ আদায় করো এবং কোরবানি করো।’ (সুরা কাউসার, আয়াত: ২)
স্বাভাবিক জ্ঞানসম্পন্ন, প্রাপ্তবয়স্ক মুসলমানের পক্ষ থেকে একটি করে কোরবানি দেওয়া ওয়াজিব, যদি সে নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হয়। নিসাব হলো ১০ জিলহজ ফজর থেকে ১২ জিলহজ সূর্যাস্ত পর্যন্ত সময়ের মধ্যে প্রয়োজন অতিরিক্তি সাড়ে সাত ভরি স্বর্ণ বা সাড়ে বায়ান্ন ভরি রুপা অথবা এর সমমূল্যের নগদ টাকা ও ব্যবসার পণ্য বা সম্পদের মালিক হওয়া।
কোরবানি করা সুন্নতে মুয়াক্কাদা। হজরত মুহাম্মদ (সা.) মদিনায় প্রতিবছর কোরবানি আদায় করেছেন। সাহাবিরাও নিয়মিত কোরবানি করেছেন।
পৃথিবীতে মানুষের আগমনের পর থেকে কোরবানির ধারাবাহিকতা শুরু হয়েছে। হজরত আদম (আ.)-এর দুই ছেলে হাবিল ও কাবিল প্রথম কোরবানি করেছেন। তারা আল্লাহর কাছে পেশ করেছেন নিজেদের পছন্দনীয় জিনিস। আল্লাহ হাবিলের কোরবানি গ্রহণ করেছেন। কারণ, তার কোরবানি ছিল আল্লাহর জন্য।
নবী-রাসুলরা সবাই নানাভাবে কোরবানি করেছেন। আল্লাহর কাছে নিজেদের সমার্পণ করেছেন। আল্লাহ তাআলা ইবরাহিম (আ.) ও তাঁর ছেলে ইসমাইল (আ.)-এর কোরবানিকে মুসলিম জাতির জন্য আদর্শ বানিয়েছেন। কোরআনে আছে, ‘যখন ছেলে তাঁর বাবার সঙ্গে চলার বয়সে পৌঁছল। (তখন ইবরাহিম (আ.) বললেন), ‘হে ছেলে, নিশ্চয়ই আমি স্বপ্নে দেখেছি যে, আমি তোমাকে জবাই করছি। তোমার কী মতামত?’ ইসমাইল (আ.) বললেন, ‘হে বাবা, আপনাকে যা আদেশ করা হয়েছে, তাই করুন! অবশ্যই আমাকে ধৈর্যশীলদের অন্তর্ভুক্ত পাবেন।’ (সুরা সাফফাত, আয়াত: ১০২)
কোরবানি কেন করতে হয়
আল্লাহর খুশির জন্য কোরবানি করতে হয়। বান্দা আল্লাহর খুশির জন্য কোরবানি করবে, তাঁর কাছে নিজেকে সঁপে দেবে, এ জন্য আল্লাহ কোরবানির বিধান দিয়েছেন। বিশুদ্ধ নিয়তে কোরবানির মাধ্যমে বান্দা আল্লাহর কাছে পৌঁছে যাবেন। আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করবেন। আল্লাহর প্রিয় হবেন।
কোরবানিদাতার নিয়ত থাকতে হবে—‘এ পশু আমি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কোরবানি করছি।’ পবিত্র কোরআনে আছে, ‘আল্লাহর কাছে কখনোও এগুলোর (কোরবানিকৃত পশুর) গোশত পৌঁছায় না এবং রক্তও না। বরং তাঁর কাছে পৌঁছায় তোমাদের তাকওয়া বা আল্লাহভীতি।’ (সুরা হজ, আয়াত: ৩৭)
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘কোরবানির দিনের আমলের মধ্য থেকে কোরবানি করার চেয়ে কোনো আমল আল্লাহর কাছে অধিক প্রিয় নয়। কেয়ামতের দিন এই কোরবানিকে তার শিং, পশম ও ক্ষুরসহ উপস্থিত করা হবে। কোরবানির রক্ত জমিনে পড়ার আগেই আল্লাহর কাছে কবুল হয়ে যায়। সুতরাং তোমরা সন্তুষ্টচিত্তে কোরবানি করো।’ (জামে তিরমিজি, হাদিস: ১৪৯৩)
ইসলামে কোরবানির গুরুত্ব অনেক। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যার কোরবানির সামর্থ্য আছে, তবুও সে কোরবানি করল না, সে যেন আমাদের ঈদগাহে না আসে।’ (মুসনাদে আহমদ, ২/৩২১)
সাহাবি হজরত জায়েদ ইবনে আরকাম (রা.) বলেন, ‘সাহাবিরা জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসুল, কোরবানির বিধান কী? তিনি বললেন, এটা তোমাদের পিতা ইবরাহিমের (আ.) সুন্নত। সাহাবিরা জানতে চাইলেন, এতে আমাদের জন্য কী কল্যাণ রয়েছে? রাসুল (সা.) বললেন, কোরবানিকৃত পশুর প্রতিটি চুলের বিনিময়ে একটি করে সওয়াব পাওয়া যাবে। সাহাবিরা বললেন, হে আল্লাহর রাসুল, বেশি পশমওয়ালা পশুর ক্ষেত্রে কী হবে। রাসুল (সা.) বললেন, প্রতিটি পশমের বিনিময়ে একটি করে সওয়াব পাওয়া যাবে।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ)





